
আমিনুল ইসলাম
রাজধানীর অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। আওয়ামী লীগের মিছিলসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সাথে প্রশাসন বা সরকারদলীয় কেউ জড়িত রয়েছেন কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড প্রশাসনের গোয়েন্দা ব্যর্থতায় নাকি ইচ্ছাকৃত সহযোগিতায় ঘটছে সে ব্যাপারে তদন্ত করতে মাঠে নেমেছে কয়েকটি সংস্থা। ইতোমধ্যে ডিএমপির গুলশান জোনের ডিসি এবং ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসিকে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ করে দেয়ার পেছনে শুধু পুলিশের একটি পক্ষ নয়, সরকারদলীয় কিছু নেতাকর্মীর সহযোগিতাও থাকতে পারে। তাদের ব্যাপারেও তালিকা প্রস্তুত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের বড় ধরনের মিছিলের আগাম তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে কূটনীতিক, বিদেশী নাগরিক ও বিনিয়োগকারীদের চলাচল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকা গুলশানে কিভাবে কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই এত বড় জমায়েত হলো- এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার হাইকোর্টের সামনে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। শুক্রবার পৃথকভাবে মালিবাগ, মহাখালী ও আগারগাঁও এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারদলীয় স্থানীয় নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। আবার অন্যরা বলছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ইন্ধন রয়েছে মিছিলে। জানা গেছে, প্রায় ১৫ দিন আগে থেকে মিছিলের প্রস্তুতি নেয়া হলেও মাত্র ৮ মিনিট আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এটা জানতে পারে পুলিশ; কিন্তু এত স্বল্প সময়ের মধ্যে মিছিল প্রতিহত করতে পারেনি তারা।
আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীর মোবাইলে আসা এসএমএস ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে থেকে এই মিছিলের পরিকল্পনা করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীরা। এরপর বিদেশে থাকা নেতাদের নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকা নেতারা বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন। অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে ঢাকার কিছু বড় রেস্টুরেন্ট ও বারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেতাকর্মী ছাড়াও আওয়ামীপন্থী পুলিশ সদস্যদের অংশগ্রহণের তথ্যও পাওয়া গেছে। কখনো কখনো ওই সব বৈঠকে ভার্চুয়ালি এটেন্ড করেন বিদেশে পলাতক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তারা। এরপরই রাজধানীর প্রতিটি থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএস পাঠানো হয়। একইভাবে মেসেজ পৌঁছে দেয়া হয় বাহিনীর মধ্যে থাকা আওয়ামী ঘরানার পুলিশ সদস্যদের কাছেও। শুধু মেসেজই নয়, তাদের প্রত্যেকের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা। নেতারা কে কতজন লোক আনতে পারবে সে ব্যাপারে কমিটমেন্ট নেয়া হয়। আর পুলিশ সদস্যরা ভেতরে থেকে মিছিলকে সহজভাবে সম্পন্ন করার সবধরনের চেষ্টা করে।
ঘটনার পর ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাজধানীর কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে যাতে মিছিল, জমায়েত বা অন্য কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে জন্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কঠোর সতর্ক করা হয়েছে। কোনো থানা এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত কিংবা অপতৎপরতার বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে কমিশনারকে জানানো হয়েছে, গুলশানের মিছিলটি শুরু হওয়ার মাত্র আট মিনিট আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পুলিশ তথ্য পেয়েছিল। তথ্য পাওয়ার পরপরই গুলশান থানা পুলিশ তৎপর হলেও এত অল্প সময়ে বড় একটি জমায়েত ঠেকাতে পুলিশের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গুলশানে মিছিল হবে- এমন তথ্য আগে পাওয়া যায়নি। সাধারণত এনএসআই ও এসবি থেকে এ ধরনের তথ্য দেয়া হয়। পাশাপাশি সিআইডি, ডিএমপির নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট এবং থানার সিভিল ইউনিটও আগাম তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে ডিজিএফআইও। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনী আগাম ব্যবস্থা নেয়; কিন্তু গুলশানের ঘটনায় মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা মিছিলের কোনো আগাম তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন। পরে মিছিলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গুলশান ও আশপাশের এলাকা থেকে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাধারণত লিখিত ও মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদর দফতরে পাঠানো হয়। দফতরপ্রধানরা তা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানান এবং সে অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু গুলশানের ঘটনার আগে মাঠ থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি। কেন তথ্য পাওয়া গেল না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠকে বিশ্লেষণ চলছে। মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দাদের বক্তব্য, তারা মিছিলের কোনো পূর্বাভাস পাননি। তবে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো, মিছিলের পরিকল্পনা গুলশানের বাইরে করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে গুলশানে জড়ো হয়ে আকস্মিকভাবে মিছিল করে দ্রুত সরে যায়। ফলে মিছিলের আগে গোয়েন্দা নজরদারিতে বিষয়টি ধরা পড়েনি। বাড্ডা, সাঁতারকুল, রামপুরা, খিলগাঁও ও রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার গোয়েন্দারা কেন আগে থেকে কোনো তথ্য পেলেন না- তা নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে।
গুলশানের ঘটনার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু পুলিশের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর না করে ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত কিংবা নাশকতার তথ্য পাওয়া মাত্র মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে অবহিত করে আগাম ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশের সাথে যোগাযোগ জোরদারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ অর্থাৎ কোনো ঘটনা ঘটার পর আসামি গ্রেফতারের বদলে আগাম তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের গতিবিধির ওপর নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যার অংশ হিসেবে রাজধানীর আবাসিক ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতার করলেও রাজনৈতিক নেতাদের তদবির নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়েও ঝটিকা মিছিল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো ধরনের আগাম গোয়েন্দা তথ্য ছাড়াই নিষিদ্ধ সংগঠনের বড় মিছিলের ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনাটি শুধু একটি ঝটিকা মিছিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আগাম তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশের প্রস্তুতির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে।







