
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে সরকারি দলের শর্তারোপকে দরকষাকষি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এটিকে দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে তারা বলছেন, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন জুলাই সনদকে অস্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সংসদীয় রীতির অবক্ষয় ও জবাবদিহিতার সঙ্কটও বাড়ছে।
সূত্র মতে, সংসদের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর ওপর। সংসদের মূল অধিবেশনে সব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা সময়স্বল্পতার কারণে সম্ভব হয় না। এই ঘাটতি পূরণ করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো। মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের ওপর নজরদারি করা, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার যাচাই এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এই কমিটিগুলোর মূল কাজ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বজায় রাখতে এই কমিটিগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে একটি কমিটির কার্যকারিতা নির্ভর করে তার সভাপতির ওপর। সভাপতি যদি সরকারি দলের হন, তবে অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম বা দুর্নীতি আড়াল করার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টা থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের কেউ সভাপতি হলে জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াটি আরো কঠোর ও নিরপেক্ষ হয় বলে মনে করা হয়।
সরকারি দলের রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ না দেয়ার পেছনে বিভিন্ন বাস্তব ও রাজনৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। সরকারি দলের নেতাদের প্রধান যুক্তি হলো, সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সংসদের সব প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে- এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলের হাতে গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতিত্ব থাকলে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বা নীতিনির্ধারণী কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ কমিটির দায়িত্ব দেয়া হলে তা সংসদের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকারি দলের যুক্তি, অতীতে যখন বর্তমান বিরোধী দল জোটের অংশ হিসেবে ক্ষমতায় ছিল, তারাও সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি বা গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়নি। ফলে এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ এবং সংসদকে ‘একদলীয়’ রূপ দেয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিরোধী দলের রাজনীতিবিদরা। তাদের মতে, স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ থেকে বিরোধী দলকে বঞ্চিত করার অর্থ হলো সংসদে সরকারের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে সরকারের কোনো কাজের জবাবদিহিতা থাকে না এবং সংসদ কেবল একটি ‘রাবার স্ট্যাম্প’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়গুলোর দুর্নীতি, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার যেন সামনে না আসে, সে জন্যই সরকার সব কমিটির সভাপতি পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে। এছাড়া জুলাই সনদে থাকা সত্ত্বেও সরকারি দলের এটি অমান্য করাটা জনরায়কে অবজ্ঞা করারও শামিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিরোধী দল থেকে সভাপতি না করায় গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে, সংসদীয় রীতির অবক্ষয় ও জবাবদিহিতার সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। একইসাথে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাদের মতে, সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতার একটি প্রতীকী ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। নিজের দলের প্রতিনিধির পক্ষে সরকারের ভুল বা দুর্নীতি খুঁজে বের করা কঠিন। এখানে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হয়। তাই বিরোধী দলকে সভাপতির পদ না দেয়া সুশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, বিশ্বের উন্নত ও কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলো বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়। যুক্তরাজ্য কমন্সসভার ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’র সভাপতি পদ বাধ্যতামূলকভাবে প্রধান বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যকে দেয়া হয়। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ তদারকি কমিটিগুলোর নেতৃত্ব প্রায়শই বিরোধী দলের হাতে থাকে, যা সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক প্রথার উল্টো পথে হাঁটা সংসদীয় ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল করছে। তারা বলছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে না দেয়ার বিষয়টি কেবল একটি পদের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপক্বতার সূচক। রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর থাকা স্বাভাবিক, তবে সেই জোর যদি ভিন্নমত ও জবাবদিহিতার পথকে রুদ্ধ করে, তবে তা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে ক্ষুণœ করে।
সূত্র মতে, জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল। সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। জুলাই সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যোগ করলে বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী মোট প্রায় ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। জানা গেছে, জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেই ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক কমিটি ১১টি ও মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি ৩৯টি। হিসাব সম্পর্কিত কমিটি ছাড়া অন্য কোনোটিতেই সভাপতি হিসেবে বিরোধী দলকে রাখা হয়নি।
জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার রেওয়াজ নেই। সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে নাম দিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের দাবি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আসনসংখ্যা অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সদস্য ও অন্যান্য পদ বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেয়া হয়নি। তার দাবি, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেয়া নিয়ে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ভিন্ন। একটি কমিটিতে যোগ দেয়ানোর জন্য শর্ত আরোপ করা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
এ নিয়ে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সব অংশীজনের সাথে আলোচনা শেষে সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে। সেটি পাস হলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলোতে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পদ পাবে। তবে এ জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে যোগ দিলে একই সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু এবং আসনের অনুপাতে তাদের সভাপতি পদ দিতে সরকারি দল রাজি বলেও জানান তিনি।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, বিভিন্ন দেশে সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে পদ দেয়া প্রচলিত রীতি। সাধারণত সরকারি দলের সংসদ সদস্য সভাপতি হলে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অনেক বিষয় আলোচনায় আনতে চান না। বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সুযোগ বাড়ে। বিরোধী দল থেকে আনুপাতিক হারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, জুলাই সনদ মূলত রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলে পরিণত হয়েছে। এতে প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটও পড়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা একাধিকবার জুলাই সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদিও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্যে নির্বাচন করা হবে। এ বিষয়েও বিএনপির সম্মতি ছিল। এমনকি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এ প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আরেক চিত্র। আমার মনে হয় সরকার সনদের বিভিন্ন বিষয়কে এখন দরকষাকষির উপাদানে পরিণত করতে চাইছে।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. শরিফুল আলমের মতে, জুলাই সনদ অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেয়ার অঙ্গীকার ছিল। অথচ তৃতীয় অধিবেশনে ব্যাপকভাবে কমিটি গঠিত হলেও বিরোধী দলকে আনুপাতিক সদস্যপদ ও অর্থবহসংখ্যক সভাপতির পদ দেয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি।
জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই সনদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই একমত পোষণ করেছিল। সেটি সবাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথাও বলেছিল। সেটি আবার গণভোটে পাসও হয়েছে। যেহেতু দেশের মালিক জনগণ, সেহেতু সেই জনগণই এই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফলে জুলাই সনদের সব কিছু সবাই মানতে বাধ্য। কিন্তু আমরা বিএনপিকে দেখছি উল্টো পথে হাঁটতে। তারা এখন স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালাতে চাচ্ছে। জুলাই সনদে আছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে আসন অনুপাতে সভাপতির পদ দেয়া হবে। অথচ এখন তারা সেটি মানছে না। নানা শর্ত দিচ্ছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, তারা যদি পুরনো পথে নতুন গন্তব্যে যেতে চায়, সেটি আর সম্ভব হবে না।
সংসদীয় কমিটিতে সভাপতি পদ নিয়ে সরকারি দলের শর্তারোপের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল তাদের নিজেদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জুলাই সনদের সাথে সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ প্রনয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশগ্রহণে কোনোরকম নোট অফ ডিসেন্ট ছাড়া অর্জিত ঐকমত্যের বরখেলাপ করছে। সংসদ ও সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতার মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জনপ্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে সংসদকে তাদের একচ্ছত্র ভূবনে পরিণত করার এমন অবস্থান পরিবর্তন করা উচিত।







