মুজতাহিদ ফারুকী
মুজতাহিদ ফারুকী। নয়া দিগন্ত

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিশ্ববাসীর নজর ছিল। গত ২৭ অক্টোবর নির্বাচন হয়েছে। ফল সবার জানা। তারপরও এ লেখার কারণ ইসরাইলের ঘটনা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরা। তার আগে সবশেষ তথ্য জেনে নিতে পারি। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির (সিইসি) ঘোষিত চূড়ান্ত ফলে দেখা গেল, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী গাডি আইসেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কেউ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়নি। সরকার গঠনে ১২০ আসনের নেসেট বা পার্লামেন্টে দরকার ৬১ আসন। সেখানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩ আসন। দরকারের চেয়ে আটটি কম। আগের নির্বাচনে পেয়েছিল ৬৮ আসন। অন্য দিকে বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮ আসন। দরকারের চেয়ে ১৩টি কম।
এই ফলের কারণে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে অবাক করা ঘটনা হলো— আরবদের বিভিন্ন দল মিলে পেয়েছে ১৯টি আসন। এবারই প্রথম আরবরা এতগুলো আসনে জয় পেল। এটি অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ হলেও নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক সাফল্য। এর ফলে নেতানিয়াহু ও তার বিরোধী গাডি আইসেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট— উভয়ই সরকার গঠন করতে হলে ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন নিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে ১৯ আসন পাওয়া ফিলিস্তিনি দলগুলোর গুরুত্ব বিপুলভাবে বাড়বে। বলা যায়, তারাই হবে ইসরাইলে নতুন সরকার গঠনের মূল নিয়ামক বা কিংমেকার।
এবার আরব তথা ফিলিস্তিনিরা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেন। ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইসরাইলের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন নজির ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম। এ রেকর্ডের পেছনে মুখ্য ভূমিকা আরবদের বিপুল জনস্রোতের। তারা হেঁটে, উট, ঘোড়া ও গাধায় চড়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হন। কারণ তাদের কাছে ব্যালট ছিল একমাত্র মারণাস্ত্র। লড়াইয়ের বৈধ হাতিয়ার। উদ্দেশ্য একটিই, হাজার হাজার নারী, শিশু ও নিরীহ ফিলিস্তিনির হত্যাকারী, গাজা ধ্বংসকারী, রক্তখেকো নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। নেতানিয়াহুকে সরাতে শুধু ফিলিস্তিনিরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এমন নয়। বিদেশে বসবাসকারী হাজার হাজার ইহুদি ভোটারও বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে ইসরাইলে উড়ে আসেন শুধু ভোটের যুদ্ধে নেতানিয়াহুকে ধরাশায়ী করতে। ফিলিস্তিনের শুভাকাঙ্ক্ষী মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষও খুনি নেতানিয়াহুর পতন চেয়েছেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি সফল হয়নি।
নির্বাচনের ফল থেকে স্পষ্ট, ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন আদায় করতে পারলে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের যেকোনোটি সরকার গঠন করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট বেশি আসন পাওয়া জোটের নেতাকে প্রথমে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। সেটি নেতানিয়াহু।
এতদিন নেতানিয়াহু কট্টরপন্থী ইহুদি দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকারে ছিলেন। এবার কি আরবদের সমর্থনে ক্ষমতা ধরে রাখবেন? কারণ নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে। এর বিকল্প নেই। ক্ষমতা ছাড়লেই দুর্নীতির দায়ে কারাগার তাকে গ্রাস করবে ব্ল্যাক হোলের মতো। সে জন্য এবারের নির্বাচনে জিততে ছিলেন মরিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন আদায় করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে আর্তস্বরে হাহাকার করেছেন অস্তিত্বের সঙ্কটের কথা বলে। ভোটারদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে ভোট বাগানোর ফন্দিতে রাজধানী তেলআবিবে পারমাণবিক বোমা পড়ার বানোয়াট ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছেন। শপিংমলগুলোতে চিৎকার করে মানুষকে বলেছেন, ‘আমরা অস্তিত্বের সঙ্কটে রয়েছি। আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে দেখব, মুসলিম ব্রাদারহুড ও আরবদের সরকার ক্ষমতায়’! কোনো কিছুতে কাজ হয়নি। নেতানিয়াহু নাস্তানাবুদ হয়েছেন। আতঙ্কিত হয়েছেন। এমনকি ভোট গ্রহণের সময়সীমা বাড়াতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছেন। কমিশন তা নাকচ করে দিয়েছে। 
কিন্তু বাস্তবে কী অবস্থা দাঁড়াল
আরবদের অবস্থান অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো। আমরা আরব দলগুলোর ফল দেখে নিই। সবচেয়ে বেশি ১১টি আসনে জয়ী হয়েছে তিনটি আরব দলের জোট জয়েন্ট লিস্ট। ইউসুফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন জোটে অন্য তিনটি দল হলো— হাদাশ, তা’ল ও বালাদ। জোটের অন্য নেতাদের মধ্যে আছেন আহমেদ তিবি এবং আয়মান ওদেহ। 
আটটি আসন পেয়ে আরবদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বে রা’আম ইউনাইটেড আরব লিস্ট। দলটির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখা দরকার। আগে দলটি ইউসুফ জাবারিনের ‘জয়েন্ট লিস্ট’ জোটে শামিল ছিল। পরে জোট ছেড়ে একক দল হিসেবে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করছে। দলটি সব সময় ইসরাইলের ইসলামী আন্দোলনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভাগের রাজনৈতিক শাখা হিসেবে পরিচিত। গত জুলাই মাসে রা’আম আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী আন্দোলন থেকেও আলাদা হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, নতুন রূপে আত্মপ্রকাশের পর দলটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেয়। নিজেদের আরব-ইহুদি অংশীদারত্বের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে এবারই প্রথম তারা নির্বাচনে ইহুদি প্রার্থী যুক্ত করে। মজার বিষয় হলো— দলের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাসের পরই প্রার্থী তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন সাবেক ইসরাইলি পুলিশ কর্মকর্তা ও ইহুদি রাজনীতিবিদ ইয়োভ সেগালোভিচ। তিনি জয়ী হয়েছেন। এখন পার্লামেন্টে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করবেন একজন ইহুদিও।
সরকার গঠনে নেতানিয়াহুর যে আটটি আসন কম আছে সেটি আসতে পারে মনসুরের রা’আম দলের সমর্থন পেলে। কিন্তু দলটির নজর আইসেনকোটের দিকে। সেগালোভিচ এর মধ্যে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, আইসেনকোটকে সরকার গঠন করতে হলে রা’আমসহ অন্য আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে হবে। মনসুর আব্বাসও সেটি চান। কিন্তু রা’আমের আটটি আসন যোগ হলেও আইসেনকোট সরকার গঠন করতে পারছেন না। তাকে অন্য আরব দলের সমর্থনও পেতে হবে। 

Advertisement

গাডি আইসেনকোট কে
নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাডি আইসেনকোট এ মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কে এই ব্যক্তি? তিনি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ। সেনাবাহিনীতে ৪১ বছরের চাকরিতে একেবারে এন্ট্রি লেভেল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পদে উঠে আসেন। গোলানি ব্রিগেড থেকে শুরু করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারনের সামরিক সচিব ও সামরিক অভিযানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন।
আইসেনকোটের বাবা-মা মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে ইসরাইলে আসেন। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় তিনি ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ নামে এক ভয়াবহ নীতি চালু করেন। এ নীতির মূলকথা— কোনো আবাসিক এলাকায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের তৎপরতা দেখা গেলে এলাকাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলতে হবে। সাধারণ নাগরিকদের পিষে ফেলা হবে। গাজায় নেতানিয়াহু ঠিক এই নীতি অক্ষরে অক্ষরে প্রয়োগ করেছেন। হামাসকে নির্মূল করতে লাখো গাজাবাসীকে হত্যা করেছেন, প্রতিটি ঘরবাড়ি, স্থাপনা গুঁড়িয়ে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। 
গাজা যুদ্ধে আইসেনকোটের ছেলে এবং দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন। তাই ফিলিস্তিনিদের ওপর তার প্রতিশোধস্পৃহা চরমে। তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরোধী তো ননই; বরং ঘোরতর সমর্থক। নেতানিয়াহু কেন হামাসসহ সব ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করেন না, কেন প্রতিরোধকারীদের সমর্থনকারী আরবদের সব বসতি গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেন না, সেই ক্ষোভ থেকে আইসেনকোট বিরোধিতা শুরু করেন নেতানিয়াহুর। তাই আইসেনকোটের ক্ষমতায় আসা আরবদের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হবে তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটতে যাচ্ছে। বিপদ আরো বেশি এ জন্য যে, যুদ্ধবাজ লোকটি আন্তর্জাতিক মহলে বাম মধ্যপন্থী রাজনীতিক হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। এই ভাবমর্যাদা তাকে আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে সাহায্য করতে পারে। যিনিই সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পাবেন তাকে আগামী এক মাসের মধ্যে এ চেষ্টা করতে হবে। দেখার বিষয়— ফিলিস্তিনিরা কাকে সমর্থন দেন এবং কী শর্তে।
আইসেনকোটের সাথে ফিলিস্তিনিদের মতপার্থক্য অনেক। তিনি নিজেও আরবদের সাথে সমঝোতার সম্ভাবনা নির্বাচনের আগে নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, আরব সমর্থন তার দিকে ঝুঁকে আছে। মনসুর আব্বাস আইসেনকোটের সাথে আলোচনায় প্রস্তুত। সরকারেও যোগ দিতে ইচ্ছুক। 
এ দিকে ইউসুফ জাবারিন ও আহমেদ তিবির নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর জোট সরাসরি সরকারে যোগ দেবে না। তবে নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে বাইরে থেকে বিরোধী জোটকে সরকার গঠনে সমর্থন দিতে রাজি। তাদের প্রধান শর্ত ও দাবি হলো : নেগেভ মরুভূমি অঞ্চলসহ বিভিন্ন আরব ও বেদুইন এলাকায় আরবদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়ার ইসরাইলি প্রশাসনের অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করা, পশ্চিমতীর থেকে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও বসতি স্থাপন বন্ধ করা, জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আলোচনা আবার শুরু করা।
আরবরা কি এসব দাবি আদায় করতে পারবেন? মনে হয় না। তবে বিপদ বড় বালাই। বিপদে আছেন নেতানিয়াহু। আইসেনকোটও ক্ষমতায় যেতে মরিয়া। এখানে মূল সমস্যা। এখানে সম্ভাবনাও। নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে সব না হোক, অনেক দাবি আদায় সম্ভব। কিন্তু সেই ঐক্য প্রায়শ অধরা থেকে যায়। এবারো শুধু অনৈক্যের কারণে কিংমেকার পজিশনে থেকেও তারা ব্যর্থ হতে যাচ্ছে কি? 
এ ক্ষেত্রে আরেকটি সম্ভাবনা আছে। আরবরা একজোট হয়ে তাদের শর্তে অটল থাকলে এমনো হতে পারে, নেতানিয়াহু ও আইসেনকোটের জোট এক হয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের দিকে যেতে পারে। আবার নতুন করে নির্বাচনও হতে পারে যদি কোনো সমাধানে পৌঁছা না যায়। ইসরাইলে সেই নজির আছে। 
তবে শেষ কথা এটিই যে— ইসরাইলের ক্ষমতায় যে-ই আসুক, তাতে কারো খুশি হওয়ার সত্যি কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রটি চলে বিশ্ব ইহুদি কংগ্রেসের মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ইহুদি সংস্থার নির্দেশনায়, তাদের নির্ধারিত আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে। সেই নীতি পাল্টানোর ক্ষমতা কোনো প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের নেই। আইসেনকোট প্রধানমন্ত্রী হলে বর্তমান অবস্থার উন্নতির ন্যূনতম সম্ভাবনাও নেই; বরং অবনতির আশঙ্কাই বেশি। 
লেখক : সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, নয়া দিগন্ত
mujta42@gmail.com