
চলতি মাসের ৫ অক্টোবর ছিল শিক্ষক দিবস। দিবসটি পালনের আগ মুহূর্তে শিক্ষকদের নিয়ে একটি কলাম লেখার ইচ্ছে ছিল। লিখি লিখি করেও আর হয়ে ওঠেনি। আমাদের শিক্ষার দুর্বলতম দিকটি কী তা নিয়ে লিখবো বলে মনোস্থির করেছিলাম। এ বিষয়ে লেখার অনুপ্রেরণাটা আসে সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘কালি ও কলমের’ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে অগ্রহায়ণ ও পৌষ ১৪৩২ সংখ্যা পড়তে গিয়ে। ছেলেবেলা থেকে শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষকের জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয়। ভালোবাসার টান থাকে সতত বহমান। তবে এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষকদের আমরা যেভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মনে রাখি, উচ্চতর শ্রেণীতে তার ধরন বদলে যায়। যেমন— নিজের কথাই যদি বলি, তাহলে বলতে হয় শিশু শ্রেণীতে আমার হৃদয়ে একজন শিক্ষকের স্মৃতি এখনো অমলিন। তার পড়ানোর ধরন এবং শিশুদের প্রতি যে দরদি আচরণ তা ভোলার নয়। তাই মানসপটে প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের শিক্ষকের জন্য ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা যাই বলি না কেন তা অম্লান থাকে জীবন ভর। সেই ছেলেবেলা থেকে শিক্ষার্থীরা খুঁজতে থাকে একজন আদর্শ শিক্ষক। যদিও বর্তমান সময়ে এসে দেশে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আগের সেই অম্ল-মধুর সম্পর্কে ফাটল বা চির ধরেছে। তাই বলে একেবারে টুটে যায়নি।
লেখার প্রারম্ভে বলে রাখা ভালো, আজ আমরা আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি খোঁজার প্রয়াস চালাব। আদর্শ শিক্ষক কাকে বলে, কী তার বৈশিষ্ট্য এর একটি সম্যক ধারণা পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক মনজুরুল ইসলাম স্মরণে ‘কালি ও কলমের’ সংখ্যাটি পড়ে। সেই চিত্রটি পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করার মানসে এই উপস্থাপনা।
আলোচনার শুরুতে দেখা যাক, একজন আদর্শ শিক্ষক আর জনপ্রিয় বা ভালো শিক্ষকের মধ্যে পার্থক্যটা কী। ভালো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে তার ছাত্র-ছাত্রীদের আনন্দদায়ক উপায়ে পাঠদান করেন। সন্দেহ নেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে একজন পছন্দের ব্যক্তি। শ্রদ্ধাভাজন। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক জনপ্রিয় শিক্ষকের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু। প্রিয় শিক্ষকমাত্র তার বাচনভঙ্গি অপূর্ব। অসাধারণ তার কল্পনাশক্তি। স্বপ্নময়। বিষয়বস্তুর গভীরে নিয়ে সবাইকে গভীরভাবে বেঁধে রাখেন শ্রেণিকক্ষে। জনপ্রিয় শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় ভাষা, শব্দ, চিন্তা, কল্পনার মিশেলে শিক্ষার্থীদের বোধগম্য করে উপস্থাপন করেন। যা শিক্ষার্থীর মনোজগতে ঝঙ্কার তোলে। হৃদয়ে অপার্থিব সুখানুভূতির জন্ম দেয়। শিক্ষার্থীদের চিত্ত প্রশান্ত ও বিগলিত হয়। ফলে শিক্ষকের প্রতি জন্মে শ্রদ্ধাবোধ। এ তো গেল ভালো শিক্ষকের কথা। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের সাথে তার তফাতটা কী। বস্তুতপক্ষে একজন জনপ্রিয় শিক্ষক এবং একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে পার্থক্য অতিসূক্ষ্ম। একজন ভালো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি ঠিকঠাকভাবে তথ্য-উপাত্তসমেত বুঝিয়ে থাকেন। বিষয়ের গভীরে নিয়ে যান শিক্ষার্থীদের। এটিই কী পাঠদানের সবকিছু? না। এর অতিরিক্ত শিখনশৈলী যিনি জানেন, তিনি হয়ে ওঠেন আদর্শ শিক্ষক। এ বাড়তি শৈলী একদিনে ধরা দেয় না। রপ্ত করতে হয়। এটি ধরা দেয় নিষ্ঠার সাথে চর্চায় এবং তপস্যায়।
ভালো শিক্ষক তথ্য-উপাত্তের বাইরে আর কিছু কি তার শিক্ষার্থীদের শেখানোর প্রয়োজন বোধ করেন? মনে হয় না। ভালো শিক্ষক মনে করেন, বিষয়বস্তু সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান পরিবেশন করাই তার দায়িত্বের সীমানা। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক জীবন জগৎ সম্পর্কেও তার ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণা দেন। কৌতূহলী করে তোলেন। যাতে একজন শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠতে পারে। তার জীবন চলার পথ হয় গতিময়। সহজ-সরল। পরিবেশ-পরিস্থিতি উপলব্ধিতে নিয়ে হয়ে উঠতে পারে আলোচিত মানুষরূপে। আদর্শ শিক্ষক তাই তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করেন জ্ঞানের প্রতি তীব্র আকুলতা। শ্রেণিকক্ষে সবার উপযোগী পাঠদানে একজন আদর্শ শিক্ষকের লক্ষ্য থাকে আধুনিক, পরিশীলিত রুচি, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অসামান্য রসবোধের সংমিশ্রণে বোধযোগ্য উপস্থাপনায় বিষয়বস্তু তুলে ধরা। এতে শিক্ষকের উপস্থাপিত বিষয়ে সহজে সংযোগ স্থাপন করতে পারে শিক্ষার্থী।
একজন আদর্শ শিক্ষক সময়ের দেয়াল ডিঙিয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে পান। নির্ভেজাল জ্ঞান তাকে এই অদৃশ্য দেয়াল ডিঙাতে সাহায্য করে। একজন ভালো শিক্ষকের চেয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক সব সময় অনেকগুণে এগিয়ে থাকেন।
মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কী শেখান? তিনি তার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান নয়, প্রজ্ঞা বিতরণ করে নিজের কর্তব্যকাজ সুচারুরূপে সম্পাদন করেন। প্রশ্ন আসে— তাহলে জ্ঞান আর প্রজ্ঞার ভেদরেখাটা কী? এর জবাবে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ধরা যাক— কোনো দেশে বইয়ের দোকানে শেলফের তাকের অর্ধেকটায় থরে থরে সাজানো আছে ধর্মীয় বই। বাকি অর্ধেকটা সমাজতান্ত্রিক আদর্শে লিখিত বই। এই পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের সাজিয়ে রাখা বইয়ের পরিসংখ্যানটি একটি তথ্য। এটি কেবল একটি তথ্য হিসেবে ভালো শিক্ষক ব্যবহার করে থাকেন। তিনি তথ্যটি বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের দেখান, উভয় ধরনের বই বিক্রি সমান সমান মানে, আদর্শিকভাবে ওই দেশের মানুষ জ্ঞান পিপাসু। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক এখানে থেমে থাকেন না। তিনি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সমাজের চিত্র আঁকেন। তার বিবেচনায় যে দেশের বুকস্টলে পরস্পরবিরোধী বই বিক্রি হয় সমান সমান। সেই দেশের সমাজ তীব্রভাবে বিভক্ত। সে দেশে সামাজিক বিভাজন ও পরস্পরের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এখানে প্রথমটি হলো জ্ঞান। দ্বিতীয়টি প্রজ্ঞা।
আমাদের অনেকের জানা, সঠিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারলে তা পরিণত হয় জ্ঞানে। আর জ্ঞানের চূড়ান্ত রূপই প্রজ্ঞা। তথ্যের বিশ্লেষণী কৌশল জানা থাকায় একজন ভালো শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করেন জ্ঞান। অন্যদিকে জ্ঞানের অগ্রবর্তী রূপের সন্ধান যিনি পান, সেই শিক্ষক প্রজ্ঞাকে ছুঁয়ে দেখেন। এমন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় অর্জিত প্রজ্ঞা শিক্ষার্থীদের বিলিয়ে দেন। এতে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্য ধরা দেয় অমৃতসম হয়ে। যেমন মিষ্টির দোকানের অমৃত রসে টইটুম্বুর হলে, তার স্বাদ যেমন ভোলা যায় না। ঠিক তেমনিভাবে জ্ঞানকে অতিক্রম করে যিনি প্রজ্ঞায় উপনীত হন, তিনি শিক্ষকতা পেশায় পরিণত হন একজন আদর্শ শিক্ষকে।
আমাদের শিক্ষব্যবস্থায় এমন শিক্ষক দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। তাই এ মুহূর্তের শিক্ষার এই হাল। তবে এমনি এমনি তো আর এ অবস্থায় আমরা পৌঁছাইনি। এর পেছনের অন্যতম কারণ— আমাদের বিবেচনায় শিক্ষকের সন্তোষজনক বেতনকাঠামো না থাকা। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের শিক্ষকদের বেতনভাতা কম হওয়ায় মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হন না। গড়পড়তা শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশার শূন্যতা পূরণ করছেন। ফলে দেশে কিছু ভালো বা জনপ্রিয় শিক্ষকের দেখা মিললেও প্রজ্ঞাবান অর্থাৎ আদর্শ শিক্ষকের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। আদর্শ শিক্ষকের আকাল বা দুর্ভিক্ষে দেশে শিক্ষার মানের আজ এই দুর্দশা।
শিক্ষকের সম্মানজনক বেতন-ভাতা না দেয়ার মানসিকতা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যতদিন বহাল থাকবে, ততদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নড়বড়ে অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। এই দুর্বলতা দূর না করে যতই বলি না কেন— শিক্ষক গড়ে তুলতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আসতে হবে। তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হলে, টেকসই শিক্ষা চাইলে অবশ্যই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতনভাতা দিতে হবে। তবে শুরু করতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকে।
কাঙ্ক্ষিত বেতনকাঠামো প্রণয়ন না করলে শিক্ষার যে সর্বনাশা অবস্থা তা থেকে উত্তরণে পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়— সব স্তরে যদি শিক্ষকরা লাখ কিংবা লাখের বেশি টাকা বেতন পান; তাহলে বিসিএস পরীক্ষায় সময় নষ্ট না করে মেধাবীরা চোখ বন্ধ করে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেবেন, এতে কোনো সংশয় নেই। শিক্ষকদের মধ্যে ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে যে বঞ্চনায় ধূমায়িত ক্ষোভের জন্ম হয়েছে। এ ক্ষোভ জিইয়ে রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা কি আমরা গড়ে তুলতে পারব?
পরিশেষে বলা যায়, প্রজ্ঞাবান শিক্ষক পেতে হলে ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা শিক্ষকসমাজের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে হবে। তা না হলে আমরা যে ছেলেবেলায় প্রাথমিক স্কুল পরিদর্শক ইংরেজ সাহেবের তিন ঠ্যাংওয়ালা কুকুরের গল্প শ্রেণিকক্ষে পড়েছি; সেই গল্প এখনো শুনতে হবে। এ গল্পে বর্ণিত অভাবী শিক্ষক তার যাপিত জীবনের কথা উদাহরণসমেত যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তা যে নিদারুণ মর্মবেদনার, গল্পকার গল্পটিতে সেই রূঢ় বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। এখনও কি তেমন অবস্থা থেকে আমরা পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পেরেছি?
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








