মাসুম খলিলী
মাসুম খলিলী। নয়া দিগন্ত

দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে স্বস্তি বিরাজ করছে বৈদেশিক খাতে। প্রবাসী আয় বাড়ছে, রিজার্ভ পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধের সক্ষমতা উন্নত হয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তির বিপরীতে জমছে একাধিক অশনিসঙ্কেত। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে, ব্যাংকঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সঙ্কুচিত এবং রফতানি আয় প্রায় স্থবির। মূল্যস্ফীতি কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। পাশাপাশি সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়লেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত নির্বাচিত অর্থনৈতিক সূচক এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে অর্থনীতির এই দ্বিমুখী চিত্র স্পষ্ট। তাই প্রশ্ন শুধু অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল হয়েছে, তা নয়; বরং এটি কতটা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটিই।
অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য শুধু রিজার্ভের অঙ্ক কিংবা ঋণ বিতরণের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, শিল্পোৎপাদন বাড়ছে কি না, ব্যাংকের অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হচ্ছে কি না। বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের কেন্দ্রে আছে এই রূপান্তরের দুর্বলতা।
রিজার্ভ বেড়েছে; বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি কাটেনি
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে অর্থাৎ ৩০ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৭৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের শেষে বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এই হিসাবে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এমনকি আগস্ট ২০২৬ শেষে বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভ আরো বেড়ে ৩২ দশমিক ৪৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি মেটানো এবং মুদ্রাবাজারে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে রিজার্ভের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। তবে রিজার্ভ বাড়লেই বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি দূর হয় না। আমদানি ব্যয়ের সম্ভাব্য বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এবং রফতানি আয়ের গতিপ্রকৃতি সমানভাবে বিবেচ্য। 
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো রিজার্ভ বৃদ্ধির উৎস ও স্থায়িত্ব। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার শৃঙ্খলায় ফেরা ইতিবাচক। কিন্তু রফতানি আয় স্থবির থাকলে এবং আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। অতএব, রিজার্ভ পুনর্গঠনকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে, চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে নয়।
রেমিট্যান্সের অর্থ কি বিনিয়োগে রূপান্তর হচ্ছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো বৈদেশিক খাতে বড় স্বস্তি বয়ে এনেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ রিজার্ভ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারগুলোর ভোগব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন খাতে অর্থায়নে সহায়ক হচ্ছে। 
কিন্তু এখানেই একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় : প্রবাসী আয়ের বাড়তি প্রবাহের কতটুকু দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যাচ্ছে? প্রবাসী আয়ের বড় অংশ পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া স্বাভাবিক। সেই ব্যয় ভোগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল রাখে। কিন্তু শুধু ভোগব্যয় বাড়লে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ সঞ্চয়, ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগ, প্রবাসী বন্ড এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ তহবিলের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। 
বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অস্তিরতা বিরাজ করছে। এতে ভবিষ্যতে এসব স্থানে কর্মী যাওয়া কমে যাবে। প্রবাসে কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যয় ও নিরাপত্তার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। চাকরির লোভ দেখিয়ে কর্মীদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে নারী শ্রমিকদের ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।
রফতানি স্থবির, আমদানি দ্রুত বাড়ছে
বৈদেশিক খাতের উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো রফতানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধির ব্যবধান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পণ্য রফতানি আয় এফওবি ভিত্তিতে ছিল ৪৩ দশমিক ৮৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কম। বিপরীতে পণ্য আমদানি ছিল ৭১ দশমিক ১৪০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। ফলে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮৫ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ রফতানি আয় স্থবির থাকলেও আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অবশ্য আমদানি বৃদ্ধি নেতিবাচক নয়। শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বাড়লে ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও রফতানির সক্ষমতা তৈরি হয়। সমস্যা হলো, আমদানির এই বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত কতটা উৎপাদন ও রফতানি আয় বাড়াচ্ছে। যন্ত্রপাতি আমদানির মানেই নতুন কারখানা চালু নয়। বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, জ্বালানির নিশ্চয়তা, শ্রমিকের দক্ষতা, বাজারে চাহিদা এবং ঋণের ব্যয়, সবকিছু মিলেই নির্ধারিত হয় আমদানির প্রকৃত অর্থনৈতিক ফলাফল। 
রফতানি বহুমুখীকরণে দুর্বলতাও প্রকট। নতুন রফতানি খাত গড়ে তোলা, পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না এলে বৈদেশিক খাতের স্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিতে থাকবে।
সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কেন দুর্বল
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ সরকারি খাতে নিট ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এই ব্যবধান অর্থনীতির জন্য সতর্কসঙ্কেত। সরকারি ঋণ বাড়ছে, অথচ বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ দুর্বল। এর অর্থ এই নয় যে, সরকারি ঋণগ্রহণ সবসময় ক্ষতিকর কিংবা সরকারি ঋণই বেসরকারি বিনিয়োগ কমার একমাত্র কারণ। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বন্দর ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর সরকারি বিনিয়োগ বেসরকারি উদ্যোগের ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু সরকারি ঋণ যদি চলতি ব্যয়, লোকসানি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কিংবা অদক্ষ প্রকল্পে বেশি ব্যবহৃত হয়, তবে একই ঋণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হতে পারে। ব্যাংকের অর্থায়ন সক্ষমতা সীমিত থাকলে সরকারি ঋণের চাহিদা বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা সঙ্কুচিত করতে পারে, যা অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব নামে পরিচিত।
পাশাপাশি বেসরকারি ঋণ কমার পেছনে শুধু ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা নয়, ঋণের চাহিদাও দুর্বল। উচ্চ সুদ, জ্বালানি সঙ্কট, উৎপাদন ব্যয়, অনিশ্চিত বাজার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি ঋণ নেয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। তাই ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য শুধু সুদের হার কমানো যথেষ্ট নয়; ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসার ব্যয় হ্রাস এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
খেলাপি ঋণ : পুঞ্জীভূত সঙ্কট
খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে মোট ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ খেলাপি ছিল, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত কিছুটা কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে অনুপাত সামান্য কমলেও ব্যাংকঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি থাকা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের নগদ প্রবাহ, মুনাফা, মূলধন এবং ঋণদানের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সঙ্কটের দায় শুধু অর্থনৈতিক মন্দা বা ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ওপর চাপানো যায় না। ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা, দুর্বল তদারকি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোও এর জন্য দায়ী। প্রকৃত ব্যবসায়িক সঙ্কটে পড়া প্রতিষ্ঠান এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ঋণগ্রহীতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। প্রথম ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকতে পারে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সম্পদ শনাক্তকরণ, কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান যাচাই, পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন ঘাটতি নিরূপণ ছাড়া ব্যাংকিং খাত সুস্থ করা সম্ভব নয়।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সঙ্কুচিত
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) ঋণ বিতরণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় দুই লাখ পাঁচ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিতরণ কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এই প্রবণতা বিশেষ উদ্বেগজনক। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও সীমিত। ব্যাংক যখন খেলাপি ঋণের কারণে অতি-সতর্ক হয়, তখন জামানত ও ঋণযোগ্যতার শর্ত কঠোর হতে থাকে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তা এবং তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিকাশও প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি কমেছে; স্বস্তি ফিরেছে কি
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। পাশাপাশি ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশের নিচে।
মূল্যস্ফীতির হার কমা এবং পণ্যের দাম কমা এক নয়। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি থাকার অর্থ হলো, সাধারণভাবে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর আগের বছরের তুলনায় এখনো উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েই চলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের সঞ্চয় ক্ষয় হয়েছে, প্রকৃত মজুরি কমেছে এবং ব্যবসার কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন বহুগুণ বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয়ের বেশির ভাগ খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় হওয়ায় অনেক পণ্যের চাহিদা কমেছে। এর ফলে ব্যবসায় বিক্রি কমেছে, বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে।
কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা
অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতার জন্য খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করে ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান নিরূপণ ও কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে সরকারি ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল ও লাভজনক প্রকল্পে ব্যবহার নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, এসএমই খাতের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে এবং স্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় ঋণ দিতে হবে। চতুর্থত, রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য তৈরী পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্য ও বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে রফতানি ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। 
সর্বোপরি ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি প্রকৃত মজুরি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে।
মাথাপিছু আয় ভারতকে এর মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দুই হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলার হতে পারে। একই পূর্বাভাসে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দুই হাজার ৭৪৯ ডলার ধরা হয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। 
অর্থনীতিতে বৈদেশিক খাতের স্বস্তি যে সুযোগ তৈরি করেছে তা কাজে লাগাতে না পারলে রিজার্ভের উন্নতি ও রেমিট্যান্সের প্রবাহ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গভীর দুর্বলতাগুলোকে সাময়িকভাবে আড়াল করার আচ্ছাদন হয়ে থাকতে পারে। 
অর্থনীতির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ধারিত হবে কতটি নতুন শিল্প গড়ে উঠল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নীত হলো তার ভিত্তিতে। পরিসংখ্যানের সাময়িক স্বস্তি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশকে এখন উৎপাদনশীলতার বাস্তবতায় পৌঁছাতে হবে। 
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com

Advertisement