
প্রচলিত সামরিক শক্তির মাপকাঠি— বিমান, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট, সামরিক ঘাঁটি, মেরিন বা পদাতিক ফৌজ এবং বাজেট, সব দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তুলনায় বিপুলভাবে শক্তিশালী। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সবসময় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে না। ইরানের কৌশল হলো, প্রচলিত শক্তির মাধ্যমে নয়; বরং অসমন্বিত প্রতিরোধ, অনিশ্চয়তা, পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের ওপর আত্মসমর্পণের চাপ সৃষ্টি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এটাই ইরানের Subterranean Defence Strategy (SDS) বা ভূগর্ভের প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল দর্শন। এর লক্ষ্য প্রচলিত যুদ্ধে জয়ী হওয়া নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে এমন মূল্য দিতে বাধ্য করা, যা তার কাছে মোটেই প্রতিরোধযোগ্য নয়। SDS-এর কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো গভীর সুরক্ষা, বিচ্ছিন্নতা, পুনরাবৃত্তি বা বিকল্প ব্যবস্থা, গোপনীয়তা, চলমান অস্ত্র মোতায়েন ব্যবস্থা এবং অসমন্বিত পাল্টা আঘাতের একটি চমৎকার এবং পরিকল্পিত সমন্বয়। এর উদ্দেশ্য হলো আক্রমণের পরও ধারাবাহিকভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি প্রতিরক্ষা অবকাঠামো তৈরি করা।
গভীর পাহাড়ি এমনকি সমতলেও সুড়ঙ্গের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু তাদের ধ্বংস করা কঠিন বলেই নয়; বরং এগুলো কার্যকরভাবে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। খোলা জায়গায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে; কিন্তু সেটি ভূগর্ভে তাহলে তার অবস্থান চিহ্নিত করাই শত্রুর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আক্রমণকারীকে জানতে হবে যে, সে যথেষ্ট ক্ষতি করেছে কি না। অন্য দিকে দুর্বল পক্ষের সবকিছু রক্ষা করার প্রয়োজনেই— শুধু এতটুকু সক্ষমতা টিকিয়ে রাখলেই চলে, যাতে প্রতিপক্ষেও লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই SDS কয়েকটি ধারাবাহিক ধাপের ওপর নির্ভর করে যেমন— দ্রুত মোতায়েন, পাল্টা-নজরদারি, ছড়িয়ে থাকা অবস্থান এবং আক্রমণের আগে শনাক্তকরণ। এখানে আগে শনাক্ত হওয়াই ধ্বংসের সমান, চাই কী, ধ্বংস সাধনেরও অধিক।
মূল প্রশ্ন অবশ্য এটা নয় যে, আক্রমণকারী কতটা ধ্বংস করতে পারবে; বরং প্রশ্ন হলো, আক্রমণকারীর উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য প্রতিরক্ষাকারী পক্ষ কতটা সময় টিকে থাকতে পারবে? আক্রমণকারী যত দ্রুত প্রতিরক্ষাকারীর টিকে থাকার সময়সীমা সঙ্কুচিত করতে চাইবে, প্রতিরক্ষাকারী ততই সেই সময়সীমা বাড়িয়ে দেবে। প্রতিশোধ বা পাল্টা আঘাতের সম্ভাবনা যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ প্রতিটি ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্র্ণ। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এখানেই হরমুজ প্রণালী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ইরান এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অসাধারণ অর্থনৈতিক মূল্য কেন্দ্রীভূত করেছে, যেখানে যুদ্ধের প্রচলিত সামরিক শক্তির প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
ইরানের পুরো মার্কিন নৌবহরকে পরাজিত করার দরকার নেই। তাকে শুধু এমন পর্যাপ্ত টিকে থাকার সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে— ড্রোন, মাইন এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আক্রমণকারীর জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করা যায়। একজন নেভাল কমান্ডারের কাছে প্রশ্নটা এমন নয় যে, সে নৌযুদ্ধে জয়ী হতে পারবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, সে তার জাহাজ নিয়ে নিরাপদে পার হতে পারবে কি না। এমনকি একটি ছোট সামরিক ঝুঁকিও জাহাজ চলাচল, বীমা, জ্বালানি বাজার, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এভাবেই হরমুজ প্রণালী সীমিত সামরিক সক্ষমতাকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
বহুমাত্রিক প্রতিরোধ ও টিকে থাকার রণনীতি তাই প্রতিরোধ একাধিক পরস্পর-সম্পর্কিত স্তরে কাজ করে : যেমন— ১. বিপুল প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব; ২. ভূগর্ভের ও বিকল্প প্রতিরক্ষাব্যবস্থা; ৩. ভৌগোলিক সুবিধা; ৪. অর্থনৈতিক প্রভাব; ৫. প্রযুক্তিগত ব্যয়ের অসমতা; ৬. লজিস্টিক বাসরবরাহ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতা এবং ৬. সময় বা কালক্ষেপণ কৌশল।
দ্রুত সঙ্ঘাতের জন্য পরিকল্পিত একটি সামরিক অভিযান এমন একটি বিধ্বংসী যুদ্ধে পরিণত হতে পারে, যেখানে দুর্বল পক্ষও কয়েক মাস পর পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম থাকে। এখানে টিকে থাকাটা নিজেই একটি কৌশলগত সম্পদ। শক্তিশালী পক্ষকে সিদ্ধান্তমূলক বিজয় অর্জন করতে হবে; দুর্বল পক্ষকে শুধু সেটিকে অস্বীকার করলেই চলে। এটিই একবিংশ শতাব্দীর প্রতিরোধের একধরনের বিরোধাভাস। প্রচলিত যুদ্ধের শক্তি অক্ষুণ্ন থাকলেও তার ব্যবহার থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি এত বেশি হতে পারে যে, সেই শক্তির কার্যকারিতা কমে যায়।
আধুনিক যুদ্ধ শুধু ধ্বংসের প্রতিযোগিতাই নয়; এটি ধারাবাহিকতারও প্রতিযোগিতা। প্রতিরক্ষাকারীকে দীর্ঘ সময় ধরে পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে, যাতে আক্রমণকারীর ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। SDS-এই টিকে থাকার সময়সীমাকে আরো জটিল করে তোলে, আক্রমণকারীর আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে তোলে এবং পুরো যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এটি ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর একটি লজিস্টিক বা সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জে রূপান্তরিত করে। SDS-এর ভূগর্ভের দিকটি শুধু শারীরিক নয়, ধারণাগতও। এটি আক্রমণকারীকে এমন জায়গায় কাজ করতে বাধ্য করে, যেখানে দৃশ্যমানতা সীমিত, যাচাই করা কঠিন এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করা দুঃসাধ্য। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর একটি অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয়। প্রতিরক্ষাকারীর সুড়ঙ্গ ও গোপন অবস্থান আক্রমণকারীর সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন আকারে দাঁড় করায়, আরো উত্তেজনা বাড়ানো হবে কি না, যদি সেই উত্তেজনা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন নিশ্চিত না হয়?
হরমুজে ইরানের সক্ষমতা কেবল জাহাজ ধ্বংস করার ওপর নির্ভর করে না; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জাহাজ চলাচল যথেষ্ট অনিরাপদ হয়ে ওঠে যে বীমা কোম্পানি, ব্যবসায়ী এবং সরকারগুলোকে তাদের সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবতে হয়। সামরিক ঝুঁকির এই অর্থনৈতিক প্রভাবই শেষ পর্যন্ত একটি কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হয়। সুড়ঙ্গের ভেতর টিকে থাকা কোনো বাহিনী শুধু একটি অস্ত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি অনিশ্চয়তার উৎস, যার প্রভাব বিশ্ববাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একবিংশ শতাব্দীতে অসম প্রতিরোধের এই পরিবেশে বিপুল অগ্নিশক্তির চেয়ে নিশ্চয়তার অভাব তৈরি করাই বেশি সিদ্ধান্তমূলক হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি নতুন হামলা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে; সেই অনিশ্চয়তা সমাধান করতে আরো আঘাত প্রয়োজন হয়, আর প্রতিটি নতুন আঘাত আবার নতুন পরিণতি ডেকে আনে। এটাই ইরানের প্রতিরোধের মূল কথা। SDS-হলো সেই রণস্থাপত্য, যার মাধ্যমে ইরান সেটিই করার চেষ্টা করছে। এটি বিজয়ের পথ নয়; বরং টিকে থাকার পথ। আর অসম সঙ্ঘাতের বাস্তবতায় অনেকসময় টিকে থাকাটাই যথেষ্ট।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








