
রাজধানী ঢাকাসহ জেলায় জেলায় একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মাস্তান বাহিনীর নেতৃত্ব দিত। এখন রাজনৈতিক দল, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা এমন অপকর্মে যুক্ত। তখনো সন্ত্রাসী গ্রুপ শুধু অপরাধ করে খান্ত হতো না, আধিপত্য বজায় রাখতে পরস্পর সংঘর্ষেও জড়াত। ইদানীং সেই সন্ত্রাসী বাহিনীর জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে কিশোর গ্যাং। উঠতি বয়সীরা সাধারণত সঙ্গদোষে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পরে গড়ে তোলে কিশোর গ্যাং। তাদের একটি অংশ সুবিধাবঞ্চিত পরিবেশ থেকে এলেও মধ্যবিত্ত-সচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও সম্প্রতি এপথে পা বাড়াচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, যে বয়সে একটি কিশোরের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সে যদি তার হাতে উঠে আসে অস্ত্র, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হচ্ছেও তাই। কিশোর গ্যাংয়ের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমাদের মনে থাকার কথা, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা জনপরিসরে প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে উত্তরায় আদনান কবীর হত্যার ঘটনায়। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আদনানকে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের খেলার মাঠে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তখন থেকে বিরতি দিয়ে কিশোর গ্যাং কালচার নিয়ে দেশে ব্যাপকভাবে আলোচনা শুরু। দেশে নানা প্রান্তে বখাটে কিশোরদের সন্ত্রাসী গ্রুপ এমন সব কর্মকাণ্ড করছে, যাতে শান্তিপ্রিয় নাগরিকের পিলে চমকে যাচ্ছে।
একটি কিশোর অপরাধী হয়ে জন্মায় না; পরিবেশ ও সঙ্গদোষ অনেক সময় তাকে সে পথে ঠেলে দেয়। ডিএমপি সূত্র বলছে, ২০২৩ সালে রাজধানীতে যত খুন হয়েছে, তার ২৫টি কিশোর গ্যাংসংশ্লিষ্ট। দেশে কিশোর গ্যাং কালচার একদিনে গড়ে ওঠেনি। এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদের প্রশ্রয় ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় এসব গ্রুপ এখন ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হয়েছে। রাজধানীতে, বড় শহরে মানুষের নিরাপত্তার প্রতি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেতাদের কেউ কেউ সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করে। কেউ বা রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও আশ্রয় পায় রাজনীতিবিদদের কাছে। পুলিশের প্রতিবেদনেও এমনটাই বলা হয়েছে।
সারা দেশের ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে। এতে বলা হয়, ‘সারা দেশে অন্তত ১৭৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৭৮০টি। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৯০০ জন। রাজধানীতে কিশোর গ্যাং রয়েছে ৬৬টি। চট্টগ্রাম শহরে ৫৭টি। মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৪টি গ্যাং। বেশির ভাগ বাহিনীর সদস্য ১০ থেকে ৫০ জন’। (প্রথম আলো, মুদ্রণ সংস্করণ, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি এখন আর শুধু কিশোর অপরাধের সাধারণ পরিসংখ্যান নয়। এটি এক বিষাক্ত, সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকাঠামোর নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংস হামলায় অপ্রতিম নামের সম্ভাবনাময় কিশোরের নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের বিবেককে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। তবে অপ্রতিমের হত্যার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন রক্তপাত নয়। রাজনৈতিক তোষণনীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং একটি ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি। বলা ভালো, অপ্রতিম সুনির্দিষ্ট এক ক্ষমতার বলি।
চিন্তার বিষয় হলো, যে বয়সে কিশোরদের হাতে বই, খেলার সরঞ্জাম কিংবা সৃজনশীল ভাবনা থাকার কথা, সে বয়সে তারা হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র ও মাদক। অপ্রতিম হত্যার দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক খেলা কিভাবে এক প্রাণবন্ত কিশোরকে কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে দিল। আসলে হামলাকারী কিশোররা নিমিত্ত মাত্র। তারা অপরাধের সাহস পায় এ জন্য যে, তারা জানে, তাদের মাথার ওপর সুরক্ষাবলয় বা ‘ছাতা’ আছে। অপ্রতিম হত্যা শুধু কুমিল্লার একক কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি শহর-উপশহরের অলিগলিতে থমকে থাকা আতঙ্কের এক প্রাত্যহিক চিত্র। কোনো দেশে কাঠামোগত অবহেলা ও আইনি ব্যর্থতা, আইনের শাসন ও সামাজিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়লে তা সমান্তরাল ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে। এখনি যদি কিশোর গ্যাং কালচার রোখা না যায়, তাহলে আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতিই অপেক্ষা করছে।
প্রশ্ন হলো, কিভাবে কিশোররা পাড়ার বখাটেপনা ছাড়িয়ে এক একটি খুনে বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে? এই অপশক্তির পেছন থেকে কারা সুতা নাড়াচ্ছে? কাদের স্বার্থে এবং কাদের মদদে লালিত-পালিত হচ্ছে অরাজকতা? এসব প্রশ্ন শুভবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলেছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোরদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার (সিনিয়র-জুনিয়র) দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রথম বিরোধ ও জোট বাঁধার প্রবণতা তৈরি হয়। সেখান থেকে গড়ে ওঠে গ্যাং। তাদের প্রশ্রয় দেয় এলাকার রাজনীতির সাথে যুক্ত বড় ভাইয়েরা। আগে আমাদের সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষায় পরিবার ও স্থানীয় মুরুব্বিদের ভূমিকা ছিল। তারা কিশোরদের বখাটেপনার প্রশ্রয় দিতেন না। এখন মুরুব্বিদের জায়গাটি নিয়েছেন রাজনীতির সাথে যুক্ত অনেকে। তারা কিশোরদের ব্যবহার (পড়তে হবে অপব্যবহার) করছেন নিজস্ব হীনস্বার্থে। মোদ্দাকথা, যারা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ অপরাধ সৃষ্টির অংশ হিসেবে কাজ করছেন। সেখান থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
কিশোর গ্যাং সৃষ্টি ও ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রাষ্ট্র কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না। তবে এ অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে আছে একগুচ্ছ কারণ। প্রথমত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতার অভাব। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন কিশোর গ্যাংয়ের গতিবিধি সম্পর্কে অজ্ঞাত নয়। বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খুব ভালো করে জানেন, কোন গলিতে কাদের নিয়ন্ত্রণে গ্যাং পরিচালিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, অসৎ আর্থিক সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক অনীহায় অপরাধ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ না করে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, শিশু আইনের অপপ্রয়োগ। শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ নেই। অপরাধের মূল কারিগর ও মদদদাতারা আইনের এ ফাঁক ঠাণ্ডামাথায় কাজে লাগাচ্ছে। তারা কিশোরদের অপরাধের ঢাল বানায়। তারা জানে, এদের সহজে গ্রেফতার করা গেলেও দ্রুত জামিনে বের করা সম্ভব। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে কঠোর শাস্তি এড়ানো সহজ। জামিনে ছাড়িয়ে এনে এসব কিশোরকে ফের স্বার্থসিদ্ধির কাজে লাগানো সহজ হয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক পরিসরের অভাব। তরুণ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা বিনোদনের সুব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। শহরগুলোর প্রতি ইঞ্চি জমি দখল করে গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক ভবন। অথচ নেই কিশোরদের মানসিক বিকাশের কোনো উন্মুক্ত স্থান। এ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শূন্যতা কিশোরদের গ্যাং কালচারের অন্ধকার গলিতে ঠেলে দিচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে কারা? নিশ্চয় কায়েমি স্বার্থ।
কিশোর গ্যাংয়ের ‘লাভজনক মডেল’ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বিচ্যুতি নয়; এটি একটি ঠাণ্ডামাথার ‘বিজনেস মডেল’। সেই সাথে এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের বর্তমান সময়ের মন্দ প্রবণতাও এতে জড়িয়ে আছে। কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলের ‘লো-কস্ট, হাই-রিটার্ন’ স্বার্থরক্ষা পায়। রাজনৈতিক সুবিধাবাদী শ্রেণী, পাড়া-মহল্লার কথিত ‘বড় ভাই’ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উঠতি রাজনৈতিক নেতারা কিশোরদের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করতে কসুর করেন না। যেমন- দলীয় মিছিল-সমাবেশে লোকবল দেখানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, দখলদারিত্ব বা ভোটকেন্দ্র দখলের মতো বেআইনি সব কাজে নামমাত্র মূল্যে কিশোরদের যথেচ্ছ ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। এছাড়া মাদক ও অবৈধ ব্যবসায় চক্রের খপ্পরে কিশোররা খুব সহজে পড়ে। মাদকের বাহক (ক্যারিয়ার) হিসেবে ব্যবহৃত হয় তারা। মাদক কারবারিরা নিজেদের আড়াল করতে কিশোরদের হাতে অর্থ ও মাদক তুলে দেয়। ফলে একসময় এরা চক্রের চিরস্থায়ী দাসে পরিণত হয়।
চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যেও কিশোর গ্যাং ব্যবহারের নজির ভূরি ভূরি। পরিবহন স্ট্যান্ড, ফুটপাথ, বাজার ও নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা তুলতে বয়স্কদের চেয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পরিচালনা করা সহজ ও কম ব্যয়বহুল।
উপরিউল্লিখিত আলোচনার পর গ্যাংয়ের ক্ষমতার উৎস অনুসন্ধান করলে এর একটি ক্ষমতাকাঠামো সামনে আসে। এতে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা যারা এলাকায় ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত; এরা আসলে মধ্যস্বত্বভোগী। গ্যাং লিডারের সাথে তারা সার্বক্ষণিক সমন্বয় করে থাকেন। আর মাঠপর্যায়ের কিশোররা হয় বলির পাঁঠা। এই ক্ষমতাকাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরে থাকেন রাজনৈতিক অভিভাবক। মাঝে থাকে মধ্যবর্তী ‘বড় ভাই’ গোষ্ঠী। এই বড় ভাইয়েরা কিশোরদের বাইক চালানো, ক্যাফেতে আড্ডা, সেলফি তোলার সুযোগ কিংবা বিপদে পড়লে পাশে থাকার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অপরাধে প্ররোচিত করে। এদের আশকারায় সমাজবিরোধী কাজ, এমনকি খুনখারাবি করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এক্ষেত্রে মদদদাতারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা শিশু আইনের সুবিধা নেয়ায় দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পরিণামে কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি নৃশংস রূপ ধারণ করার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সোশ্যাল মিডিয়া গ্যাং কালচারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় করা তুচ্ছ মন্তব্য নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে হত্যার মতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
দেশে ছড়িয়ে পড়া কিশোর গ্যাং কালচার এখনই প্রতিরোধ করা না গেলে আখেরে আমাদের এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। এই অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবারকে সন্তানের বন্ধু, চলাফেরা ও আচরণের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। শৈশব থেকে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি সন্তানকে চোখে চোখে রাখতে হবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








