সারের ডিলারশিপ নিয়ে চাপে মাঠ প্রশাসন

 শামছুল ইসলাম

নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগকে কেন্দ্র করে চাপে রয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেতে নানাভাবে তদবির করছেন। 
কিছুদিন আগে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যুতে অর্ধশত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) হামলা, ভাঙচুর, হুমকির ঘটনা ঘটে। ফলে রাজনীতিবিদদের এসব তদবির উপেক্ষা করে যোগ্য ব্যবসায়ীদের সুপারিশের সাহস পাচ্ছেন না মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মতামত নিয়ে সে অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। এসব ডিলারশিপের জন্য ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি হচ্ছে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 
২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার আলোকে প্রথমে আবেদনপত্রগুলো জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই শেষে দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে। উপজেলা কমিটি তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। এরপর উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত প্রত্যেক প্রার্থীর তথ্য জেলা কমিটি পুনরায় যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন প্রার্থীর প্রস্তাব সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাবিত প্রার্থীদের আবেদনপত্র ও তথ্য পরীক্ষা করে ইউনিয়ন প্রতি একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদন করা হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। মাঠ প্রশাসনের এই দুই কর্মকর্তাই নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের কয়েকটি জেলার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ডিলার নিয়োগ কেন্দ্র করে ব্যাপক তদবির চলছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি পত্র (ডিও) লেটার এবং ইউএনও-ডিসির কাছে তদবিরের জন্য ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করছেন ডিলার প্রত্যশীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেরপুরের একজন ডিলার প্রত্যাশী জানান, ডিলারশিপ নেয়ার জন্য আবেদন করেছি। এটি নিশ্চিত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্ট একটি দফতরে যোগাযোগ করা হলে একটি রাজনৈতিক দলের জেলার শীর্ষ নেতার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী সেই নেতার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে গেলে বলা হয় আরেকজন ৩৫ লাথ দিতে রাজি হয়েছে। তুমি যদি এর চেয়ে বাড়াতে পারো তাহলে কথা বলতে পারি। সেই ব্যবসায়ী এতটাকা দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় সেখান থেকে চলে আসেন। 
মাঠ প্রশাসনের একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিলার নিয়োগের জন্য নানামুখী তদবির আমার কাছে আসছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা চাইলে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের কথা অনুযায়ী সুপারিশ পাঠাতে বলেছেন। আমিও সেভাবেই কাজ করছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা শুধু কাগুজে যোগ্যতার পরিবর্তে পর্যাপ্ত গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা, সারের বাজারজাতকরণে অভিজ্ঞতা, সততা ও কৃষকবান্ধব মনোভাবকে গুরুত্ব দেয়া হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ হলে কৃষকরা সঠিক সময়ে নির্ধারিত দামে সার পাবেন এবং কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা সহজ হবে।
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী সার পরিবহনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সুযোগে কৃষকদের কাছ থেকে সারের অতিরিক্ত দাম আদায় করা হতে পারে। সারে নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে গত ২৭ আগস্ট একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুবিধা থাকবে না। ডিলারের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে বাতিল বা নবায়ন করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন সার ডিলার (এখন দু’জন) নিয়োগ করা যাবে। প্রতিটি পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগ দেয়া যাবে। নতুন ডিলার নিয়োগে এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকে পরিবেশক পদে আবেদন করছেন।