
ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কিছু গোপন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পতিত দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ইতঃমধ্যে লকডাউনের ডাক দিয়েছে। এরপর নানা ইস্যুতে ধাপে ধাপে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধনসহ ছোট ছোট কর্মসূচির ডাক দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পতিত দলটির নেতাকর্মীরা ভূমিকা রাখবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। দলটির একাধিক সূত্র বলছে, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন নাজুক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। সরকারের এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলে একদিকে সুবিধা আদায় করতে চায় আওয়ামী লীগ, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে যেন আওয়ামী লীগ হারিয়ে না যায় সেজন্য আলোচনায় থাকার কার্যকর কিছু কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ আগামী ডিসেম্বর মাসকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক কৌশল ও তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সরকার পতনের পর পতিত দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী ঢাকার অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আত্মগোপন করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন। তারা টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন। পাশাপশি ডিসেম্বরকে টার্গেট করে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।
মূল পরিকল্পনা ও কৌশলসমূহ : নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা : দেশের মাঠপর্যায়ের নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের ফের সংগঠিত ও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
শীর্ষ নেতাদের সাথে যোগাযোগ : বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে নির্দেশনা নেয়া হচ্ছে।
ঝটিকা মিছিল ও উপস্থিতি: নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে এবং দৃশ্যমান হতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংগঠনিক তৎপরতা : দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর ডিসেম্বরকে টার্গেট করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে ইতঃমধ্যে ভারতের দিল্লীতে বসে পতিত দলটি তাদের কার্যনির্বাহী সংসদের একটি বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকটি পতিত আওয়ামী লীগের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সূত্রটির দাবি অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন। তার বক্তব্যে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের বাস্তব পরিস্থিতি জানতে এবং দলের সাংগঠনিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে ক্রমান্বয়ে আওয়ামী লীগের ৮৩টি জেলা শাখার নেতাকর্মী এবং ১৬০টি নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সাথে তিনি মতবিনিময় করেছেন বলে জানান। সভায় আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আইসিটি ট্রাইব্যুনালের দেয়া শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ফাঁসির রায় ও ট্রাইব্যুনাল বাতিল, নিরপরাধ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নামে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দাবিসহ অন্তত ৯টি দাবি তুলে ধরা হয়।
অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি : গোয়েন্দা তথ্য বলছে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আবার শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এ দুটো বিষয়কে সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন উপায়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ব্যবহার করার ছক কষা হচ্ছে। যেটির মূল ভূমিকায় থেকে শেখ হাসিনা তার দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্লাটফর্মে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিচ্ছেন। সূত্র আরো বলছে, দেশে আইনশৃঙ্খলার যে অবনতি দেখা যাচ্ছে সেটি ওই পরিকল্পনারই একটি অংশ।
বিদেশে অবস্থান করা নেতাদের সাথে যোগাযোগ
সূত্রের দেয়া তথ্যমতে, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা বিদেশে থাকা কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্লাটফর্মে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- ওবায়দুল কাদের, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এসএম কামাল হোসেন, নসরুল হামিদ বিপু, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাবু, সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।
এ দিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যার পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে এত দ্রুত দেশে ফিরে আসা এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সহজ হবে না। তাদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা মূলত কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল মাত্র।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ঘোষণা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল। জুলাই আন্দোলনের ক্ষত এখনো এ দেশের যুব সমাজসহ সব শ্রেণী পেশার মানুষের মনে রয়ে গেছে। সেই তাজা রক্তের দাগ না শুকাতেই নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা এতটা সহজ হবে না। তিনি বলেন, গণহত্যা চালানো দলটির কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে সেটা সম্ভব নয়। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের হত্যাযজ্ঞ চালানোসহ অতীতের নানা ইস্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটেছে শেখ হাসিনা যদি কখনো দেশে ফিরে আসেন তাহলে ঠিকই তিনি টের পাবেন।







