বিরোধী দলকে নিয়ে সংবিধান সংশোধনে জোর

সংসদ প্রতিবেদক

Advertisement

বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সংবিধান সংশোধনের ওপর জোর দিয়েছেন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও টকশো ব্যক্তিত্বরা। একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠন ও প্রক্রিয়া, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও সক্ষমতা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে লিখিত ও সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অংশীজনদের মতামত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রণয়নের কথা জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে টিভি, অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও টকশো ব্যক্তিত্বরা এসব মতামত দেন। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে সমাজের মতামত ও প্রত্যাশার একটি চিত্র নেয়া হচ্ছে। এরপর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হবে। ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের পর তার ভিত্তিতে সংশোধনী বিল আনা হবে। তখন সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আবারো আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের সাথেও আলোচনা করা হবে। তবে সেই আলোচনা হবে প্রক্রিয়ার শেষের দিকে।
বৈঠকে অংশীজনদের দেয়া পরামর্শের বিষয়ে তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত এসেছে। বিরোধী দলের সাথে আলোচনার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়ার এবং আলোচনায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর গঠন, প্রক্রিয়া এবং কারা এতে থাকবেন- এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সবার কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। যেটি সুষ্ঠু ও উপযুক্ত মনে হবে, সংসদ তা বিবেচনা করবে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। আবার কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টও রয়েছে। এসব বিকল্প নিয়ে আরো আলোচনা হতে পারে। গণমাধ্যমে লেখালেখি ও মতামতের মাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রস্তাব আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থে উপযুক্ত পদ্ধতি সংসদ বিবেচনা করবে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়েও বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র হওয়ায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব এসেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এ বিষয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণ, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিনি। এসব প্রস্তাব সংকলন করে পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে মতামত এসেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেউ কেউ মনে করেন, একজন ব্যক্তি ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করলে জনগণ চাইলে তাকে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১০ বছরের সীমা গণতান্ত্রিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে- এমন মতও এসেছে।
তবে তিনি বলেন, তাদের দলের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠেকানোর চিন্তা থেকেই এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এ অবস্থান থেকে তারা এখনো সরে আসেননি। তবে বিরোধী দল এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ প্রণয়ন ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারা সেটি বাস্তবায়ন করতে চান। তবে বিরোধী দল আলোচনায় এসে কোনো কোনো বিষয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে যমুনা টিভির সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে আলোচনায় রাখার বিষয়ে তারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হলেও সব পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা করার নজির খুব বেশি নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। বিরোধী দলকে আলোচনায় এনে তাদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করতে হবে। এতে সংশোধনীটি দেশের মানুষের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হবে।
ফাহিম আহমেদ আরো বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেন, বৈঠকে অংশ নেয়া সবাইকে কমিটির পক্ষ থেকে ধৈর্য ধরে শোনা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠন প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে সবাইকে সুচিন্তিত ও লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংবিধান এমনভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার সংশোধনের প্রয়োজন না হয়।
জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের পক্ষে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী মত দিয়েছেন বলে জানান তিনি। নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করে কোনো কোনো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে মত এসেছে।
বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় রেখে সংশোধনী প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. সায়ন্ত বলেন, একসাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া গেলে বিতর্ক কমবে এবং সংশোধনীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চকক্ষ হলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে কি না এবং এটি অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করবে কি না- এ বিষয়ও বিবেচনায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে। আবার উচ্চকক্ষে বিভিন্ন দলের সাথে সম্পৃক্ত সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে নিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটির পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও কেউ কেউ বলেছেন।
আরটিভির হেড অব নিউজ ইলিয়াস হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত রূপরেখা দেয়া হয়নি।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি লিখিত প্রস্তাবও চেয়েছে বিশেষ কমিটি। বৈঠক শেষে দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আলোচনার বাইরে কারো লিখিত প্রস্তাব থাকলে তা কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে। বৈঠকে উত্থাপিত এবং লিখিতভাবে পাওয়া প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে কমিটি।
কমিটি জানিয়েছে, সংবিধান সংশোধন নিয়ে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, নারী নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো: নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মো: মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো: গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।