সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই ২ হাজার কোটি টাকা মূলধন হারাল ডিএসই

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে বড় আকারের সূচক হারিয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এর ফলে প্রথম কার্যদিবসেই বাজার মূলধনের দুই হাজার কোটি টাকার বেশি হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।  লেনদেনের শুরু থেকেই বিক্রয়চাপে ভুগতে থাকা বাজারগুলো দিনের বাকি সময় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। উভয় বাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া বিভিন্ন খাতের কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ৭১ শতাংশের বেশি দরপতনের শিকার হয়। 
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বাজার আচরণ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তারা মনে করেন, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব তারই প্রতিফলন ঘটছে পুঁজিবাজারে। তার ওপর বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের অপ্রতুলতার কারণে বাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছে না। এ মুহূর্তে কিছু নির্দিষ্ট খাত অথবা কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। অথচ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশেরই এখন লভ্যাংশ ঘোষণার সময়। এ সময় বাজার ভালো পারফর্ম করার কথা। কিন্তু  দেশের সার্বিক অর্থনীতির বিচারে বিনিয়োগকারীরা আস্থাশীল হতে পারছেন না যে কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে পারবে। তাই এ মুহূর্তে পুঁজিবাজার একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। 
গতকাল সকালে ঢাকা শেয়ারবাজার ছয় লাখ ৯০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে লেনদেন শুরু করে। কিন্তু দিনশেষে বাজারটির মূলধন দাঁড়ায় ছয় লাখ ৮৮ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ দিন মূলধনের দুই হাজার ১৫২ কোটি টাকা হারিয়ে বসে ডিএসই। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব খাতেই দরপতন ঘটে বেশির ভাগ কোম্পানির। তবে কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড ও সেবা খাত। এ দু’টি খাতে লেনদেনে অংশ নেয়া ফান্ড ও কোম্পানির বেশির ভাগ মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয়।  
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৫ দশমিক ২১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে সূচকটি বিকালে লেনদেনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৫৩২ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৭৬ ও ১২ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১২৮ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট হারায়। ১৪ হাজার ৯১২ দশমিক ১৮ পয়েন্ট থেকে সূচকটি বিকেলে লেনদেনশেষে ১৪ হাজার ৭৮৩ দশমিক ৩১ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৮৭ দশমিক ৯৭ ও ৯০ দশমিক ৩০ পয়েন্ট। 
সূচকের অবনতির ফলে লেনদেনেরও অবনতি ঘটে ঢাকা শেয়ারবাজারে। ডিএসই এদিন টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিনের চেয়ে ২৯ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৭৫৬ কোটি টাকা। তবে সূচকের নেতিবাচক আচরণ সত্ত্বেও লেনদেনের উন্নতি ঘটেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসই ৩৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২৩ কোটি টাকা বেশি। বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল  ১৬ কোটি টাকা। 
এ দিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চামড়াশিল্প খাতের কোম্পানি এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও দরপতনের শিকার হয়েছে। কোম্পানিটি গতকাল ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ  ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ক্যাশ এবং ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড। একই সাথে কোম্পানিটি বিদ্যমান ঋণ পুনঃঅর্থায়নের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি টাকার রিডিমেবল প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল ডিএসইর ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করে কোম্পানিটি। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এসব সিদ্ধান্ত  নেয়া হয়। সভায় ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদনের পাশাপাশি কোম্পানির ৩৬তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) এবং আর্থিক বিবরণী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। 
এপেক্স ফুটওয়্যার পুঁজিবাজারের একটি ব্লু-চিপ কোম্পানি হিসাবে পরিচিত। দেশের চামড়াজাত পণ্য বিশেষ করে জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু নেতিবাচক বাজার আচরণের কারণে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আগের দিন ২১৫ টাকায় লেনদেন হওয়া কোম্পানিটির শেয়ারদর গতকাল নেমে আসে ২০৭ টাকায়। 
গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংক বহির্র্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফিন্যান্স। ২৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৭০ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২০ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় ১৯ লাখ শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, এনভয় টেক্সটাইলস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, মালেক স্পিনিং, ওরিয়ন ফার্মা, ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস। 
ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল  আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট প্রাইম ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের। ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ফান্ডটির। ৯ দশমিক ৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় ছিল সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, শমরিতা হাসপাতাল, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ওরিয়ন ইনফিউশন, আইসিবি এএমসিএল থার্ড মিউচুয়াল ফান্ড, ভ্যানগার্ড রূপালি ব্যাংক ব্যালেন্সড ফান্ড ও খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং।