প্রধানমন্ত্রী, উপদেষ্টা, মাহদী আমিন, গ্যাস সঙ্কট
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন ছবি: ইন্টারনেট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দেশে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে এবং আগামী দিনেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। একই সাথে সরকারের সাত মাসে জনকল্যাণে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সরকারের সাত মাস পূর্তি উপলক্ষে আজ বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের পথচলা শুরু হয়।

মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সাথে বৈঠকে গ্যাস সরবরাহ সঙ্কট কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অত্যন্ত স্বল্প সময়ে গতকাল থেকে তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। শিল্পকারখানাগুলো আবারো সচল রাখা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

সরকারের সাত মাসের অগ্রগতি তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জনকল্যাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি  হয়েছে। ১৬ বছরের শাসন-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুনভাবে দেশকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে বর্তমান সরকার জনগণের প্রকৃত কল্যাণ সাধনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

মাহদী আমিন বলেন, ‘একটি সুখবর দিতে চাচ্ছি। সেটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডি’র রেটিংয়ে বাংলাদেশকে গতকাল (মঙ্গলবার) নেতিবাচক থেকে একটা লম্বা সময় পর স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরত আনা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বর্তমানে বিনিয়োগের জন্য সারাবিশ্বে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র।’

তিনি আরো বলেন, ‘যার প্রেক্ষিতে আমরা বিশ্বাস করি- শুধু বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগই বাড়বে না, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদাই বাড়বে না বরং আমাদের ট্রেড ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট অর্থাৎ নারী যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য যে কর্মসংস্থান প্রয়োজন, সেটিও একটি ইতিবাচক ধারায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার জনকল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত এক মাসে বাস্তবায়িত ও গৃহীত এই কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই জনগণের প্রকৃত কল্যাণ সাধনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈদেশিক ঋণের চাপ সফলভাবে মোকাবিলা করা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক বিভিন্ন ধরনের অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিতকরণ, আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের বৈপ্লবিক উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করাসহ প্রতিটি পদক্ষেপে সরকারের দেশপ্রেম ও জনকল্যাণমুখী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে।’

তিনি বলেন, ‘সাফল্যগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল, স্বাবলম্বী ও মেধাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপান্তরের যে সুদৃঢ় পথযাত্রা, সেটিকে আরো বিকশিত করবে। আসুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই গণমুখী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতাকে আমরা আরো বেগবান করি।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বাংলাদেশকে আমরা নতুনভাবে পুনর্গঠন করছি। যেখানে মাত্র সাত মাসে সব সমস্যার শতভাগ সমাধান হয়তো করে ফেলা কঠিন বা দুরূহ। তবে, বর্তমান নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার- যার ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ, সেখানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা আজ প্রতিটি পদক্ষেপে দৃশ্যমান।’

তিনি বলেন, ‘দল, মত, পথ ও ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক, নিরাপদ ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। যেখানে সরকারের মূল লক্ষ্য ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- সেটিই হবে চলার পথের পাথেয়।’

প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্থাৎ আজকে যদি আমরা তুলনা করি- গত বছরের এই সময়ের সাথে কিংবা গত মাসের এই সময়ের সাথে, তাহলে কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে আমাদের যে ইনফ্লেশন রেট, সেটা কমে এসেছে। আমাদের খাদ্যপণ্য, দ্রব্যমূল্যের যে বৃদ্ধির হার- সেটা কমে এসেছে। এর পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য বছরের তুলনায় বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় যে খাদ্যপণ্য রয়েছে, সেটার জোগান তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো।

জ্বালানি তেলের মূল্য সম্পর্কে মাহদী আমিন বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এবং বিশেষত আশেপাশের যেকোনো দেশের তুলনায় ডিজেল তেলের দাম বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম। অর্থাৎ তেলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, যেন জনগণের ওপর চাপ না পড়ে।’ 

এক মাসে সরকারের সাত পদক্ষেপ তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘গত এক মাসে সরকার যেসব জনকল্যাণ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, আমরা এগুলোকে মোটামুটিভাবে সাতটি ডিফারেন্ট ভাগে বিভক্ত করতে পারি। এগুলো হচ্ছে তারুণ্যের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গণ মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়ন, নারীর অগ্রযাত্রা, সর্বজনীন কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল শিল্পায়ন, আধুনিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সাত প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক।’

মাহদী আমিন বলেন, ‘বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণ ও জীবনমানের উন্নয়নে সরকারি কিছু পদক্ষেপ আমরা গত এক মাসে দেখতে পেয়েছি। এর মাঝে অন্যতম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তিতে সর্বনিম্ন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ এক লাখ ৫৬ হাজার টাকার জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন।’

‘সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীর জন্য সমহারে প্রাতিষ্ঠানিক মোবাইল ভাতার সুবিধা সম্প্রসারণ। অবসরপ্রাপ্ত নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং তাদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানদের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা।’

তিনি বলেন, গত এক মাসে দাফতরিক কাজে গতি আনতে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ ও নবায়নে অর্থবিভাগের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার, ভূমি শাসনে স্বচ্ছতা ফেরাতে কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদে একই কর্মসংস্থলে পদায়ন সম্পূর্ণ বন্ধকরণ, সম্পত্তি দান করার পরেও বাবা-মায়ের আজীবন ভোগ দখল ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুরক্ষা আইন পাস, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের সেরা ১০০ মেধাবী শিক্ষককে এক লাখ টাকা করে বিশেষ জাতীয় অর্থ পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ, সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষায় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে স্থায়ী তহবিলে রূপান্তর, প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার নিরাপত্তায় দেশব্যাপী সিগনেচার প্রজেক্টগুলো যেমন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নিয়মিত সরকারি ভাতার সম্প্রসারণ।

নারীর অগ্রযাত্রাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং তাদের সর্বজনীন কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য গত এক মাসে সরকারের নেয়া পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘সাইবার পরিসরে নারীদের হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সাথে যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতভাগ নারী শিক্ষার্থীদের সার্বজনীন উপবৃত্তি এবং স্কুলে পুষ্টিকর খাবারের স্থায়ী নিশ্চয়তা বিধানের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

মাহদী আমিন বলেন, ‘চা শিল্পে কর্মরত নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ২০ হাজার চা শ্রমিকের মাঝে আধুনিক ঋণ কোট বিতরণ করা হয়েছে।’

গ্যাস সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘গ্যাস সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে মধ্য মেয়াদে দেশজুড়ে ১৫০টি নতুন কূপ খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে আরো ১৫০টি কূপ খননের কার্যক্রম এরপর শুরু হবে। এলএনজি সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান দু’টি এফএসআরইউ-কে পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে কিভাবে পাঁচটিতে উন্নীত করা যায়- সে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং সম্ভব হলে ২০২৮ এর আগেই তৃতীয় এফএসআরইউ চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে এক বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রাপ্তি এবং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

ফ্যাসিবাদী সংগঠনের নেতাদের বিচার প্রসঙ্গে
মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা গত সাত মাসে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অসাধারণ অগ্রগতি দেখেছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের প্রতি সুবিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ফ্যাসিবাদী সংগঠনের গণহত্যাকারীদের সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে গতকাল রায় প্রদান করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজনের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে এ বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করার আদেশ দিয়েছে আদালত।’

তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী ৭৪ জন শহীদ পরিবারের যোগ্য সদস্যের হাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি চাকরির স্থায়ী নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়েছে।’

এই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এ এস এম মাহফুজুর রহমান, উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, মো: সুজাউদ্দৌলা, সহকারি প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক, শাহরিয়ার পামির, আশরোফা ইমদাদ, মিডিয়া সমন্বয়ক তারিকুল ইসলাম, চিকিৎসক আ ন ম মনোয়ারুল কাদির বিটু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র : বাসস