ইউরোপের রাজনীতিতে চরমপন্থার মূল্য দিচ্ছে মানুষ

 আলজাজিরার বিশ্লেষণ
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ক্ষমতায় এসেছেন দেড় বছরও হয়নি। এর মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা নেমে গেছে রেকর্ড সর্বনি¤œ পর্যায়ে। তার নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) সম্প্রতি একটি রাজ্য নির্বাচনে হেরেছে এবং আরেকটিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দেশজুড়ে দলটির জনপ্রিয়তাও দ্রুত কমছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যমে এখন মের্ৎসকে নিয়েই আলোচনা। দুর্বল নির্বাচনী প্রচার, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সাথে অজনপ্রিয় জোটে নিজেকে আটকে ফেলা এবং উগ্র ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) যেভাবে তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছে, সেভাবে না পারার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে এগুলো মূল সমস্যার তুলনায় গৌণ- এমনটাই মনে করেন গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারুফাকিস।
তার মতে, জার্মানিতে শুধু একটি দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দলের পতন হচ্ছে না; একই সাথে ‘মধ্যপন্থী’ রাজনীতিকদের সংযত ও দক্ষ কারিগরি নীতিনির্ধারক হিসেবে যে ইমেজ  এত দিন ধরে তৈরি করা হয়েছিল, সেটিও ভেঙে পড়ছে।
ভারুফাকিসের ভাষ্য, তিন দশক ধরে মধ্যপন্থা ও দক্ষতার যে আবরণ ধরে রাখা হয়েছিল, এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, এসব রাজনীতিক বাস্তবে না ছিলেন যথেষ্ট মধ্যপন্থী, না ছিলেন যথেষ্ট দক্ষ। তার মতে, দীর্ঘদিনের নীতির ব্যর্থতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেই আবরণ আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ইয়ানিস ভারুফাকিসের মতে, ধীরে ধীরে, পরে হঠাৎ করেই সেই মুখোশ খুলে পড়ছে। তার অভিযোগ, নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনীতিকরা এমন কিছু নীতি অনুসরণ করেছেন, যা জার্মান সমাজের নিজেকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে এবং ইউরোপের মাটিতে একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ভারুফাকিসের যুক্তি, ধূসর স্যুট পরা এবং শান্ত স্বরে বারবার ‘কোনো বিকল্প নেই’ বলা নীতিকে চরমপন্থী বলে মনে হয় না, যতক্ষণ না সেই নীতির ব্যর্থতা বড় আকারে দৃশ্যমান হয়। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে যে পরিবর্তনটি ঘটেছে, তা হলো মধ্যপন্থী রাজনীতিকদের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতির ফলে শিল্প হ্রাস ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর উপেক্ষা করার মতো অবস্থায় নেই।
তিনি মনে করেন, এএফডির উত্থানের কারণ এই নয় যে রাতারাতি লাখো জার্মান নাগরিক উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন। বরং বছরের পর বছর কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির ফলে মানুষ নিজেদের সামাজিক অবস্থান হারানোর আশঙ্কা এবং প্রকৃত দারিদ্র্যের সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়েছে। সেই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েই উগ্র ডানপন্থীরা অতীতের একটি কল্পিত ‘সোনালি যুগে’ ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষাকে নির্বাচনী সমর্থনে পরিণত করতে পেরেছে বলে তার দাবি।
ভারুফাকিসের মতে, বার্লিন থেকে প্যারিস, লন্ডন- সর্বত্র একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতি দেশটিকে উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ম্যাক্রোঁ এমন একটি ‘ফরাসি পুনর্জাগরণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা জার্মানির সাথে গড়ে ওঠা মুদ্রা ইউনিয়নের কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে দাবি ইয়ানিস ভারুফাকিসের।