
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে নতুন নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো তারিখ বা তফসিল ঘোষণা হয়নি। এ অবস্থায় দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। অন্য দিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বলছে, আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পরই নতুন নির্বাচন হওয়া উচিত। জাতীয় ছাত্রশক্তি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও নিয়মিত ও দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, হলগুলোর পরিস্থিতি ও সামগ্রিক পরিবেশ পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর এমন ভিন্ন অবস্থানে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক দিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি উঠছে, অন্য দিকে নির্বাচনকে ঘিরে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে কবে নাগাদ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের পর ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়। এক বছর দায়িত্ব পালনের পর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে নতুন নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন হওয়া দরকার। একজন শিক্ষার্থী বলেন, ডাকসু নির্বাচন ‘ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রত্যেক বছর’ হওয়া উচিত। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, গঠনমূলকভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে তাদের জন্য কাজ করবেন।
এদিকে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির অভিযোগ, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হলেও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। সংগঠনটি বলছে, তারা আগে থেকেই প্রশাসনকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা জানিয়ে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের মহিউদ্দিন খান বলেন, সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রশিবির চায় না নির্বাচনে কোনো বিলম্ব হোক। প্রশাসনকে আগে থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানানো হলেও কোনো এক কারণে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হচ্ছে না।
অন্য দিকে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দ্রুত নির্বাচনের পরিবর্তে আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলছে। সংগঠনটির নেতাদের বক্তব্য, গতবারের মতো কোনো বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি করে নির্বাচন আয়োজন করা উচিত নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যেসব সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলো আগে সম্পন্ন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী বলেন, তারা গত নির্বাচনের মতো নির্বাচন চান না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার আগে করতে হবে। এরপরই নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে তারা অবস্থান নেবেন।
এদিকে জাতীয় ছাত্রশক্তিও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের জন্য ডাকসু কার্যকর থাকা এবং নিয়মিত নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। নির্বাচনকে দীর্ঘায়িত না করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সংস্কার সম্পন্ন করে দ্রুত তফসিল ঘোষণার উদ্যোগ নেয়ার পক্ষে তারা। জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় সম্প্রতি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে।
এদিকে ডাকসু নির্বাচন বাস্তবায়নে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট মঙ্গলবার মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলো হলো- প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা; প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করা; সভাপতি ও প্রশাসনের একক ক্ষমতা কমিয়ে ক্ষমতা কাঠামোয় ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা নিশ্চিত করা।
এদিকে ছাত্রশিবিরের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি জানতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর নির্বাচন নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ জানাতেই পারেন। তবে প্রশাসনও নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে। হলগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এসব বিষয় পর্যালোচনা করে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ নয়, ভোটের উপযোগী পরিবেশও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। হলগুলোর পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং সার্বিক ক্যাম্পাস পরিস্থিতি পর্যালোচনার পরই নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।
এদিকে ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কাজ করতে পারবেন বলে মনে করছেন তারা। একই সাথে নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








