
ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি মো: রাকিবুল হাসানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অডিওর নেপথ্যে উন্মোচিত হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের গভীর চক্রান্ত, পুলিশ প্রশাসনে অবাধ পোস্টিং বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির বিস্ফোরক চিত্র। রাজধানী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার সদ্য বরখাস্ত হওয়া সাবেক অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আদালতে দাখিলকৃত সরকারি নথিপত্র এবং পুলিশের রিমান্ড আবেদনে এ চাঞ্চল্যকর সমীকরণ উঠে এসেছে।
আদালতে পেশ করা সরকারি নথি ও রিমান্ড আবেদন থেকে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, সেনাপ্রধান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে নানা সংবেদনশীল মন্তব্য করা হয়। অডিওতে সাবেক ওসি রাকিবুলকে বলতে শোনা যায়, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসলেও কিছু হবে না, রাস্তায় থাকা পুলিশ খুবই দুর্বল, তারা কিছুই করতে পারবে না। এ ছাড়া সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে উসকানিমূলক মন্তব্য করার পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সব সিনিয়র অফিসাররা বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। রিমান্ড আবেদনে পুলিশ উল্লেখ করেছে, এসব বক্তব্য দিয়ে সরকারের সমালোচনা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, সরকার পতনের ষড়যন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া রেকর্ডিংয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ পদায়ন এবং অর্থাগমের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। রিমান্ড আবেদনে উপস্থাপিত অডিওর লিখিত বক্তব্যে দেখা যায়, রাকিবুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ড্রাইভারদের মাধ্যমে ওসিদের পদায়ন বা পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ওসি পদে থাকলে এক মাসে চার কোটি টাকা এবং বছর খানেক থাকলে ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা অর্জিত হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। এ ছাড়া রাজধানীর ভাটারা থানার পোস্টিং প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট এক স্যারকে এক কোটি টাকা দেয়ার বিস্ফোরক দাবিও করেন তিনি। একই সাথে পুলিশ সদস্যদের বেতনভাতা ও রেশন সামগ্রী কেটে নেয়ার বিষয়েও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় অডিওতে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে রাকিবুলকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে ডিএমপির তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যান্টনমেন্ট থানায় নতুন ওসি হিসেবে পরিদর্শক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে পদায়ন করা হয়। ওই দিনই একই থানার পরিদর্শক সুব্রত দেবনাথ বাদি হয়ে দণ্ডবিধির ১২৪-ক (রাষ্ট্রদ্রোহ) ও ১৫৩ ধারায় মামলা দায়ের করলে রাকিবুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে কড়া পুলিশি পাহারায় মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর এ বি এম আব্দুল্লাহ খালেদ সাকিব ঘটনার মূল রহস্য ও অজ্ঞাত সহযোগীদের বের করতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
অন্য দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোর্শেদ হোসেন শাহীন রিমান্ডের বিরোধিতা করে বলেন, আসামিকে সংবিধানে বর্ণিত ২৪ ঘণ্টার আইনি বাধ্যবাধকতা তোয়াক্কা না করে প্রায় সাত দিন ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। অডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে গ্রেফতারকৃত আসামি মো: রাকিবুল হাসান এই মামলার ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসামি বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা ও সহযোগীদের সাথে পরস্পর যোগসাজশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ও আপত্তিকর বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়। তিনি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা, সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা এবং সরকার পতনের চক্রান্তের সাথে জড়িত ছিলেন। তা ছাড়া জনমনে অসন্তোষ ও উসকানি ছড়িয়ে দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়েছেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আব্দুর রব ভুট্টু নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে আওয়ামী নেতার সাথে ওসির বৈঠক শিরোনামে অডিও বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এই বিষয়ে ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো: শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ওসি রাকিবুলকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তার মোবাইলের ডিভাইস ফরেনসিক করার পর সিজার লিস্ট আদালতের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখা হবে। নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কোনো নেতার সাথে যোগাযোগ ছিল কি না বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির কোনো পরিকল্পনাকারী কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে অডিও ভাইরাল হয়েছে সেগুলো তিনি মন্তব্য করেছেন। আমরা জিজ্ঞাসাবাদে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের কথোপকথনের প্রমাণ এখনো পাইনি। তবে তার মোবাইলের ডিভাইস ফরেনসিক করলে আরো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান অতিরিক্ত কমিশনার।








