৭ নভেম্বর
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর বিষয়ে আলোচনা সভা। সংগৃহীত

জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা। বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান— প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনাই বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। 

Advertisement

তারা বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) আয়োজিত ‘জাতীয় ঐক্য : ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। 

Advertisement

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। কি-নোট বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম। 

সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক তারেক পজল, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান, মেজর (অব.) এইচ খান, ড. নাসিমুল গণি, মেজর (অব.) আমিন আফসারীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘৭ নভেম্বরকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের বয়ান তৈরি হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে গিয়ে সৈনিকরা কর্নেল তাহেরকে বের করে এনেছিল, এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। মেজর জিয়াউর রহমানের মতো জনপ্রিয় নেতা বাংলাদেশে আর কেউ ছিলেন না। তিনি সৎ, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে ছিলেন অনন্য।’

তিনি বলেন, “কর্নেল তাহের ও তার অনুসারীরা ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকেও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা আরেকজন জিয়াউর রহমান পাব কি না, জানি না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে সুস্পষ্ট, সাহসী ও দৃঢ় “

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক নানা ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন থাকতে হবে।

কি-নোট স্পিকার অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সংকট ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করতে হবে। ৭ নভেম্বরের অন্যতম শিক্ষা হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। ইতিহাসের এই অধ্যায়কে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করলেও আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান,প্রতিটি ঘটনাই জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক সহযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে।’

অধ্যাপক মাসুম আরো বলেন, ‘৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ কেবল অতীত স্মরণ করা নয়; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। জাতীয় ঐক্য ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়, আর গণতন্ত্র ছাড়া প্রকৃত জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লবের সময় অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার চেয়েও বহুগুণ বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণেরা অনেকেই অপরিচিত মুখ হয়েও ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সরকার জুলাইয়ের সেই মেধাবী ও সাহসী তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। জুলাই সনদকে বারবার বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। এখন বিরোধী দল ও সরকারি দলের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা না বাড়িয়ে রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, ‘মানুষ তার নিজস্ব ধারণা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। জিয়াউর রহমান রাজনীতির সংজ্ঞা বদলে দিতে চেয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক নেতাদের জন্য রাজনীতিকে আরও দায়িত্বশীল ও কঠিন করতে চেয়েছিলেন। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিগত ধারণা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শুধু ঐক্যের কথা বললেই হবে না, মানুষের কল্যাণকে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বাস্তব কোনো সমাধানে আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি। জিয়াউর রহমান সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে পথ চলার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও আমরা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে হবে জুলাই সনদ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছাড়া জাতির মুক্তি নেই।’

ব্যারিস্টার সারোয়ার জাহান বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ বারবার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়েছে। জাতি গঠনের সুযোগ কয়েকবার এলেও আমরা বারবার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে গেছি। সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়া এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসাথে ফ্যাসিবাদী শক্তি যাতে পুনরায় ফিরে আসতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে ইনসাফ নিশ্চিত করা। কিন্তু মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। দুর্নীতিবাজদের বিচারের ক্ষেত্রে এত টালবাহানা কেন?’ 

তিনি বলেন, ‘৭২-এর সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। জুলাই সনদ কেবল এসি রুমে বসে নয়, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রণয়ন করা উচিত ছিল।’

সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান। জনগণ কার্যকর সংসদ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা দেখতে চায়। পরাজিত শক্তি দেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে। কোনো জাতীয় চেতনা বা ঐতিহাসিক অর্জন একক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ হতে পারে না।’

প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর ছিল জনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।’ তার মতে, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলেও ৭ নভেম্বর জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তিনি ৭ নভেম্বরকে বিএনপির রাজনৈতিক সনদের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, ‘আমরা যে ব্যবস্থার মধ্যে আছি, সেটিকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায় না। এখানে ক্ষমতাতন্ত্র, প্রতারণাতন্ত্র, তোষামোদতন্ত্র ও ঘুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রে অনেক সময় দৃশ্যমান নয়, বরং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও জুলুম-নির্যাতন পরিচালিত হয়।’

ড. নাসিমুল গণি বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না।’

মেজর (অব.) আমিন আফসারী বলেন, ‘ঐক্য কেবল আহ্বান জানিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না; নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই ঐক্যের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। দেশে চাঁদাবাজি ও তোষামোদনির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। সরকার সঠিক পরামর্শ গ্রহণ না করলে শেষ পর্যন্ত সরকারকেই তার মূল্য দিতে হবে।’

মেজর (অব.) এইচ খান বলেন, ‘মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যখন একটি জাতি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একমত হয়, তখনই প্রকৃত জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়। রক্তপাত ও প্রতিশোধের ওপর কোনো ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। অন্যায়কে অন্যায় এবং ন্যায়কে ন্যায় বলার সাহস থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো একক দলের সম্পদ নয়, ৭ নভেম্বরও কোনো একক দলের সম্পদ নয়। জাতীয় ঐক্যের পূর্বশর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করা।’

সভাপতির বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ‘ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বিভক্তির বীজ থেকে আমরা আজও বের হতে পারিনি। বারবার জাতি বিভক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও আমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছি। জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে সেই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তাদের এই উদ্যোগ।’

তিনি বলেন, ‘যখনই জাতি সঙ্কটে পড়েছে, তখনই জাতির ভেতর থেকে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। ৭ নভেম্বরের শিক্ষা ধারণ করে সব মত ও পথের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’