মুসা আল হাফিজ
মুসা আল হাফিজ। নয়া দিগন্ত

কেবল একটি স্বাধীন মানচিত্র কিংবা নতুন পতাকা অর্জনে বি-উপনিবেশায়ন নিশ্চিত হয় না। এর প্রকৃত পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মনস্তত্ত্বের ওপর চেপে বসা দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের সূক্ষ্ম ও দৃশ্যমান কাঠামো পরিপূর্ণরূপে অতিক্রম করা। একই সাথে প্রয়োজন নিজস্ব শক্তি ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণের সামর্থ্য হাসিল। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মতাকে তাই কেবল অতীতের স্মৃতি রোমন্থন কিংবা ঐতিহ্যের গৌরবগাথার মধ্যে বন্দী রাখলে চলবে না। এর রূপান্তর ঘটাতে হবে ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গতিশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মহাপ্রকল্পে। এই আত্মনির্ধারণের পথ তৈরি করতে হলে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। একে জাতীয় বিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে হবে।
১. জ্ঞানতাত্ত্বিক সার্বভৌমত্ব কায়েম করা আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ। বাংলাদেশের ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, সাহিত্য ও সভ্যতাকে বোঝার জন্য আমাদের নিজস্ব চোখ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে আমরা নিজেদের সমাজকে পরখ করেছি পশ্চিমা তত্ত্বের চশমা দিয়ে। এখন সময় এসেছে দেশজ অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং এ মাটির হাজার বছরের লোকায়ত জ্ঞানকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয়ার, তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়ার। 
আমরা অন্ধভাবে বৈশ্বিক জ্ঞান বর্জন করব না। বরং পাশ্চাত্য বা অন্য যেকোনো সভ্যতার জ্ঞানকে কোনো প্রকার হীনম্মন্যতা ছাড়া, নিজস্ব বিচারবোধ, প্রয়োজন ও মূল্যবোধের কষ্টিপাথরে যাচাই করে গ্রহণ করব।
 জ্ঞান গ্রহণের অবাধ স্বাধীনতা এবং নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদনের মৌলিক সামর্থ্য— উভয়ই এই সার্বভৌমত্বের মূল শর্ত।
২. ভাষাগত মুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা ভাষাকে আমরা গভীর আবেগ ও বিপুল ত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করি; কিন্তু একে কেবল আবেগ আর সাহিত্যের গণ্ডিতে আটকে রাখলে এর সম্ভাবনা সঙ্কুচিত করা হয়। 
আমাদের লক্ষ্য হতে হবে বাংলাকে দর্শন, আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি, জটিল আইন ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং উচ্চশিক্ষার প্রধান ও কার্যকর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর পাশাপাশি বিশ্বজ্ঞানের প্রবাহকে ধারণ করার জন্য আরবি, ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যেন আমরা বিশ্বমঞ্চে সমমর্যাদায় জ্ঞান ও মতাদর্শ বিনিময় করতে পারি। 
 ভাষার এই আত্মমর্যাদা যেন সঙ্কীর্ণ কূপমণ্ডূকতা তৈরি না করে, আবার বিদেশী ভাষার আগ্রাসনে যেন আমাদের মাতৃভাষার জ্ঞানগত বিকাশ ব্যাহত না হয়। সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য আমাদের বজায় রাখতে হবে। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলো দুনিয়ার নানা ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে। দুনিয়ার সমৃদ্ধ ভাষাগুলোর জ্ঞান ও ভাবসম্পদ নিয়ে আসতে হবে বাংলায়। 
৩. রাষ্ট্রদর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষানীতির বড় অংশই ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার উত্তরাধিকার বহন করছে। 
এই ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে রাষ্ট্রকে নাগরিকের প্রকৃত সেবক ও অভিভাবক হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রকে এমন এক নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক জবাবদিহি, আমানত রক্ষা, মানুষের সহজাত মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার নিছক কাগজ-কলমে না থেকে বাস্তবে সুরক্ষিত হবে। 
রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জনগণের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মনির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করাই হবে এই পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য।
৪. অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও উৎপাদনমুখী উন্নয়ন ছাড়া স্বাধীনতা টেকসই হতে পারে না। কেবল অনিয়ন্ত্রিত ভোগবাদ, আমদানি-নির্ভরতা এবং বৈদেশিক পুঁজি ও ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো আত্মনির্ভর সমাজ গঠিত হয় না।
 আমাদের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে থাকতে হবে কৃষি, দেশীয় শিল্প, কারিগরি দক্ষতা, স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সৃজনশীল ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিকাশ। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে যুক্ত থেকেও যেন আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারি, সেই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। 
জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল অর্থনৈতিক বি-উপনিবেশায়ন সম্ভব।
৫. শিক্ষা ও গবেষণার স্বাতন্ত্র্য ও আজাদি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত করপোরেট বাজারের জন্য সস্তা ও আজ্ঞাবহ চাকরিপ্রার্থী তৈরি করছে। এর পরিবর্তে শিক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যা মানুষকে চিন্তাশীল, নৈতিক, উদ্ভাবনী ও সমাজ-সচেতন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে।
 আমাদের গবেষণার প্রশ্নগুলো নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যা, সম্ভাবনা ও ঐতিহাসিক প্রয়োজন থেকে। ঐতিহাসিক দলিল ও আর্কাইভের সঠিক সংরক্ষণ এবং দেশজ জ্ঞানব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের জন্য গবেষণার পূর্ণ স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
৬. সাংস্কৃতিক উৎপাদন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, স্থাপত্য, লোকশিল্প এবং উদীয়মান ডিজিটাল মাধ্যমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক, বহুস্তরীয় আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে সৃজনশীলভাবে মেলে ধরতে হবে। আমরা বৈশ্বিক সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন ও বিনিময়কে স্বাগত জানাব, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক রুচি, আকাঙ্ক্ষা এবং সাফল্যের মানদণ্ড যেন পশ্চিমা বাজার বা বহুজাতিক করপোরেটের মুনাফা ও এজেন্ডা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। 
একই সাথে, সৃজনশীলতার বিকাশকে নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রের যেকোনো ধরনের আধিপত্য ও জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ থেকে তাকে দিতে হবে স্বাধীনতা ও সুরক্ষা।
৭. আমাদের ঐতিহ্যের একটি সমালোচনামূলক পুনরাবিষ্কার প্রয়োজন। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের জীবনব্যবস্থা, বৌদ্ধ ও লোকায়ত ঐতিহ্য, ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন, সুফিদের উদার জীবনবাদ, আবহমান লোকভাষা ও পুঁথিসাহিত্য, ব্রিটিশবিরোধী লড়াই, সাতচল্লিশের আজাদি, ভাষা-আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রামের মহান অভিজ্ঞতা। এগুলোর কোনোটিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। একে কোনো একরৈখিক বা সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক বয়ানে বন্দী করা যাবে না। 
আমাদের এই ঐতিহ্যের ভেতরের ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক অনুধাবন করতে হবে। ঐতিহ্যের ভেতরের যা কিছু মানবিক, কল্যাণকর ও জীবনসম্পদ, তা আমরা ধারণ করব; আর যা কিছু বৈষম্যমূলক বা অন্যায্য, সেটিকে সাহসের সাথে সমালোচনার মুখোমুখি করব।
 অতীতকে জানা জরুরি আত্মপরিচয়ের শেকড় খোঁজার জন্য; কিন্তু অতীতের অন্ধ ও পাথুরে পুনরাবৃত্তি আমাদের লক্ষ্য নয়।
৮. সামাজিক ন্যায় ও বহুত্বের স্বীকৃতি আমাদের জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক আত্মতা কোনো একক শ্রেণী, প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। এ দেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক বয়ানে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে নারী, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং সমাজের প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অবদান ও জীবন-অভিজ্ঞতাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয়ের উন্মেষ যেন কখনোই কোনো সংখ্যালঘুর অধিকার বিপন্ন না করে।
 সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম-অধিকার এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুদৃঢ় ভিত্তির বিকল্প নেই। এর ওপর একটি টেকসই ও স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে উঠতে পারে।
৯. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিসরে আত্মনির্ধারণ অর্জন করা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান যুগে জ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি এবং জনমত মূলত ডিজিটাল অবকাঠামো ও করপোরেট অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
 এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং বাংলা ভাষার সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের নিজস্ব দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে হবে। বিশ্বপ্রযুক্তির কেবল নিষ্ক্রিয় ব্যবহারকারী বা ভোক্তা হয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না; বরং প্রযুক্তি নির্মাণ, তার নৈতিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থে তার সফল প্রয়োগের সামর্থ্য আমাদের অর্জন করতে হবে। যেন আমাদের সার্বভৌমত্ব ডিজিটাল উপনিবেশবাদের শিকারে পরিণত না হয়।
১০. প্রকৃতি ও ভূ-প্রকৃতিনির্ভর সভ্যতাদর্শ গড়ে তোলা আমাদের অস্তিত্বের দাবি। নদী, উর্বর পলিমাটি, নিবিড় কৃষি, বিস্তৃত জলাভূমি, সুন্দরবনের মতো বনভূমি এবং আমাদের ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক আত্মতার মূল শরীর। 
তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে নদী ও পরিবেশ ধ্বংস করা, ভূমির অনিয়ন্ত্রিত ও বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং সীমাহীন ভোগবাদী অর্থনৈতিক মডেল এই আত্মতার ভিত্তিকেই দুর্বল ও রুগ্ণ করে তুলছে। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু-সহনশীল দেশীয় উৎপাদন পদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের অধিকারকে আমাদের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শনের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। 
আমাদের সভ্যতা হবে প্রকৃতির সাথে মিতালী করে বেঁচে থাকার সভ্যতা।
১১. বৈশ্বিক সম্পর্ক ও সভ্যতাগত সংলাপে সমমর্যাদা হাসিল করা জরুরি। উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন। কোনো ভূরাজনৈতিক পরাশক্তি বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির বলয়ে পিষ্ট না হয়ে, বিশ্বের বুকে একটি স্বতন্ত্র সভ্যতাগত কণ্ঠস্বর হিসেবে বাংলাদেশকে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরে যেকোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। বৈশ্বিক সঙ্কটে এবং সভ্যতাগত সংলাপে আমরা কেবল অন্যের এজেন্ডা শুনব না; বরং নিজস্ব নৈতিক অবস্থান এবং বিশ্বশান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে নিজস্ব প্রস্তাবনা তুলে ধরব। 
এই বিশ্বজনীন অথচ আত্মমর্যাদাশীল বিনির্মাণ ও সংযোগের মাধ্যমেই পূর্ণতা পাবে বাংলাদেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক আজাদি এবং আত্মনির্ধারণের কার্যকর দিশা। 
লেখক : কবি, গবেষক 
72.alhafij@gmail.com

Advertisement