
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা একসাথে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্ট্যাগফ্লেশনের (নিশ্চলতার স্ফীতি) যথেষ্ট লক্ষণ দেখা গেলেও, দেশ এরই মধ্যে পুরোপুরি অর্থনৈতিক মন্দায় প্রবেশ করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ১২-২৪ মাসে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিনিয়োগের আরো সঙ্কোচন এবং কর্মসংস্থানে অবনতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। সংস্কারে বিলম্ব হলে এই পরিস্থিতি আরো গভীর মন্দার দিকে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আরো পড়ুন—শেখ হাসিনার সেই ভিডিও তাহসিফ ধারণ করেননি : জুলকারনাইন সায়ের
এই প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য স্ট্যাগফ্লেশন ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। স্ট্যাগফ্লেশন হলো এমন পরিস্থিতি, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সাথে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দুর্বল কর্মসংস্থান পাশাপাশি বিরাজ করে। অন্য দিকে অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অবনতি, উৎপাদন, বিক্রি, বিনিয়োগ, আয় ও কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হওয়া। স্ট্যাগফ্লেশনে অর্থনীতি ধীরগতিতে চললেও দাম বাড়তে থাকে; মন্দায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সঙ্কোচন প্রধান হয়ে ওঠে। দু’টি পরিস্থিতি একসাথে ঘটতে পারে, আবার দীর্ঘস্থায়ী স্ট্যাগফ্লেশন থেকে মন্দার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মন্দা অনিবার্য, এমন দাবি না করে বর্তমান সূচকগুলোকে গভীর সঙ্কটের সতর্কসঙ্কেত হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিসঙ্গত।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই মূল্যায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, জ্বালানি খাতের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণের ঘাটতিকে অর্থনীতির প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পূর্বাভাসের তাৎপর্য হলো, অর্থনীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে আরো একটি বছর দুর্বল প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার কম হওয়া একাই মন্দার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; উৎপাদন, কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয় ও বিনিয়োগের ধারাবাহিক অবনতিও যাচাই করতে হবে।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘদিন ধরে চাপে রেখেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয়ও পরিবারের বাজেট সঙ্কুচিত করছে। আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত বোঝা আরো বেশি অনুভূত হয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করেও একই মানের জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে অথবা খাবারের মান ও শিক্ষার ব্যয় কমাচ্ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ক্ষতি শুধু বর্তমান জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; মানুষের স্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা দায়ী নয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, আমদানি করা কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধিও পণ্যমূল্যে চাপ সৃষ্টি করে। সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এ ধরনের সরবরাহজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাও জরুরি। অন্য দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে ঋণ ও চাহিদা এমনভাবে সঙ্কুচিত করা উচিত নয়, যাতে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। নীতিনির্ধারকদের তাই মূল্যস্থিতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রবৃদ্ধির মন্থরতার অন্যতম কারণ দুর্বল বিনিয়োগ। নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি আমদানি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ঋণের ব্যয়, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নীতিগত পরিবর্তন এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বিদ্যমান সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয় না। নতুন বিনিয়োগ কমলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে; মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হলে আবার বাজারের চাহিদাও কমে যায়। এভাবে বিনিয়োগের স্থবিরতা ও চাহিদার দুর্বলতা পরস্পরকে শক্তিশালী করে অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট এই ঝুঁকি আরো গভীর করছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ যাচাই, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা এবং ঋণ আদায়ে অকার্যকারিতা এ সঙ্কটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে উৎপাদনশীল ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং নতুন উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক সংস্কারকে শুধু তারল্য সরবরাহ বা সাময়িক মূলধন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ, ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অনিয়মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রয়োজন, সেখানে স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু অনিয়মের দায় যেন শেষ পর্যন্ত শুধু জনগণের অর্থের ওপর না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উৎপাদনশীল উদ্যোগে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।
সরকারের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজস্ব কম হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি সহায়তা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের মধ্যে কঠিন সমন্বয় করতে হয়। ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে। আবার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি আরো সীমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে করের হার বাড়ানোর চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, অযৌক্তিক করছাড় পুনর্বিবেচনা এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি, শিল্প ও রফতানি খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। কৃষিতে সার, সেচ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষকের লাভ কমে এবং খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্যে চাপ তৈরি হতে পারে। শিল্প খাতে জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করে তোলে। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ তৈরী পোশাক শিল্পনির্ভর হওয়ায় একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে গেলে বা বাণিজ্যনীতি পরিবর্তিত হলে রফতানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ শ্রমশক্তি, পণ্যের মান বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান জরুরি। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সামষ্টিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু শুধু রেমিট্যান্স বা রিজার্ভের উন্নতি দিয়ে দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্কট সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রফতানি, উৎপাদন ও বিদেশী বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অর্থনৈতিক সঙ্কটের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক আরো ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল শ্রমচাহিদা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি না হলে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ও হতাশা বাড়ে, আর শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হয়। দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিক্রি কমে; ফলে অর্থনীতির ভেতরেই চাহিদার সঙ্কোচন তৈরি হয়। এ কারণে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়নকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক গতিপথ রয়েছে। প্রথম সম্ভাবনা হলো, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ, জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগ পরিবেশে কার্যকর সংস্কার হলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করবে। মূল্যস্ফীতি কমতে পারে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উন্নত হতে পারে। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, সংস্কার আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধির মধ্যে আটকে থাকবে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের প্রকৃত আয় ও কর্মসংস্থানে দ্রুত উন্নতি নাও ঘটতে পারে। তৃতীয় এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক সম্ভাবনা হলো, ব্যাংকিং সঙ্কট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, রাজস্ব দুর্বলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্যাগফ্লেশন আরো গভীর মন্দার ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে কোনটি বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক সূচক ও নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমছে কি না, বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ছে কি না, শিল্প উৎপাদন ও রফতানি টেকসই গতি পাচ্ছে কি না, প্রকৃত মজুরি ও কর্মসংস্থান উন্নত হচ্ছে কি না এবং ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমছে কি না— এসব সূচক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি সংখ্যা বা পুঁজিবাজারের সাময়িক উত্থান দিয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ঘোষণা করা উচিত নয়। প্রকৃত পুনরুদ্ধার তখনই ঘটবে, যখন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উন্নত হবে এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে আস্থা ফিরে পাবেন।
সঙ্কট মোকাবেলায় প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, করজাল সম্প্রসারণ ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। চতুর্থত, কৃষি উৎপাদনশীলতা, রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে সহায়তা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বোঝা দরিদ্র মানুষের ওপর অসহনীয়ভাবে না পড়ে। একই সাথে সরকারি প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, দুর্নীতি কমানো এবং অর্থ ব্যয়ের ফলাফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আগামী ১২-২৪ মাসে অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে সংস্কারের গতি ও কার্যকারিতার ওপর। সংস্কারে বিলম্ব হলে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্যাগফ্লেশন আরো গভীর মন্দার পথ তৈরি করতে পারে; আর সাহসী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নেয়া গেলে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়; বরং এমন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যা মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ায়, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং অর্থনীতির আর্থিক ভিত্তিকে টেকসই করে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
mizan12bd@yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








