ইকতেদার আহমেদ
ইকতেদার আহমেদ। নয়া দিগন্ত

আমাদের সংবিধান প্রণয়নকালে রাষ্ট্র পরিচালনার যেসব মূলনীতির উল্লেখ ছিল তার মধ্যে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নবিষয়ক মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নং ১৮ক হিসেবে সন্নিবেশিত হয়। এতে বলা হয়েছে— রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে। স্ইে সাথে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি,  বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে। 
পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর বাস। তাদের সমন্বয়ে বিশ্বে এখন ১৯৫টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র আছে। এসব রাষ্ট্রের স্থলসীমানার অভ্যন্তরে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তুর ওপর দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও উপরিভাগের বায়ুমণ্ডলে সে নিয়ন্ত্রণ নেই। এ কারণে এক রাষ্ট্রের কার্যকলাপ দ্বারা ওই দেশের বায়ুমণ্ডল দূষিত হলে তা সেখানে শুধু সীমাবদ্ধ থেকে না। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে এবং সামগ্রিকভাবে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে বিরূপ প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা থেকে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত হয়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের অনেক অঞ্চল সমুদ্রে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা আছে। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেশি হওয়ায় পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতার বৃদ্ধি করছে। তাছাড়া সিএফসির (ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন) নিঃসরণ বেশি হওয়ায় ওজোন স্তর ভেদ করে সূর্যরশ্মির সাথে অতি বেগুনি রশ্মির পৃথিবীতে প্রবেশ ঘটছে। এ ধরনের অতি বেগুনি রশ্মির প্রবেশ পৃথিবীর সব ধরনের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। 
বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কলকারখানা থেকে নিঃসরিত কার্বনে স্বল্পোন্নত দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব রাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদানে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। পুরো পৃথিবীর পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। সে দায়িত্ব পালনে প্রতিটি রাষ্ট্র সচেষ্ট হলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন  ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। 
পৃথিবীর ভূ-ভাগ ও জলভাগ এবং উভয়ের অভ্যন্তরে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার এমনভাবে করতে হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট না হয়। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে নগরায়নে জলাভূমি ভরাটসহ কৃষিভূমির হ্রাস ঘটছে। নগরায়ন সংশ্লেষে রাস্তাঘাট ও দালানকোঠা নির্মাণকাজে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন পড়ছে তার জোগান দিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের বনভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে নদী ও খাল-বিলের পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে পানির ধারা ব্যাহত হওয়ায় নদী ও খাল-বিলে পলি জমে নাব্যতা হারাচ্ছে; যা জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিদ্যুতের আবিষ্কার মানুষের উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিতকরণে অশেষ অবদান রাখছে। বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবনের কথা চিন্তা করা অনেকটা অকল্পনীয়। বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে পৃথিবীতে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা মেটাতে মানুষ প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনবায়নযোগ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। অনবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎস কয়লা, খনিজ তেল ও গ্যাস। তিনটির মধ্যে প্রথমোক্তটি পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি হানিকর। দ্বিতীয়-তৃতীয়টির ব্যবহারে পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ অপেক্ষাকৃতভাবে প্রথমোক্তটির চেয়ে কম। অনবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কয়লার ভূমিকা অন্য দু’টির চেয়ে বেশি। অনবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিধায় উন্নত অনেক দেশ আগামী দু’দশকের মধ্যে এর ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। 
নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে জলবিদ্যুৎ অন্যতম হলেও এটি নির্মাণে বাঁধ দিয়ে নদী বা হ্রদের একপাশে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করায় বিপুল আবাদি ও বনভূমি এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনবসতি পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ কারণে পরিবেশের বিপর্যয়ের কথা ভেবে অনেক দেশ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন পরিহার করে চলছে। 
আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে যে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, প্রতিষ্ঠাকালীন এর বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫০ মেগাওয়াট। পরবর্তীতে দু’ধাপে বাড়িয়ে উৎপাদনক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠাকালীন দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক বিবেচনা করা হলেও পরবর্তীতে একাধিক গবেষকের গবেষণালব্ধ ফল থেকে জানা যায়, প্রকল্পটির কারণে যে পরিমাণ ফসলি জমি ও বনভূমি বিনষ্ট এবং জনবসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থের হিসাবে তা পরিমাপ করলে পরিবেশগত ক্ষতিসহ এর সম্মিলিত ক্ষতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি। 
অনবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, গৃহস্থালি বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রভৃতি পরিবেশবান্ধব। তাই বেশির ভাগ উন্নত দেশ এসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষা ছাড়া অন্য পাঁচটি মৌসুমে আকাশ উন্মুক্ত থাকায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল। তাছাড়া আমাদের দেশের সম্পূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় অঞ্চলটি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে খুব উপযোগী। আমাদের প্রতিটি শহরে দৈনন্দিন যে গৃহস্থালি বর্জ্যরে সমারোহ ঘটে; তা বিদ্যুৎ ও জৈবসার উৎপাদনে ব্যবহার না করায় এটি পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শহরাঞ্চলের সন্নিকটে বর্জ্য অপসারণে উন্মুক্ত জায়গার অভাব থাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জৈবসার উৎপাদনে ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ভাবার অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে  দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। 
আমাদের সংবিধানে যখন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নবিষয়ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয়েছে, এমন সময় দেখা যায়— তৎকালীন সরকার বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের সন্নিকটে রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিষ্ঠায় ভারতের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ওই এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এক সর্বগ্রাসী খেলায় লিপ্ত হয়। ভারতের যে প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের তৎকালীন আওয়ামী সরকার রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি সে দেশের তিনটি রাজ্যে পরিবেশগত কারণে একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ছাড়পত্র পায়নি। 
লক্ষণীয়, সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করায় পরিবেশগত যে ক্ষতি হচ্ছে, তা শুধু বাংলাদেশস্থিত সুন্দরবন নয়, ভারতস্থিত সুন্দরবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সুতরাং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর এমন প্রকল্প শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কথা চিন্তা করে পরিহার উত্তম ছিল।  
পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের পরিবেশ মানুষের বসবাস উপযোগী রাখতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত নীতিমালাটি প্রতিপালন অত্যাবশ্যক। এ কারণে বিশ্বের সব দেশের মানুষের মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়; এমন কাজ পরিহারে সচেতনতা সৃষ্টিতে পরিবেশবাদীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। পরিবেশবাদীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আজ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সংবিধানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে; তবে বাস্তবতা হলো— পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বইয়ে আবদ্ধ না রেখে বাস্তবিক অর্থে যেন জনকল্যাণ নিশ্চিত সম্ভব হয়, সে লক্ষ্যে বিশ্বের সব রাষ্ট্র এবং দেশে বসবাসরত শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস থাকা জরুরি। 
লেখক : সাবেক জজ এবং  সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

Advertisement