
ইউরোপসহ দেশে দেশে অদ্ভুত এক আলামত দেখা যাচ্ছে। অনেক দেশ নিজের নাগরিকদের বলছে, খাবার-দাবার, পানি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ রাখতে। হঠাৎ কোনো বিপদ দেখা দিলে বাইরের কারো সাহায্য ছাড়াই তারা যেন কিছু সময় নিজের মতো করে চলতে পারেন। কিছু সময় বলতে কোনো দেশ তিন দিন, কোনো দেশ ১০ দিনের সীমা বেঁধে দিচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। আর তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলছে দেশগুলোর সরকার।
বিষয়টি অদ্ভুত এ জন্য যে, আসন্ন বিপদে কোনো দেশের সরকার এমন বার্তা দেয় না। সাধারণত যেটি হয়— যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিলে সরকারগুলো জনগণকে আগে আশ্বস্ত করে। নিজেদের প্রস্তুতি জানিয়ে জনগণকে ভরসা দেয় যে, আমরা যেকোনো মূল্যে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে প্রস্তুত ও সক্ষম।
এরপর নাগরিকদের সম্ভাব্য বিপদে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির পরামর্শ এবং করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়। এবারে ঘটছে তার ঠিক বিপরীত। জনগণ জানে না কী বিপদ আসতে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারগুলো নিজের উদ্যোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে, প্রস্তুতি নিয়ে রাখো মহাপ্রলয়ের। হ্যাঁ, এই সতর্কবার্তার নাম তারা দিয়েছে ‘ডুমস ডে ওয়ার্নিং’ বা মহাপ্রলয়ের হুঁশিয়ারি।
যারা নিয়মিত বিশ্বের খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অন্তত ৩৩টি দেশ নাগরিকদের জন্য এ জরুরি দুর্যোগ প্রস্তুতি বা সেলফ-প্রিপেয়ার্ডনেস দিকনির্দেশনা জারি করেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাইবার যুদ্ধ ও জলবায়ু সঙ্কটের চরম অবনতি ঘটায় এই সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। এটি মূলত একটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা (সিভিল ডিফেন্স) সতর্কবার্তা। বলা হচ্ছে— যেকোনো বড় সঙ্কটের সময় সরকারের উদ্ধারকারী দল বা ত্রাণ পৌঁছাতে না পারলেও প্রতিটি পরিবার যেন কয়েক দিন নিজের মতো করে টিকে থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের যেসব প্রধান অঞ্চলে এ হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে আছে— যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ড। দেশগুলো নাগরিকদের বিদ্যুৎ, পানি বা ইন্টারনেট ছাড়া অন্তত তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) টিকে থাকার মতো খাদ্য ও জরুরি রসদ মজুদ করতে বলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ এবং নর্ডিক বা উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় দেশগুলো একটি প্রস্তুতিমূলক সংগঠনই দাঁড় করিয়েছে প্রিপারইইউ অ্যাভাইসারি গ্রুপ নামে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেন তার ৫২ লাখ পরিবারের মধ্যে ‘সঙ্কট বা যুদ্ধের মুখোমুখি হলে’ শিরোনামে পুস্তিকা বিলি করেছে। দেশটি এক সপ্তাহের রসদ রাখতে বলেছে। নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও জার্মানি বলেছে ১০ দিনের প্রস্তুতি রাখতে।
ঘটনা কেবল ইউরোপে সীমিত নেই, হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক ফেনোমেনা। মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চিলির মতো দেশগুলোও তিন থেকে সাত দিনের জরুরি খাদ্য রিজার্ভ করতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র অনলাইনে একটি বিশেষ সাইট (Readz.gov) তৈরি করে নাগরিকদের ইমার্জেন্সি কিট বা জরুরি মজুদ প্রস্তুত রাখার তাগিদ দিয়েছে।
এশিয়ায় জাপান, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ইসরাইল, ফিলিপাইন ও ভারত নাগরিকদের ইমার্জেন্সি কিট ব্যাগ গুছিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও একই ধরনের হুঁশিয়ারি জারি করেছে।
শুরুটা হয় ২০২৫ সালে
২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় কমিশন একটি যৌথ নীতি গ্রহণ করে। ‘ইউনিয়ন প্রিপেয়ার্ডনেস স্ট্র্যাটেজি’ নামের ওই কৌশলের লক্ষ্য ছিল, ইউরোপের প্রতিটি পরিবারকে যেকোনো সঙ্কটে ন্যূনতম তিন দিন সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী থাকার উপযোগী করে তোলা। ইইউর এ সাধারণ রূপরেখা জারির পর থেকে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো একে একে তাদের নিজস্ব জাতীয় ক্যাম্পেইন চালু করতে শুরু করে।
আসলে বিশ্বে কী হতে যাচ্ছে : বিশ্বে এ মুহূর্তে কোনো ‘পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ’ বা ‘পৃথিবী ধ্বংসের’ হুমকি নেই। তবু বিশ্বনেতারা কেন এত শঙ্কিত? এ নিয়ে গণমাধ্যমে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মোটামুটি কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। যেমন— ‘সফটওয়্যার চালিত’ আধুনিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’, জলবায়ু বিপর্যয় ও চরম আবহাওয়া এবং করোনা মহামারীর অভিজ্ঞতা অর্থাৎ সাপ্লাই চেনে ধস।
পাঠকের মনে থাকতে পারে গত ১১ অক্টোবরের ঘটনা। ফ্রান্সের সাত শতাধিক সুপারশপ ও চেইনশপে সাইবার হামলা হয়। হ্যাকাররা শপের খাবার রাখার সব ফ্রিজ ও গোডাউনের কুলিং সিস্টেম হ্যাক করে। তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় ৫০ থেকে ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এক রাতে টনকে টন খাবার নষ্ট হয়। মাত্র দু’টি শপের ক্ষতি দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি ইউরো। প্রকৃত ক্ষতি অকল্পনীয়। কারা কি উদ্দেশ্যে এ অপকর্ম করল জানা যায়নি। কিন্তু ঘটনা বলে দিচ্ছে, অটোমেশন নিরাপদ নয়। হ্যাকার বা শত্রুভাবাপন্ন দেশ যেকোনো সময় যেকোনো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, এটিএম বুথ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সুপারমার্কেটের সাপ্লাই চেন, পানি শোধনাগার এমনকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অচল করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি মহাবিপর্যয়ের চেয়ে মোটেও কম কিছু নয়।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো শঙ্কিত। হরমুজ ও বাব আল মানদেব প্রণালী বন্ধের জেরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। কোনো বড় সঙ্কট দেখা দিলে সাধারণ মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয় সেই মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করাও এ নির্দেশনার লক্ষ্য। না, দেশগুলো সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাতের ভয় অতটা পাচ্ছে না; বরং বেশি ভুগছে পরোক্ষ হামলার আশঙ্কায়। যেমন— সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট ক্যাবল কেটে দেয়া, গ্যাস পাইপলাইনে নাশকতা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।
এর মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, গ্রিস ও সার্বিয়ার মতো দেশগুলো জেন-জি আন্দোলনে বিপর্যস্ত। গণহারে ধরপাকড় চালিয়ে, বলপ্রয়োগ করেও তাদের দমানো যাচ্ছে না; বরং সরকারগুলোর আসন টলটলায়মান। এ আন্দোলনের পেছনে কোনো বৈরী শক্তির কারসাজি থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দেশগুলো।
জলবায়ু বিপর্যয় ও চরম আবহাওয়া : বিশ্বজুড়ে আকস্মিক ও তীব্র বন্যা, দাবানল, টাইফুন ও অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা এখন আর অস্বাভাবিক নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেকোনো সময় যেকোনো উন্নত শহরও কয়েক দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। সম্প্রতি ইউরোপজুড়ে অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছিল, যা গোটা ইউরোপকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনি দিয়েছে।
করোনা মহামারীর অভিজ্ঞতা : ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বিশ্ববাসী দেখেছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বন্ধ হলে কত দ্রুত সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সরকারগুলো চায় না যেকোনো সঙ্কটের শুরুতে মানুষ বাজারে গিয়ে হুড়োহুড়ি বা ‘প্যানিক বায়িং’ করুক। আগে থেকে নিজস্ব মজুদ থাকলে বাজারে হাহাকার পড়বে না।
নাগরিকদের যে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে : কোনো আতঙ্ক না ছড়িয়ে সরকারগুলো প্রতিটি পরিবারকে ঘরে একটি ছোট ‘সারভাইভাল বা ইমার্জেন্সি ব্যাগ’ গুছিয়ে রাখতে বলছে। যেখানে থাকবে— রান্না না করে খাবার উপযোগী টিনজাত খাদ্য, বিস্কুট ও মাথাপিছু প্রতিদিন তিন লিটার করে ব্যবহার করার মতো পানি। বলা হচ্ছে— ঘরে একটি ব্যাটারিচালিত অ্যানালগ রেডিও, পাওয়ার ব্যাংক ও ফ্ল্যাশলাইট রাখতে। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ডাউন থাকলে খবর পেতে সেই পুরনো আমলের ব্যাটারি রেডিও হবে একমাত্র সম্বল। ফার্স্ট এইড বক্স, নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং কিছু নগদ ঘরে রাখতে বলছে সরকারগুলো; যাতে এটিএম বুথ অচল হলে সমস্যায় না পড়েন।
পেছনে আরো ঘটনা আছে
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প পরমাণু হামলা চালাতে পারেন। সেটি ঘটলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইউরোপের দেশগুলো নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কিত। ইউক্রেন যুদ্ধে পক্ষ হওয়ায় পুরো ইউরোপ হয়ে পড়েছে রাশিয়ার জানি দুশমন। আবার মাথার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ছত্রছায়া সরে যাচ্ছে ক্রমে। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা নীতি ইউরোপকে এক অভূতপূর্ব বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দেশগুলোর মাথায় হঠাৎ যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন ইউরোপের নেতারা।
সম্প্রতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে লজিস্টিক হাব বা কার্গো বিমানে অগ্নিকাণ্ড, জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের আকাশে ড্রোন অনুপ্রবেশ এবং সমুদ্রের তলদেশে ইন্টারনেট ক্যাবল ও গ্যাস পাইপলাইনে নাশকতার অভিযোগ এনেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। শঙ্কিত ইউরোপের নেতারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক পুনর্জাগরণের পথে হাঁটছেন। পাশাপাশি বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও সামাজিক প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। নাগরিকদের প্রতি মহাবিপর্যয়ের হুঁশিয়ারি সেই প্রস্তুতির একটি দিক।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত।
mujta42@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








