
আমিনুল ইসলাম
- বাড়ছে ছিনতাই হামলা ভাঙচুর দখল : গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছে অনেকে
- মূল হোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ : কঠোর অবস্থানের নির্দেশ আইজিপির
গত রোববার রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর দোলাইরপাড় চৌরাস্তা থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট। এক্সপ্রেসওয়ের মুখে থেমে আছে শত শত যানবাহন। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। যানজটে আটকে থাকা গাড়িগুলোর ওপর তখন রাতের অন্ধকার। রোড লাইটের আবছা আলোয় হঠাৎ দেখা গেল, একদল কিশোর-তরুণ এক্সপ্রেসওয়ের রোড ডিভাইডার টপকে দ্রুত নেমে আসছে। কারও হাতে ছোট রড, কারও হাতে ছুরি বা চাকুসদৃশ অস্ত্র।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ছুটে যাচ্ছে একেকটি গাড়ির দিকে। প্রাইভেটকারের দরজা টানছে, বনেটে হাত দিয়ে থাবা দিচ্ছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পেছনের ত্রিপল ও রশি কাটার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। আবার কয়েকজন কোনো একটি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরাই ঝগড়া বাঁধানোর ভান করছে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গাড়িগুলোর ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে।
প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের চালকরা দ্রুত দরজা-জানালা লক করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ গাড়ির আলো পর্যন্ত নিভিয়ে দিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ট্রাকচালকরা গ্লাস তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন। যেসব বাস ও ট্রাকে যাত্রী বেশি, সেসব গাড়ির পুরুষ যাত্রীরা মোটা বেতের লাঠি হাতে গাড়ির সামনে অবস্থান নিচ্ছেন। আর নারী ও শিশুসহ কমসংখ্যক যাত্রী থাকা গাড়িগুলোতে আতঙ্ক আরো বেশি। অনেকেই দরজা-জানালা বন্ধ করে দোয়া পড়তে শুরু করেন। প্রশ্ন একটাই-‘জ্যাম ছাড়ছে না কেন?’
শুধু দোলাইরপাড় নয়, রাত নামলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার এমন চিত্র নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, টানাপার্টি ও থাবাপার্টির তৎপরতার পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগও সামনে আসছে। মোহাম্মদপুর-আদাবর থেকে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী- বিভিন্ন এলাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার অভিযোগ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় সংঘর্ষ ও দখলচেষ্টার অভিযোগ- এসব ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার রাতেও আদাবরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলি চালালে রাজিব হাওলাদার (৩০) ও সাগর (২৪) নামে দু’জন আহত হন।
যানজটকে ‘সুযোগ’ হিসেবে নিচ্ছে অপরাধীরা
রোববারের ঘটনার রাতে দোলাইরপাড় এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা দূরপাল্লার যানবাহনের বড় অংশ পদ্মা সেতু হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দ্রুত ঢাকায় প্রবেশ করলেও ধোলাইরপাড় চৌরাস্তায় এসে দীর্ঘ সময় আটকে পড়ছে। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হওয়া এ যানজট অনেক সময় পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দীর্ঘ সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত গাড়িই তখন দুর্বৃত্তদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
গাড়ির সারির মধ্যে কয়েকজনকে ট্রাকের সামনে ও পেছনে মোটা বেতের লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। খুলনার তেরোখাদা থেকে সবজি নিয়ে যাত্রাবাড়ী যাচ্ছিলেন আল আমিন। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর ধোলাইরপাড়ে যানজটের মধ্যে তাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
তার ভাষায়, ‘এক্সপ্রেসওয়ের ডিভাইডার টপকে ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত কিশোর-তরুণ নেমে আসে। তাদের হাতে রড, চাকুসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র থাকে। তারা নানা ধরনের সুযোগ খুঁজতে থাকে। গাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ না থাকলে টেনে খুলে টাকা, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিস নিয়ে যায়। ট্রাকের রশি ও ত্রিপল কেটে পেছন থেকে মালামাল নেয়ার চেষ্টা করে।’ আল আমিন বলেন, ‘কিছু বলতে গেলে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। গাড়ির গ্লাস ভেঙে ফেলে। সবজি নষ্ট করে দিতে পারে- এ আশঙ্কায় কয়েকজন পুরুষ লাঠি হাতে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। আমরা কয়েকজন একসাথে থাকলে তারা হয়তো এগিয়ে আসে না। কিন্তু সংঘবদ্ধভাবে হামলা করলে আমাদের রক্ষা করার কেউ থাকবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
গ্রেফতার হচ্ছে, ফিরছে আবার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার হওয়া অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ বা কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অপরাধের পেছনে থাকা অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা, সংগঠক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে একই চক্রের নতুন সদস্যরা আবার মাঠে নামবে।
অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চলমান থাকার মধ্যেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত এসব ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। কখন কার জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক বা বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা হয়- এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অভিযান চালানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
‘অপরাধের মূল জায়গায় পৌঁছাতে হবে’
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান নয়া দিগন্তকে বলেন, অপরাধের মূল উৎপাটন করতে না পারার কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তিনি বলেন, ‘পুলিশ মাঠপর্যায়ের অনেক অপরাধীকে গ্রেফতার করছে। কিন্তু অপরাধের মূল জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না। ফলে যারা নেপথ্যে থাকে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’
রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যের নাম আলোচনায় এলেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ মূলত ভাড়ায় আনা লোকজনকে গ্রেফতার করছে- এমন অভিযোগও রয়েছে।
জামিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জামিন একজন মানুষের অধিকার। তবে এ ধরনের অপরাধ কমাতে হলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনি কাঠামো আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। যাতে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধীরা দ্রুত ফিরে এসে একই কাজে যুক্ত হতে না পারে।’
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মী নুর খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সামনে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, ‘পুলিশকে অনেক সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। প্রভাবশালী মহলের মদদে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
‘অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা খোঁজে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো: রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে ‘টাইম’ ও ‘প্লেস’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীরা সবসময় সম্ভাব্য টার্গেট খুঁজতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বা তৎপরতা তুলনামূলক কম দেখলেই তারা সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে রাতে অপরাধের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে শুধু রাতেই নয়, বিভিন্ন লোকেশনে অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি বেড়েছে।’
তার মতে, অপরাধ দমনে পুলিশকে প্রতিক্রিয়াশীল (রিঅ্যাকটিভ) ব্যবস্থার পাশাপাশি আরো সক্রিয় (প্রো-অ্যাকটিভ) ভূমিকা নিতে হবে। ‘পুলিশ যে পরিমাণ রিঅ্যাকটিভ ও প্রো-অ্যাকটিভভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ফলে অপরাধীরা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।’
সমাধানের পথ হিসেবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও কারা ব্যবস্থাকে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। অপরাধী গ্রেফতার, তদন্ত, বিচার এবং সাজা কার্যকর- প্রতিটি ধাপের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে অপরাধ দমনের স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।
কঠোর অবস্থানে পুলিশ
এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশের পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী।
আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িতদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকলে তা উদঘাটন করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও দেন তিনি। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে ছিনতাই, হামলা, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পর আইজিপির এ নির্দেশকে মাঠপর্যায়ে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান ও গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়- অপরাধের নেপথ্যের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো চিহ্নিত করা, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং একই অপরাধে বারবার জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের পুনঃঅপরাধের কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
রাজধানীর রাতের রাজপথে যানজটে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তাই এখন একটাই- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শেষ হওয়ার পরও কেন একই জায়গায় আবার ফিরে আসছে অপরাধীরা?









