
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যর্থতার ইতিহাসটা দীর্ঘ। এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ঘিরেও একটি দোলাচল বিরাজ করছে। সেটি যে খুব অস্বাভাবিক তাও নয়। নতুন এ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই নবীন। তাদের কথা বলার ভাবভঙ্গি, ভাষা, আচরণ, শিষ্টাচার, অসহিষ্ণুতা প্রবলভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। এ শাসনপদ্ধতির সাথে যা মানানসই নয়। এসব দেখে অনেকের মনে হয়তো এমন দোলাচলের উৎপত্তি। এর সাথে আরো কিছু কথা থাকতে পারে। সেটি না হয়, একটু পরে বলা যাবে। এটাও সত্য, সবার মনে রাখতে হবে, সংসদীয় গণতন্ত্রের যে উত্তম শৈলী, অতীতের কোনো সংসদে তা অনুসৃত হয়নি। অর্থাৎ সংসদীয় গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্য কোনো ঐতিহ্য এ সংসদ উত্তরাধিকার সূত্রে পায়নি। দোলাচলের এটাও একটি কারণ হতে পারে। এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলানোর দায়িত্ব কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সেই পথ রচিত না হলে, বিপদ কারো একার হবে না।
মানুষ শুনেছে, এ দেশ থেকে পুকুর কাটার অভিজ্ঞতা অর্জনে এক প্রতিনিধিদল বিদেশে পাঠানোর কথা ছিল। সংসদে এ দোলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রস্তাব হয়তো অযৌক্তিক নয়। দু’পক্ষের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘প্র্যাক্টিস’ দেখা ও শিখতে পাঠানোর প্রস্তাব এলে, তা ভেবে দেখা অনুচিত হবে না।
সবাই একমত হবেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের মাতৃভূমি যুক্তরাজ্য। সেখানে যা দেখা যায়— তা হলো ব্রিটিশদের প্রশংসিত সাবতীয় আচরণ। এর প্রতিফলন ‘হাউজ অব কমন্সে’ প্রতিফিত হয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টর শিষ্টাচার, যুক্তিতর্ক, ধৈর্য, সহনশীলতা, মৃদুভাষণ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সত্যি শিল্পসম্মত। সেখানে সমালোচনা শুনলে কেউ ক্ষিপ্ত না হয়ে হাসিমুখে তার উত্তর দেন। একবার চোখ বুজে ভাবুন তো, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কী হচ্ছে? আমাদের জাতীয় সংসদ যেন শক্তি প্রদর্শনের একটি রিহার্সাল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে অনেক কিংবদন্তি আছে। এর একটি হচ্ছে, হাউজ অব কমন্স এমন কিছু নেই যা করতে পারে না। পারে না শুধু ‘নারীকে পুরুষ ও পুরুষকে নারী’তে রূপান্তরিত করতে। যে হাউজ এত শক্তি সামর্থ্য-ক্ষমতার অধিকারী, তার প্রদর্শন নিয়ে সেখানে কখনো কোনো মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যের গা গরম হয় না। প্রতিপক্ষকে গালমন্দ না করে তাদের সমালোচনা ধৈর্যের সাথে শোনেন। প্রতিউত্তরে মৃদু হেসে বলেন, ‘সরি’। সেখানে শিল্পসম্মত হাস্যরস হয়। তবে মনে যা আসে, তা কেউ বলেন না। মেপে মেপে তথ্যভিত্তিক কথা বলেন। প্রশ্ন হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর ব্রিটিশ পার্লামেন্টর কাছ থেকে আমাদের শেখায় সমস্য কোথায়! সবার জানা, কোনো বয়স নেই শেখার, কোনো শেষও নেই। কবি সুনির্মল বসুর ভাষায়, ‘বিশ্বজুড়ে পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’। এ মুহূর্তে শেখার বিষয়টি কোনো বাহুল্য নয়। কারণ সংসদ চালাতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এ অর্থ যেন অর্থপূর্ণ হয়, তা সবার খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ এখনো সঠিক স্থানে পা রাখতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন। এর অর্থ এ নয় যে, ত্রয়োদশ সংসদ এখনো জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। অনেক ব্যত্যয় ও অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও সংসদের গত কয়েকটি অধিবেশনে সংসদীয় গণতন্ত্রের সঠিক ধারাটি অনুসরণের চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। এটি মন্দ সূচনা নয়। সংসদকে ইতিবাচক করতে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের যে শক্ত অবস্থান, দৃঢ় সিদ্ধান্ত, সব সংসদ সদস্যের সাথে আইনানুগ আচরণ; তাদের এই ভূমিকা ইতোমধ্যে দলমত নির্বিশেষে প্রশংসনীয় হচ্ছে। তাদের সংসদের মাস্টার ভাবা একেবারে অনুচিত। তারা সংসদকে সঠিক ট্র্যাকে তুলে আনার চেষ্টা করছেন। সংসদকে কার্যকর ও গতিশীল করার ক্ষেত্রে উভয়ের এমন ভূমিকা সংসদকে নিয়ে অচিরে আশাবাদ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে পারে।
গত তিনটি সংসদের (দশম, একাদশ ও দ্বাদশ) কার্যক্রম নিয়ে ছোট একটি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, রাষ্ট্রের কষ্টার্জিত অর্থ সেখানে অর্থহীনভাবে ব্যয় করা হয়েছে। ওই তিন সংসদে, সংসদ নেতা শেখ হাসিনার প্রশংসা, স্তুতি ও প্রশস্তি গাওয়ার সুযোগ দেয়ায় রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে একশত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তদানীন্তন স্পিকার, এমপিদের সংসদ নেতাকে অমিয় বাণী শোনাতে প্রচুর সময় দিয়েছেন। সংসদ নেতা আনন্দচিত্তে মুখটিপে হেসে তা উপভোগ করেছেন। এ তথ্য কোনো অপতথ্য নয়। সে সময় একটি জাতীয় দৈনিকের পরিবেশিত, জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে পাওয়া একটি তথ্য। তাই বিষয়টি সবার স্মরণে রাখা উচিত।
বাংলাদেশে সংসদ কখন কতটা ‘হাউজ অব কমন্সের’ অনুরূপ রূপে দেখা যাবে তা কেউ জানেন না। তবে এটি কতটা যুক্তিযুক্ত এবং এই দেশের মানুষের মনমানসিকতা ও স্থানীয় বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে কতটা সম্ভব, ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠুক সেটি যেমন প্রত্যাশিত, ঠিক তেমনিভাবে সাদাকে সাদা বলা হয়। এ আলোকে বলা অনুচিত হবে না যে, শিষ্টাচার, শ্রদ্ধা, সৌজন্য, শারীরিক ভাবভঙ্গি দেশের সংসদে যা এখন হচ্ছে, তাকে সঠিক বলা যাবে না। সর্বত্র জনকল্যাণে আইন, সন্ত্রাস, অরাজকতা রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা, নাগরিকের জানমালের সুরক্ষা দেয়া, সবার মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা। এসব অবশ্যই স্থান-কাল পাত্রভেদে সর্বত্র এক ও অভিন্ন। এ ধারণা বিশ্বজনীন।
বাংলাদেশের সংসদে হাজির থাকা অনেক রাজনৈতিক আমলার মন্ত্রণালয়গুলো, সঙ্কট উত্তরণে পথনকশা রচনা এবং সেটি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে না বলে পর্যবেক্ষকদের অনেকের ধারণা। জনসম্পৃক্ত এ চাহিদাগুলো এড্রেস না হলে মানুষের কাছে সেটি আর গণতান্ত্রিক সংসদ বলে কেউ মনে করবেন না। তখন এই সংসদের আগে একটি নেতিবাচক বিশেষণ যুক্ত হবে। জনগণের মনে তেমন তকমা পাওয়া সংসদ কখনো স্থান পাবে না। এমন সংসদ কখনো জাতির আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয় না। দেশের গণতন্ত্র এখনো খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। মাত্র কয়েক মাস হলো জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। এর শরীর থেকে এখনো নতুনত্বের ঘ্রাণ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। সবার মনে হয়তো এমন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে— এত অল্প সময়ের মধ্যে রাজনীতি কেন সংসদ থেকে রাজপথে। রাজনীতি তো কেবল সংসদে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা। এটিই তো সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সেখানে হাজারো প্রশ্ন উঠবে, সেখান থেকে উত্তর আসবে। আলোচনায় সংসদ উত্তপ্ত হবে। আবার শীতল হবে। পরস্পর মোসাফা হবে; কিন্তু এ সংসদ নিয়ে এখনই কেন মানুষের চোখে-মুখে প্রশ্ন। সংসদ নিয়ে মানুষের কত আশা ও ভালোবাসা। জনগণ নিজে এ সংসদ গড়ে দিয়েছে অনেক প্রাপ্তির আশায়।
ত্রয়োদশ সংসদের বর্তমান ঘর-বাইর নিয়ে কার দায় কতটুকু সেটি নির্ণয়ে দায় কখনো সংবাদপত্রের নয়। সংবাদপত্র শুধু ঘটনার পরম্পরা তুলে ধরতে পারে। সংসদের পক্ষ-বিপক্ষকে এ নিয়ে বোঝাপড়া করতে হবে। জনগণই তার মাপজোখ করবেন। সাধারণত এটাই প্রথা, সংসদীয় গণতন্ত্রের সরকারি দলের দায়িত্ব হলো বিরোধী দলের বক্তব্য ও দাবিকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে একক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের ব্যাকরণে সেটি শুদ্ধতা পায় না। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শুরু থেকে অর্থাৎ গত সেপ্টেম্বরে ১০টি সংসদীয় কমিটি গঠনকালে বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান পদে যথেষ্ট স্পেস দেয়া হয়নি। ২৫টি কমিটি গঠিত হয়েছে। তার একটিতে কেবল বিরোধী দলের সদস্যদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। ঘটনাটা হয়তো খুব বড় নয়; কিন্তু ছোট ঘটনা বড় ঘটনার পূর্বাভাস দেয়।
সরকারের প্রধানত দায়িত্ব সংসদকে কার্যকর রাখা। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকার আইন পাস করতে পারে। শুধু আইন পাস করা সংসদের শেষ কাজ নয়। এটা সংসদের স্বাভাবিক রুটিন। সরকার যদি বিরোধী দলের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেয়, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের পর্যাপ্ত স্পেস না থাকে। প্রশ্নোত্তর ও বিতর্ককে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়। কিংবা বিরোধী দলের রাজনৈতিক উদ্বেগের সংসদীয় সমাধানের পথ সঙ্কুচিত হয়। তাহলে বিরোধী দল সংসদের বাইরে জনসমর্থন খোঁজার দিকে যেতে পারে, যা এখন রাজপথে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ানো শুরু করেছে।
অন্য দিকে বিরোধী দলেরও সংসদীয় দায়িত্ব কম নয়। বিরোধী দল মানে সরকারকে প্রতিটি বিষয়ে অস্বীকার করা নয়। সংসদে উপস্থিত থেকে প্রশ্ন করা, সংশোধনী প্রস্তাব দেয়া, আইন নিয়ে যুক্তি তুলে ধরা, সংসদীয় কমিটিতে অংশ নেয়া এবং জনগণের অভিযোগ সংসদে উপস্থাপন করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বিরোধী দল যদি সংসদকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত রাজপথে চলে যায়, তাহলে সংসদীয় রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে অতীতেও এমন নজির আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জন এবং রাজপথের আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিকে দুর্বল করা প্রধান কারণ।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি গণতান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে নয়। সভা, সমাবেশ, মিছিল ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক মাধ্যম হতে পারে। সমস্যা তখন হয়, যখন সংসদীয় প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে রাজপথকে একমাত্র কার্যকর রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে দেখা হবে। সংসদ থেকে রাজপথে রাজনীতি চলে যাওয়ার পেছনে সরকার ও বিরোধী— দুই পক্ষের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক আচরণের ওপর। বিরোধী দল যদি সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাজপথে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে, তাহলে দু’টি পথ একসাথে চলতে পারে; কিন্তু সংসদীয় আলোচনা যদি ক্রমে গুরুত্ব হারায় এবং প্রতিটি রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান রাজপথে খোঁজা হয়, তাহলে সঙ্ঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্য দিকে সরকার যদি সংসদকে আরো উন্মুক্ত করে, বিরোধী দলের সংসদীয় অধিকার ও কমিটিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ বাড়ায়, তাহলে রাজপথের চাপ সংসদের ভেতরের রাজনৈতিক আলোচনায় রূপান্তরিত হতে পারে।
নতুন সংসদের শরীরে এখনো নতুনত্বের ঘ্রাণ আছে। তাই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন সংসদকে গ্রাস করবে, নাকি নতুন সংসদ পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করবে, তা-ই দেখার বিষয়। অনেকে তক্কে তক্কে আছে, পুরনো সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার। কারো পা যেন সেই ফাঁদে না জড়ায়। গণতন্ত্রকে সফল করার এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। তবে চার দিক থেকে ঈশান কোণে কালো মেঘ ছুটে আসছে, হুঁশিয়ার থাকতে হবে। সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত
ndigantababar@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








