ড. মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের কৃষক শুধু ফসল উৎপাদন করেন না; তারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত গড়েন। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করেন। সঞ্চয় ও ধার করা অর্থ বিনিয়োগ করে উৎপাদন চালিয়ে যান। অথচ তাদের অনেকে স্থিতিশীল আয়, সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হিমশিম খান। যাদের শ্রমে-ঘামে আমাদের খাদ্যের জোগান আসে, তাদের জীবন কেন এত অনিশ্চিত— রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এ প্রশ্নের উত্তর জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষি, শিল্প ও সেবার সমন্বয়ে গঠিত। তাই কৃষির গুরুত্ব বোঝাতে হালনাগাদ পরিসংখ্যান ব্যবহার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এ হিসাবে শস্যের পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনজ উপখাতও অন্তর্ভুক্ত। তবে জিডিপিতে কৃষির অংশ দিয়ে এর পূর্ণ গুরুত্ব বোঝা যায় না। মানুষের খাদ্য, গ্রামীণ জীবিকা, কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে কৃষির সম্পর্ক গভীর।
কৃষকের সংখ্যা নির্ধারণেও ব্যক্তি ও কৃষি হোল্ডিংয়ের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। এফএওতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ২০১৯ সালের কৃষিশুমারি অনুযায়ী, দেশে কৃষি হোল্ডিং ছিল এক কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি। হোল্ডিং হলো— একক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কৃষি উৎপাদন একক বোঝায়; এটি সরাসরি কৃষকের সংখ্যা নয়। একই ফলে দেখা যায়, শূন্য দশমিক ০২ থেকে ১ দশমিক ০১ হেক্টর আয়তনের হোল্ডিং ছিল প্রায় এক কোটি ৫৫ লাখ। অর্থাৎ ছোট আকারের কৃষি উৎপাদন এককের প্রয়োজনকে নীতির কেন্দ্রে রাখা অপরিহার্য।

Advertisement

কৃষকের উৎপাদন ও আয়
কৃষিতে সাফল্য মূল্যায়নের সময় শুধু কত টন ফসল উৎপাদিত হলো, তা দেখলে চলবে না; কৃষকের হাতে কত টাকা থাকল, তাও বিবেচনায় নিতে হবে। বীজ, সার, সেচ, শ্রম, জমির ভাড়া, পরিবহন ও ঋণের খরচ বাদ দেয়ার পর আয় পর্যাপ্ত না হলে বেশি উৎপাদনও কৃষক পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না। নিজের ও পরিবারের শ্রমের মূল্য হিসাবের বাইরে রাখলে প্রকৃত সঙ্কট আড়ালে থেকে যায়।
ঋণ পরিশোধ, সংসারের খরচ কিংবা পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতিতে কৃষককে ফসল ওঠার পরপর বিক্রি করতে হতে পারে। সংরক্ষণ ও দরদামের সুযোগ সীমিত থাকায় ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করাও তার পক্ষে কঠিন। অন্য দিকে শহরের ভোক্তা বেশি দামে পণ্য কিনলেও সেই বাড়তি মূল্যের কতটা উৎপাদকের কাছে পৌঁছায়, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। কৃষকের ন্যায্য মূল্য ও ভোক্তার সহনীয় মূল্য— দু’টি নিশ্চিত করতে বিপণন ব্যবস্থায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

কৃষকের দরকষাকষির শক্তি
কৃষিপণ্যের বাজারে পরিবহনকারী, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার প্রয়োজনীয় ভূমিকা আছে। তাদের সবাইকে শোষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সমাধান নয়। সমস্যা তৈরি হয় অস্বচ্ছ লেনদেন, অতিরিক্ত কর্তন, বাজারে প্রবেশে বাধা বা প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণে কৃষক তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হলে।
এ ক্ষেত্রে কৃষক সমবায় ও উৎপাদক সংগঠনকে কার্যকর করা যেতে পারে। যৌথভাবে পণ্য সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ ও বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ছোট কৃষকের দরকষাকষির শক্তি বাড়বে। স্থানীয় সংগ্রহকেন্দ্র, নির্ভরযোগ্য ওজন ব্যবস্থা এবং লিখিত লেনদেনের রসিদ নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইলের পাশাপাশি স্থানীয় হাটেও বাজারদর প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে ডিজিটাল সুবিধাবঞ্চিত কৃষকরাও তথ্য পান।
সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণ সহজ করতে হবে। সংগ্রহের সময়, মূল্য, মানদণ্ড ও অর্থ পরিশোধের নিয়ম ফসল ওঠার আগে জানানো উচিত। ক্ষুদ্র কৃষকের উপযোগী বিক্রির পরিমাণ নির্ধারণ এবং বর্গা চাষির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি। সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করা যথেষ্ট নয়; কৃষক বাস্তবে সেই দামে বিক্রি করতে পারছেন কি না, তাই হবে প্রধান পরীক্ষা।

দুর্যোগের বোঝা কৃষকের একার নয়
বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, লবণাক্ততা এবং রোগ-পোকা কৃষির বড় ঝুঁকি। অঞ্চল ও মৌসুমভেদে ক্ষতির ধরনও বদলে যায়। একটি ফসল নষ্ট হলে শুধু চলতি আয় হারায় না; পরবর্তী মৌসুমের বীজ, সার ও চাষের অর্থ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দুর্যোগের পর ত্রাণ দেয়ার পাশাপাশি কৃষককে উৎপাদনে ফেরার সহায়তা দিতে হবে। ক্ষতি যাচাই করে সময়মতো বীজ, উপকরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছানো দরকার। প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পরিশোধের সময় বাড়াতে হবে। একই সাথে সহজ শর্তে নতুন কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষামূলক ফসল বীমাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বীমার শর্ত সহজ, ক্ষতিপূরণের নিয়ম বোধগম্য এবং দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত হওয়া দরকার। আবহাওয়াভিত্তিক বীমায় মাঠে ক্ষতি হলেও নির্ধারিত সূচক পূরণ না হওয়ার ঝুঁকি থাকে; পরিকল্পনার সময় এ সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচের দক্ষতা এবং স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী জাত ও চাষপদ্ধতি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

ঋণ-ভর্তুকি পৌঁছাক প্রকৃত কৃষকের হাতে
কৃষিঋণ ও সহায়তার যোগ্যতা শুধু জমির মালিকানার কাগজ দিয়ে নির্ধারণ করলে বর্গা চাষি, ইজারা চাষি ও নারী কৃষক বাদ পড়তে পারেন। স্থানীয়ভাবে যাচাইযোগ্য উৎপাদন-সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে তাদের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং অনুমোদিত ঋণ চাষের উপযুক্ত সময়ে দেয়া জরুরি।
ভর্তুকির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে কৃষকের হাতে পৌঁছানো সুবিধার ভিত্তিতে। সরকারি ব্যয় কত হলো, পাশাপাশি কারা পেলেন, কখন পেলেন এবং উৎপাদন ব্যয় কতটা কমল— এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। ভেজাল বীজ, সার ও কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি না থাকলে সহায়তার সুফল বিনষ্ট হতে পারে।

কৃষককল্যাণে শিক্ষা-চিকিৎসা নিশ্চিত করা
কৃষকের জীবনমান শুধু ফসলের দামে নির্ভর করে না। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসাব্যয় কিংবা সন্তানের শিক্ষাখরচ তার সঞ্চয় ও উৎপাদনের মূলধন ক্ষয় করতে পারে। তাই প্রান্তিক কৃষক পরিবারের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষাসহায়তা, কার্যকর গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সুরক্ষা কৃষিনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
সব কৃষক দরিদ্র নন, আবার সবার সঙ্কট একও নয়। সহায়তা নির্ধারণে আয়, জমির ব্যবহার, ঋণ, দুর্যোগের ক্ষতি ও পারিবারিক প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি এবং ভূমিহীন কৃষিশ্রমিককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। কৃষিতে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি ও সেবাপ্রাপ্তির সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণার সুফল পৌঁছাক মাঠে
কৃষি গবেষণার সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন কৃষক তা ব্যবহার করে খরচ কমাতে, ঝুঁকি মোকাবেলা করতে ও আয় বাড়াতে পারেন। কৃষি সম্প্রসারণ সেবায় নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরামর্শ, রোগ-পোকা শনাক্তকরণ, মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ উপকরণ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।
মান যাচাই করা জৈবসার ও জৈব বালাইনাশক, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের অবশিষ্টাংশের মূল্য সংযোজন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তবে কোনো প্রযুক্তির ফল যাচাই না করে গণহারে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া উচিত নয়। ছোট কৃষকের জন্য যন্ত্র কেনার ভর্তুকির পাশাপাশি সাশ্রয়ী ভাড়াভিত্তিক যন্ত্রসেবাও দরকার। ফসলভেদে উপযোগী গুদাম, শুকানোর ব্যবস্থা ও শীতল সংরক্ষণ গড়ে তুললে বিক্রির সুযোগ বাড়বে।

কৃষকের জীবনমানে নীতির সাফল্য
কৃষকের আয়, বাজারক্ষমতা, দুর্যোগ ঝুঁকি ও সামাজিক সুরক্ষা পরস্পরনির্ভর। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারলে আয় কমে যায়। আয় কমলে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে; দুর্যোগে ফসল বিনষ্ট হলে সেই ঋণ আরো ভারী হয়। তখন চিকিৎসা, শিক্ষা বা খাদ্য ব্যয় মেটাতে কৃষককে সম্পদ বিক্রি করতে কিংবা নতুন ঋণ নিতে হয়। বাজারে দুর্বল অবস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি মিলে কৃষক পরিবারকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়।
তাই নীতির ফল মাপতে হবে শুধু উৎপাদন দিয়ে নয়। কৃষকের প্রকৃত আয়, বিক্রির সময় ও মূল্য, ঋণের চাপ, দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধারের সময় এবং শিক্ষা-চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয়ের বোঝাও বিবেচনায় নিতে হবে।
এই বাস্তবতায় কয়েকটি পদক্ষেপ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ ওজন, লিখিত রসিদ, প্রকাশ্য বাজারদর এবং কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে যৌথ বিপণন নিশ্চিত করা। 
দ্বিতীয়ত, বর্গা চাষি, ইজারা চাষি ও নারী কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে সময়মতো স্বল্পসুদের ঋণ, উপকরণ সহায়তা ও সরকারি সংগ্রহের সুযোগ দেয়া। তৃতীয়ত, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন উপকরণ এবং সহজ শর্তের ফসল বীমা চালু করা প্রয়োজন। চতুর্থত, কৃষক পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা ও জরুরি নগদ সহায়তাকে কৃষিনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত কাঠামোয় আনা। প্রতিটি কর্মসূচির উপকারভোগী, অর্থপ্রবাহ ও ফল প্রকাশ্য করা এবং কৃষক প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি গড়ে তোলা জরুরি।
কৃষক রাষ্ট্রের অনুগ্রহপ্রার্থী নন; দেশের অপরিহার্য উৎপাদক। তার আয় অনিশ্চিত রেখে খাদ্যনিরাপত্তা টেকসই করা যাবে না। বাজারে দরকষাকষির শক্তি না বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর সুফলও মিলবে না। দুর্যোগে তাকে একা ফেলে সামাজিক সুরক্ষার দাবি অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই এখনই নীতির কেন্দ্র বদলাতে হবে— শুধু বেশি উৎপাদন নয়, কৃষকের হাতে ন্যায্য আয়; শুধু ত্রাণ নয়, ঝুঁকি মোকাবেলার স্থায়ী ব্যবস্থা; শুধু ভর্তুকি নয়, অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা। কৃষকের জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি হবে কৃষিনীতি সফলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। জাতির খাদ্যের জোগান যারা দেন, তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। 
লেখক : অধ্যাপক (অব:) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (সিআইপিজি)।