
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
বরিশালের বাকেরগঞ্জে উপজেলার ১৪টির মধ্যে ১১টি ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসকেরা পালন করলেও ওয়ার্ড পর্যায়ে এখনো প্রশাসক নিয়োগ হয়নি। মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান না থাকায় ১১ জন কর্মকর্তা ইউনিয়নগুলোতে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। এটি কেবল দু’টি উপজেলাতেই নয়, এই চিত্র প্রায় পুরো দেশের স্থানীয় সরকার বিভাগেরই। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় কার্যক্রমে কাক্সিক্ষত গতি ফিরছে না। ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, নাগরিক সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাগজপত্র পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট সংস্কার, স্যানিটেশন, পানি সরবরাহ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সনদ প্রদানসহ সেবামূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পরিষদগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার কারণে এক দিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তৃণমূল সংযোগের অভাবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। এতে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। বিশিষ্ট জন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা এই পরিস্থিতিকে ‘গণতান্ত্রিক শূন্যতা ও চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র মতে, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো থেকে নাগরিকরা সাধারণত কমপক্ষে ১২ ধরনের জরুরি সেবা পেয়ে থাকেন। বর্তমানে এই সেবাগুলোর গতি প্রায় থমকে গেছে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ, নাগরিকত্ব প্রত্যয়নপত্র এবং চারিত্রিক সনদের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য ফাইল দিনের পর দিন আটকে থাকছে। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ ভিজিডি কার্ডের চাল, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার ভাতা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। রাস্তাঘাট মেরামত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নিয়মিত কাজগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্ষায় অনেক পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে এবং মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ, নতুন প্রকল্প অনুমোদন এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফাইল ছাড় করার ক্ষেত্রে আমলারা অতিরিক্ত সতর্ক বা দীর্ঘসূত্রতার নীতি অবলম্বন করছেন। ফলে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন পুরোপুরি থমকে গেছে।
অন্য দিকে মাঠপর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজস্ব দাফতরিক কাজের পাশাপাশি একাধিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলানোর ফলে পূর্ণ সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিরা যেখানে দ্রুত বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, সেখানে প্রশাসকদের অধীনে প্রতিটি ফাইলের জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করতে হচ্ছে। প্রশাসকেরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। ফলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে তাদের অভাব-অভিযোগ শোনার এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের ক্ষেত্রে এক ধরনের উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বায়ত্তশাসন। আমলা বা রাজনৈতিক নেতারা যতই দক্ষ হোন না কেন, তারা কখনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প হতে পারেন না। সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের ধরন হলো আদেশ-নির্দেশ পালন করা, কিন্তু স্থানীয় সরকারের কাজ হলো জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান খোঁজা। বর্তমান স্থবিরতা প্রমাণ করে যে, জনপ্রতিনিধি ছাড়া স্থানীয় সরকার চালানো একটি ব্যর্থ ধারণামাত্র।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. তোফায়েল আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমে জানান, বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক বা অতি-কেন্দ্রীভূত শাসন চলছে। একজন ইউএনও-কে যখন নিজের দাফতরিক কাজের বাইরে দু’টি পৌরসভা এবং একটি উপজেলার দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তিনি কোনো কাজই শতভাগ সুচারুভাবে করতে পারেন না। এটি আমলাদেরও দোষ নয়, ব্যবস্থার ত্রুটি। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো স্থানীয় সরকার কাঠামো সংস্কার করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। তা না হলে তৃণমূলের ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় আকার ধারণ করতে পারে।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব স্থানীয় সরকারের এই স্থবিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং একে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল বলে মন্তব্য করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এই সঙ্কটের রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক তুলে ধরে গণমাধ্যমে বলেছেন, স্থানীয় সরকার হলো জনগণের সবচেয়ে কাছের আয়না। আজ আমলারা বা পলিটিক্যাল লোকজন সেখানে বসে আছেন, যারা জনগণের ভোটে নির্ভাচিত নন। সাধারণ মানুষের সাথে কোনো আত্মিক যোগাযোগ নেই। ফলে দুর্নীতি ও হয়রানি আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। জনগণ ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না। আমরা মনে করি, রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রাথমিক ধাপ হওয়া উচিত স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং তা কেবল জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমেই সম্ভব।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনগুলোতে নাগরিক সেবা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রায় সিটিতেই বিএনপি সরকার দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করেছে। এখানে কাউন্সিলর না থাকায় নগরবাসীকে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মূলত কাউন্সিলররা নিজ নিজ ওয়ার্ডের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ,পরিচ্ছন্নতা, সড়কবাতি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এলাকায় এডিস মশক নিধন, মশারি বিতরণ, বিভিন্ন টিকা ক্যাম্পেইন এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। স্থানীয় পর্যায়ে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনকে সহায়তা করেন। নগরবাসীর সমস্যা এবং অভিযোগগুলো সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায় উত্থাপন করা এবং সিটি করপোরেশনের সাথে ওয়ার্ডবাসীর মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন কাউন্সিলররা। করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মধ্যে ঢিলাভাব দেখা গেছে। রাস্তাঘাটে ময়লা পড়ে থাকছে দিনের পর দিন। মশা নিধনে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া অন্যান্য নাগিরক সেবাও থমকে আছে। নির্বাচনের জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আগে জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিতেন। সরকারি ও বিদেশী অর্থায়নে সেগুলো বাস্তবায়ন হতো। গত ছয় মাসে একটিও নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। নতুন প্রকল্প না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই উন্নয়ন কার্যক্রম থেমে যায়। আগে মেয়র-কাউন্সিলররা তাদের স্বার্থেই এসব প্রকল্প গ্রহণ ও বরাদ্দের জন্য সর্বক্ষণ তদবির-সুপারিশ করতেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দফতরে সবসময় সারা দেশের জনপ্রতিনিধিরা আসতেন। এখন সেখানে দু-একজন ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায় না।
অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, আগে সপ্তাহে একজন হলেও বিদেশী দাতাসংস্থার প্রতিনিধি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সাথে সচিবালয়ে সাক্ষাৎ করতেন। তারা নানাভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিতেন। সেই কার্যক্রম এখন একেবারে নেই বললেই চলে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ নয়া দিগন্ত বলেন, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে দেশে সব সেবা কার্যক্রম প্রান্তসীমা পর্যন্ত যায়। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা তাদের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। হাজার হাজার জনপ্রতিনিধির শূন্যতার কারণে দেশের সাধারণ মানুষ এ সুবিধা পাচ্ছেন না। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জন্মনিবন্ধন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাপক মাত্রায় ব্যাহত হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রশাসক বসানো হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রশাসক কখনোই জনপ্রতিনিধির মতো কাজ করতে পারবেন না- এটাই বাস্তবতা। সুতরাং স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন যেভাবেই চিন্তা করি না কেন, তা খুবই জরুরি। এতে কিছুটা হলে অবস্থার উন্নতি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের অধীনেই স্থানীয় সরকার পরিচালিত হতে হবে। অতএব, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত নাগরিকদের সবচেয়ে কাছের আইনি ও সামাজিক আশ্রয়স্থল। প্রশাসকদের অধীনে চলমান এই স্থবিরতা কেবল সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের মূল চেতনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। তাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তৃণমূলের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় জাতীয় তাগিদ। এতে নাগরিক সেবা একটু হলেও বাড়বে।








