ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব
ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

(তৃতীয় কিস্তি)

Advertisement

মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক 

বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাকে নিয়োগদান করবেন। তার কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করবেন তদরূপ হবে। তবে উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে তা করার ক্ষমতা রাখেন না। কারণ সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ প্রদানে সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই শেষ কথা। এ ছাড়া ১২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব এবং সব আদালত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীর সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করবেন। সে সম্পর্কে প্রতিবেদন দেবেন। ১২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে অন্য কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের অধীন করা হবে না। ১৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের হিসাব সম্পর্কিত মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদনসমূহ রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন।

Advertisement

চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দফতরটি সংসদের কাছে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান প্রতিষ্ঠান। সিএজি সরকারি দফতর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক, নিয়মিততা এবং পারফরম্যান্স অডিট পরিচালনা করে থাকে এবং অডিট প্রতিবেদন সংসদে দাখিল করে। সরকারি দফতরের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অডিটের এ ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়। সিএজি তার অডিট প্রতিবেদনে সরকারি অর্থের অনিয়মিত ব্যয়, অপচয়, চুরি, দুর্নীতি এবং ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে বিভিন্ন দফতর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে। তবে, সিএজি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আছে। অডিটের উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং তার ক্ষেত্র নির্ধারণ ছাড়া খণ্ডিতভাবে অডিট পরিচালিত হয়। অডিট প্রতিবেদনগুলো প্রায়ই সময়মতো প্রস্তুত বা দাখিল করা হয় না, ফলে জবাবদিহির কাঠামোতে অডিটের গুরুত্ব হারিয়ে যায়।’ 

এরূপ বিবেচনায় কমিশন নিম্নলিখিত সুপারিশ করে : 

‘(ক) কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের দফতরকে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, হিসাব বিভাগ হতে অডিটের পৃথকীকরণ এবং অডিটের গুণগতমান উন্নতির জন্য নিরীক্ষা আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রজাতন্ত্রের বিদ্যমান হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগকে আলাদা করার সুপারিশ আগেও বিভিন্ন কমিশন করেছে। বর্তমান কমিশন একই সুপারিশ করেছে। নিরীক্ষা আইনে পারফরম্যান্স অডিটিংকে জোর দিতে হবে এবং আলোচ্য প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরে পাঠাতে হবে যাতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
(খ) নিরীক্ষা আইনের অধীনে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডার বিভাজনসহ সবস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং অডিট ও হিসাব বিভাগকে প্রশাসনিকভাবে এবং কর্ম-বিভাজনের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ পৃথক করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
(গ) প্রস্তাবিত নিরীক্ষা আইনে প্রতি বছর নির্দিষ্ট মাসে নিরীক্ষা ও নিরীক্ষিত হিসাব প্রতিবেদন দাখিলের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
(ঘ) উক্ত আইনে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের বর্তমান দফতরকে সচিবালয় হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। 
(ঙ) অডিট ও হিসাব বিভাগ পৃথকীকরণের পরে সিজিএ, সিজিডিএফ এবং রেলওয়ে হিসাব বিভাগ অর্থ বিভাগের অধীনে ন্যস্ত থাকবে। হিসাব মহা নিয়ন্ত্রক (সিজিএ) অর্থ বিভাগের পক্ষে সিভিল, প্রতিরক্ষা এবং রেলওয়ে বিভাগের হিসাব সমন্বয় করে জাতীয় আর্থিক হিসাব প্রণয়নে দায়বদ্ধ থাকবেন।
(চ) স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অর্থ ব্যবহার করে বিধায় সেগুলোর নিরীক্ষা কার্য নিরীক্ষা বিভাগ কর্তৃক সম্পাদিত হওয়ার বিধান করা যেতে পারে।’ 
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের পদটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ হিসেবে গণ্য করে এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে নিম্নরূপ সুপারিশ করে :
‘মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ : সংবিধানের ১২৭ (১) সংশোধনপূর্বক বিধান করা হবে যে,
(ক) (১) জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হতে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার (যিনি এ বাছাই কমিটির প্রধান হবেন), (২) সংসদ উপনেতা, (৩) বিরোধীদলীয় উপনেতা, (৪) জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ, (৫) জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, (৬) জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং (৭) জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে বিদায়ী মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পূর্বে আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন আগ্রহী ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ ও ‘জীবনবৃত্তান্ত’ আহ্বান করাসহ উপযুক্ত প্রার্থীর অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
(খ) অনুসন্ধানে প্রাপ্ত প্রার্থীদের ‘জীবনবৃত্তান্ত’ যাচাই-বাছাই করত উক্ত বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে বাছাই করে তাদের মধ্য হতে একজনকে মহা হিসাব-নিরীক্ষক পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রস্তাব প্রেরণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাকে কার্যভার গ্রহণের তারিখ হতে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।
(গ) বিদায়ী মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো সময় ব্যতিরেকে নবনিযুক্ত মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যভার গ্রহণ করবেন।
(গ) মহা হিসাব-নিরীক্ষক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, বয়সসীমা, কর্মের শর্তাবলি ও কর্মপরিধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা, পদত্যাগ ও পুনঃনিয়োগলাভের সুযোগ/অধিকার ইত্যাদি সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
(ঘ) সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত মহা হিসাব-নিরীক্ষক অপসারিত হবেন না।
(ঙ) ‘মহা হিসাব-নিরীক্ষক তার দফতরের দায়িত্ব/কর্ম পালনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করতে পারবেন’ বাক্যসমূহ, শব্দসমূহ ও চিহ্নসমূহ প্রতিস্থাপিত হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে ভোটারদের কাছে যে ক’টি প্রশ্ন করা হয়েছিল তার মধ্যে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার মানে দেশের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারগণ সংবিধান সংষ্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে।  জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এ বিষয়ে যে সুপারিশ করে বিএনপি তাতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়। দলটির ২০২৬ সালের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। শুধু একটি বাক্যের অংশ বিশেষে বলা হয়েছে যে, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। এর মানে এটি দাঁড়ায় যে, দলটি এ পদের নিয়োগে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির বিষয়টিতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অদ্যাবধি সংবিধানের অন্যান্য সংস্কারের বিষয়গুলোর সাথে পদটির সংস্কারের বিষয়টিও ঝুলে আছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার

সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের মূলনীতি তথা ‘অধিকার ও কর্ম’ শিরোনামে বলা হয়েছে : ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থার সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক-সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।’ লক্ষণীয় যে, উক্ত অনুচ্ছেদে দুর্নীতি প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে ‘চেষ্টা’ চালাতে বলা হয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমন করতে সাংবিধানিক কোনো সংস্থা না থাকলেও আইনের আওতায় গঠিত প্রথমে দুর্নীতি দমন ব্যুরো এবং পরে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে আলাদা মর্যাদা দেয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন’ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘দুর্নীতি বাংলাদেশের সর্বস্তরে ক্রমশ ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে। এর সর্বগ্রাসী প্রভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জনআকাক্সক্ষা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ কমিশন আরো উল্লেখ করে যে, ‘দুর্নীতির বিস্তার রোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিগত বছরগুলোয় শুধু যে কাক্সিক্ষত মাত্রায় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে তা-ই নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে দুদকের ইচ্ছাকৃত/প্রশ্নবিদ্ধ নিষ্ক্রিয়তা অলিগার্কিক ও চৌর্যতান্ত্রিক ক্ষমতা-কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এমতাবস্থায়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে, তার সফল বাস্তবায়নে দুদকের ব্যাপক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।’ 

অন্য দিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে দুদক সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ দেয়, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর হতে কখনো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে নাই। এটি ক্ষমতাসীন সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত বা মামলা করার ক্ষেত্রে সংস্থাটি সরকার নিযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল। দুদকের প্রধান ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাগণ ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্যের ভিত্তিতে মনোনীত হয়েছেন।’ 

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের ভিত্তিতে সুপারিশ করে যে, 
‘(ক) যেহেতু বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, সেহেতু সেটিকে ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে সংবিধানে নিম্নরূপ একটি নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হবে : দেশে একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন থাকবে এবং এই কমিশনের নিয়োগ ও কার্যক্রম পর্যালোচনার লক্ষ্যে একটি ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠিত হবে।’
(খ) প্রধান বিচারপতি ব্যতীত, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি (যিনি এই বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটির চেয়ারম্যান হবেন), সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের সংসদ নেতা কর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন প্রতিনিধি এবং প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত একজন নাগরিক প্রতিনিধি, যিনি দুর্নীতিবিরোধী ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন; তাদের সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য কমিশনারদের নিয়োগের উদ্দেশ্যে আগ্রহী ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ ও ‘জীবনবৃত্তান্ত’ আহ্বান করাসহ উপযুক্ত প্রার্থীদের জন্য অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ কমিটি আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে— (ক) দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে নাম বাছাই করে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ এবং (খ) নিয়মিতভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য কমিশনারসহ পাঁচজনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী হবেন।
(খ) উক্ত কমিটি উপযুক্ত প্রার্থীদের আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে তাদের মধ্য হইতে একজনকে চেয়ারম্যান/সভাপতি এবং অনধিক চারজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাদের কার্যভার গ্রহণের তারিখ হতে পরবর্তী চার বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।
(গ) সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো কমিশনার অপসারিত হবেন না।
(ঘ) দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে বাছাই প্রক্রিয়া, নিয়োগলাভের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, বয়সসীমা, কর্মের শর্তাবলি ও কর্মপরিধি, কার্যক্রম পর্যালোচনা, স্বচ্ছতা জবাবদিহির ব্যবস্থা, পদত্যাগ ও পুনঃনিয়োগ লাভের সুযোগ/অধিকার ইত্যাদি সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
(ঙ) দুর্নীতি দমন কমিশন উহার দফতরের দায়িত্ব/কর্ম পালনের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে।
ঐকমত্য কমিশন আরো সুপারিশ করে, সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০(২) নিম্নরূপে প্রতিস্থাপন করা হবে : ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টি করিবে, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার করিতে পারিবেন না ও অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক ও কায়িক, সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।’ এর মাধ্যমে কাজটি শুধু ‘চেষ্টা’ নয়, রাষ্ট্রের একটি মৌলিক কাজ বলে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য, ঐকমত্য কমিশনের উপর্যুক্ত প্রস্তাবের বিষয়ে জামায়াত ও এনসিপিসহ ২৩টি রাজনৈতিক দল একমত হলেও বিএনপিসহ কয়েকটি ছোট দল ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) প্রদান করে। তবে ঐকমত্য কমিশন দুর্নীতি দমনে আইনি সংস্কারে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব পেশ করে, যেমন : বৈধ উৎসবিহীন আয়কে বৈধতা দানের চর্চা বন্ধ করা, রাষ্ট্রীয় ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন ও প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, দুর্র্নীতি ও অর্থপাচার রোধে সুবিধাভোগী মালিকানাসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করা, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ, দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের করণীয়, বিদ্যমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইন সংশোধন, আয়কর আইনের কতিপয় ধারা সংশোধন, বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে শাস্তির আওতায় আনা, দুর্নীতি বিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ প্রায় সব দল একমত পোষণ করে।
উল্লেখ্য, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমন ও দুদক সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা হলো : ‘বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্ট ক্ষতের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।’ এতে আরো বলা হয় যে, ‘দুদক সংস্কারসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয় বলে বিএনপি মনে করে।’
স্মরণ করা যেতে পারে যে, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন মোট ৪৬টি সুপারিশ করেছিল যা সে সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোসহ দেশ-বিদেশে বেশ প্রশংসিত হয়। যাই হোক, বিএনপি সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে প্রায় আট মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ কী আমরা দেখতে পাচ্ছি? 

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব 
ayubmiah@gmail.com