পছন্দের ডিলার নিয়োগ দিতে মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন এমপিরা

শামছুল ইসলাম 

Advertisement

সারের নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেতে নানাভাবে তদবির করছেন। এতে পিছিয়ে নেই সরকার দলের সংসদ সদস্যরাও। গত দুই দিনে প্রায় অর্ধশত সংসদ সদস্যকে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেখা গেছে। এসব সংসদ সদস্য প্রথমে মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাইলেও তাকে না পেয়ে সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করে পছন্দের ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দিতে তদবির করছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। 
গতকাল বেলা ২টায় কৃষি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমীন উর রশিদ তার দফতরে নেই। তার দফতরের কর্মরতরা বললেন, সারের ডিলার নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যরা সাক্ষাৎ করতে আসছেন। এতে তিনি প্রচণ্ড বিব্রত হচ্ছেন। এ জন্য তিনি দফতরে বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। 
কৃষিমন্ত্রীর দফতরের ওপরতলায় বসেন কৃষি সচিব মো: সেলিম খান। বেলা ২টায় তার দফতরে দিয়ে গিয়ে দেখা যায় রুম থেকে বের হচ্ছেন নাটোরের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি। বের হওয়ার সময় তার সাথে থাকা ব্যক্তিদের সাথে সারের ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত আলোচনা করতে দেখা যায়। সচিবের রুম থেকে এর পরপর বের হন বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান। তিনিও বের হওয়ার সময় তার সাথে সারের ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র থাকা লোকজন দেখা যায়।  
সারের ডিলারশিপের তদবির করতে আসেন বিএনপির রংপুর সদর উপজেলা সভাপতি মো: মাসুদ রানা। উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দলের এই নেতা উপজেলা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য। তিনি তার স্ত্রীর নামে ডিলারশিপ লাইসেন্সের আবেদন করেছেন। জেলা প্রশাসকের পাঠানো তিন জনের নামের তালিকায় তার স্ত্রীর নামও রয়েছে। এখন ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে মন্ত্রি-সচিবের দফতরে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতর বেশি সংসদ সদস্য মন্ত্রী এবং সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের প্রায় সবারই সাক্ষাতের উদ্যেশ্যে ছিল পছন্দের ব্যক্তিকে ডিলারশিপ নিয়োগ দেয়া।  
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, একজন সংসদ সদস্য এসেছেন তার এলাকা থেকে তার সুপারিশেই একটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম পাঠনো হয়েছে। কিন্তু ১ নম্বরে যার নাম দেয়া হয়েছে তাকে বাদ দিয়ে আরেকজনকে ডিলার নিয়োগের তদবির করছেন সেই সংসদ সদস্য।  
এ দিকে ডিলার নিয়োগের তালিকা এখনো প্রকাশ করেনি প্রশাসন। তবে সেটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের কথায় উঠে এসেছে। সম্ভাব্য তালিকায় রংপুরের পীর গাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ারা হলেন- কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আবদুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি  আক্তার, পীরগাছা সদরে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক ও কান্দিতে আতাউর রহমান। তাদের অধিকাংশই আবার জীবনেও সার বা কীটনাশকের ব্যবসা করেননি। তালিকায় স্থান পাওয়াদের মধ্যে সুলতানা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী। আতাউর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তবে তিনি ফ্রিতে এই ডিলারশিপ পাননি, ঘুষ দিতে হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। এসব তথ্যের কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি কথোপকথনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথপোকথনটি হয়েছে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের মধ্যে। অডিও ক্লিপে শোনা যায়, তারা উভয়ই ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলেও জায়গা পাননি তালিকায়। একে অপরকে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে ডিলারি নিতে পারব না।’ তাদের কথোপকথনেই উঠে আসে আতাউরের ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার তথ্য এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ডিলার নিয়োগ-বাণিজ্যের কথা। 
২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার আলোকে প্রথমে আবেদনপত্রগুলো জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করে। যাচাই শেষে দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়। উপজেলা কমিটি তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে। এরপর উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত প্রত্যেক প্রার্থীর তথ্য জেলা কমিটি আবার যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন প্রার্থীর প্রস্তাব সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাবিত প্রার্থীদের আবেদনপত্র ও তথ্য পরীক্ষা করে ইউনিয়ন প্রতি একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদন করা হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। মাঠ প্রশাসনের এই দুই কর্মকর্তাই নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের কয়েকটি জেলার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানাগেছে, এই ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তদবির চলছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি পত্র (ডিও) লেটার এবং ইউএনও-ডিসির কাছে তদবিরের জন্য ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করছেন ডিলার প্রত্যাশীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা শুধু কাগুজে যোগ্যতার পরিবর্তে পর্যাপ্ত গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা, সারের বাজারজাতকরণে অভিজ্ঞতা, সততা ও কৃষকবান্ধব মনোভাবকে গুরুত্ব দেয়া হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ হলে কৃষকরা সঠিক সময়ে নির্ধারিত দামে সার পাবেন এবং কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা সহজ হবে।
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন। 
সারে নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে গত ২৭ আগস্ট একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুবিধা থাকবে না। ডিলারের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে বাতিল বা নবায়ন করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন সার ডিলার (এখন দু’জন) নিয়োগ করা যাবে। প্রতিটি পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগ দেয়া যাবে।