
শাহেদ মতিউর রহমান
* বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই নতুন বই পাবে শিক্ষার্থীরা
* ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা
বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে এবার অনেক আগেই সুখবর দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর এই দিনে যেখানে পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র কিন্তু এ বছর ঠিক ওই একই দিনে ১৫০ উপজেলায় মুদ্রিত পাঠ্যবই পৌঁছে গেছে। একই সাথে এ বছর বইয়ের ছাপা ও কাগজের মান নিয়ন্ত্রণেও কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। দু-চারটি প্রেস ছাড়া বাকি অধিকাংশ প্রেসেও বই ছাপার কাগজ, কালি, গ্লু, বাইন্ডিং, কাটিং এবং অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহারেও গুণগত মান ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। এনসিটিবি তাদের পরিকল্পনায় এবার ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ছুটি হওয়ার সময়েই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিতে চায়। আর এ জন্য ৩০ নভেম্বরকে টার্গেট রেখে দেশের সব জেলা উপজেলায় শতভাগ পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে এনসিটিবি।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে অতীতের যেকোনো সময়ের রেকর্ড ভেঙে এবার মধ্য সেপ্টেম্বরেই শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলা উপজেলায়। ইতোমধ্যে প্রাথমিক, প্রাক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ইবতেদায়ি এবং কারিগরির বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিভিন্ন জেলার ১৪০টির বেশি উপজেলায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৯২ লাখ বইয়ের চাহিদার বিপরীতে ইতোমধ্যে এক কোটির বেশি বই পৌঁছে গেছে বিভিন উপজেলায়। এনসিটিবি আশা করছে এবার ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জেলা উপজেলায় পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। একই সাথে সরকারেরও টার্গেট হলো এ বছর ডিসেম্বরের আগেই বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা ছুটিতে যাওয়ার সময়েই নতুন বই নিয়ে তারা (শিক্ষার্থীরা) ছুটি কাটাবে। বার্ষিক পরীক্ষার পর নতুন শিক্ষা বছর শুরুর আগের এই সময়টাতে শিক্ষার্থীরা নতুন ক্লাসের নতুন বই সাথে নিয়ে ছুটি উপভোগ করবে। আর এ জন্য এনসিটিবির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পুরো টিম দিনরাত কাজ করছেন। এমনকি শুক্রবার এবং শনিবার ছুটির দিনেও তারা পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজের তদারকির জন্য সেই নির্ধারিত পাওনা ছুটিও কোনো কর্মকর্তা ভোগ করছেন না। একই সাথে প্রতিদিনের কর্মঘণ্টার পরেও রাত ৮-৯টা কিংবা প্রয়োজেন মধ্যরাত অবধি চেয়ারম্যনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণও কাজ করছেন। এবার সবার একটিই উদ্দেশ্য যেকোনো মূল্যে এনসিটিবি ভালো মানের পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে বদ্ধপরিকর।
এনসিটিবি নিয়োগকৃত পিডিআই (প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন) এজেন্ট কর্তৃক দাখিলকৃত রিপোর্টের আলোকে গত ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিকের মোট বইয়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পৌঁছে গেছে ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৩৯১ কপি বই। এই সংখ্যা মোট বইয়ের ৫৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সাথে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণীর মোট বইয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ২২ লাখ ৫৩ হাজার ১০২ কপি বই। এই সংখ্যা মোট বইয়ের ২১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সূত্র জানায়, প্রাথমিকের দ্বিতীয় তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণীতে যথাক্রমে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বই জেলা উপজেলায় পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ সবমিলিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের ৮ কোটি ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫১ কপি বইয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে জেলা উপজেলায় এক কোটি ৫০ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কপি বই পেঁছে গেছে। শতকরা হিসেবে এই হার মোট বইয়ের ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের দেয়া তথ্য মতে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশের উপজেলা পর্যায়ে ৫১৬টি রিসিভিং পয়েন্টের মধ্যে বাংলা ভার্সনের প্রাক প্রাথমিকের বই ১৩৮টি উপজেলায় রিসিভ করা হয়েছে। মোট বইয়ের শতকরা হিসেবে এই হার প্রায় ২২ শতাংশ (২১ দশমিক ৮০)। অন্য দিকে প্রাথমিক স্তরের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ এবং পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের উপজেলা পর্যায়ের ৫১৬টি রিসিভিং পয়েন্টের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৪৪টি উপজেলায় এই বই রিসিভ করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের বই বিতরণ শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মাঠপর্যায়ে থেকে চালানের ভিত্তিতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাক প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সর্বমোট ৮ কোটি ১১ লাখ ৯০ হাজার ২০ কপি বইয়ের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ কোটি ৫২ লাখ ৮ হাজার ৬৫৯ কপি বই পিডিআই ছাড়পত্র নিয়ে সরবরাহ করা হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই এসব বই উপজেলায় রিসিভিং পয়েন্টে পৌঁছে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি শতভাগ বই জেলা উপজেলার রিসিভিং পয়েন্টে পৌঁছে যাবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বই বিতরণ ও তদারকির কাজে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এবার অনেক সহজে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জেলা উপজেলায় বই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলার শিক্ষা অফিস থেকে বইয়ের প্রাপ্তি স্বীকার পত্রও সাথে সাথেই ডিপিইতে ই-মেইলের মাধ্যমে রিপোর্ট (অবহিত) করা হচ্ছে।
এ দিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশের মোট ১৪০টির বেশি উপজেলায় পাঠ্যবই পৌঁছে গেছে। এই উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাইবান্ধা জেলা ফুলছড়ি, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর, সুন্দরগঞ্জ, জলঢাকা, ডিমলা, ডোমার, বীরগঞ্জ, রংপুর জেলা, নওগাঁ জেলার সদর, নেয়ামতপুর, মান্দা রানীনগর, পাবনা জেলার ঈশ্বরদী, চাটমোহর, পাবনা সদর, বেড়া, ভাঙ্গুড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, বগুড়ার গাবতলী, বগুড়া সদর, রাজশাহীর চারঘাট, তানোর, পবা, পুঠিয়া, বাঘমারা, বাঘা, বোয়ালিয়া, মোহনপুর, সিলেটের কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, সিলেট, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় বই পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
একই সাথে ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, মনিরামপুর, সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া, তালা, সাতক্ষীরা সদর, কুমিল্লা জেলার তিতাস, দাউদকান্দি, ব্রাহ্মণপাড়া, মনোহরগঞ্জ, সদর দক্ষিণ, হোমনা, বি.বাড়িয়া জেলার আখাউড়া, আশুগঞ্জ, কসবা, নবীনগর, নাসিরনগর, কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জ নিকলী, বাজিতপুর, মিঠামইন, ফরিদপুরের মধুখালী, সালথা, কালুখালী, গোয়ালন্দ, পাংশা রাজবাড়ী সদর, পিরোজপুরের ইন্দুরকানী, কাউখালী, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, মঠবাড়িয়া, নেত্রকোনা সদর, বারহাট্টা, গফরগাঁও, গৌরীপুর, তারাকান্দা, ধোবাউড়া, নান্দাইল, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ জেলা, ঝিনাইগাতী এবং শেরপুর সদর উপজেলাসহ আরো বেশ কিছু জেলা উপজেলায় পাঠ্যবই পৌঁছে গেছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা নয়া দিগন্তকে জানান, অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। তারপরেও সময়ের সাথে কাজের সমন্বয়ে এবার আমরা অনেকটাই এগিয়ে আছি। অবশ্য শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনা এবং সেই অনুযায়ী কাজের প্রতিটি ধাপে ধাপে আমাদের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স করেই কাজ করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক উপজেলায় পাঠ্যবই পৌঁছে যাওয়ার ফলে আমাদের হয়তো সন্তুষ্টি আছে তবে এই কাজের মাধ্যমে বাকি কাজের বিষয়ে কোনো প্রকার আত্মতৃপ্তি বা শৈথিল্য প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছি ২০২৭ সালের শুরুর দিনটি হবে আগামী দিনের জন্য উদাহরণ তৈরির একটি দিন। আমাদের চেষ্টা থাকবে সময় মতো সব শিক্ষার্থীদের হাতে শুধু বই তুলে দেয়া নয় বরং মানসম্পন্ন বই দেয়া। অতীতের কোনো খারাপ দৃষ্টান্ত যেন এনসিটিবিতে আর ঝেঁকে বসতে না পারে সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। আর এ জন্য এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ইন্সপেকশন এজেন্ট, মিডিয়াকর্মী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সবার সহযোগিতা নিয়ে এবারের পাঠ্যবই মুদ্রণ থেকে শুরু করে মাননিয়ন্ত্রণ, পরিবহন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা কাজ করছি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








