
ময়মনসিংহ অফিস
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে রোগী ওঠানামায় লিফটের বিকল্প নেই। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা চলছে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায়।
হাসপাতালের ১৫টি লিফটের মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতরের নথিতে ১২টি সচল ও তিনটি অচল দেখানো হলেও সরেজমিন পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। গত সপ্তাহের মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার এবং চলতি সপ্তাহের শনি ও রোববার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নতুন ভবনের নিচতলায় দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা পাঁচটি লিফটের চারটিই বন্ধ। সচল একটি লিফটের সামনে অপেক্ষমাণ শতাধিক রোগী ও স্বজন।
ট্রলি, হুইলচেয়ার ও অক্সিজেন লাগানো রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে ভোগান্তি ও ঝুঁকি।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লিফট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদারি ব্যবস্থা। ২০০৭ সাল থেকে মমেক হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ। নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতালের ১৫টি লিফট দুই থেকে তিন শিফটে পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রতিটি লিফটে শিফট অনুযায়ী দুই থেকে তিনজন অপারেটর থাকার কথা। গত বছর ৩৫ থেকে ৪০ জন অপারেটরের বেতন নির্ধারণ করে গণপূর্ত অধিদফতর।
জনপ্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হিসাবে শুধু অপারেটরদের বেতন বাবদ বছরে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব দাঁড়ায়।
আগস্টে বিভিন্ন লিফটে একাধিকবার গিয়ে এক থেকে দু’জনের বেশি অপারেটর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের সাথেও কথা বলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অপারেটরের নিয়মিত উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাঈমা এন্টারপ্রাইজের এক অপারেটর বলেন, ‘সরকার থেকে জনপ্রতি ২২ হাজার টাকা বেতন দেয়া হলেও কোম্পানি আমাদের দেয় মাত্র সাত হাজার টাকা। বাকি টাকা কোম্পানি নিয়ে নেয়।’
লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, সামান্য ত্রুটি দেখা দিলেই অনেক লিফটকে দীর্ঘদিনের জন্য অচল রাখা হয়। পরে নতুন মাদারবোর্ড, মোটর কিংবা অন্যান্য যন্ত্রাংশ কেনার নামে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়।
নগরীর টপ লাইন এলিভেটরের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদুল ইসলাম মুকুল অভিযোগ করেন, গণপূর্তের কিছু প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ বছরের পর বছর সরকারি প্রতিষ্ঠানের লিফটের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। দরপত্রে অন্য প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও নানা কৌশলে তাদের বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
তার আরো অভিযোগ, চলতি বছরের ৩১ আগস্ট নাঈমা এন্টারপ্রাইজের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে।
লিফট কেনাকাটাতেও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। টপলাইন লিফটের প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম জানান, গত বছর গণপূর্ত অধিদফতরের একটি লিফট কেনার জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান ৬২ লাখ টাকার দরপত্র দেয়। দরপত্র বাতিল করে তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে একই লিফট নাঈমা এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ৮৪ লাখ টাকায় কেনা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
একই পণ্যের দরপত্রে এত বড় ব্যবধান কেন- এ প্রশ্নের জবাব চান সংশ্লিষ্টরা।
লিফটের নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (এআরডি)। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটকে কাছের ফ্লোরে নিয়ে গিয়ে দরজা খোলার কথা এ ব্যবস্থার। কিন্তু মমেক হাসপাতালের অধিকাংশ লিফটের এআরডি কার্যকর নেই বলে অভিযোগ।
গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নতুন ভবনের একটি লিফটে প্রায় ২৫ জন যাত্রী প্রায় ৩০ মিনিট মাঝপথে আটকে থাকেন। তাদের মধ্যে রোগী ও শিশুও ছিল। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় কয়েকজন শ্বাসকষ্ট ও আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ভুক্তভোগী আসমা বেগম বলেন, তার বাবা চারতলায় ভর্তি। গত এক সপ্তাহে অন্তত তিনবার তিনি লিফটে আটকা পড়েছেন।
রোগীর স্বজন আশরাফুল ইসলাম বলেন, চারটি লিফট ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে বন্ধ।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইব্রাহিম খান সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন বলে তিনি জানেন। পুরো জেলায় লিফটের কাজ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস ও নাঈমা এন্টারপ্রাইজ মিলে একটি চক্র হিসেবে কাজ করছে। জনস্বার্থে দ্রুত এ ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার কার্যালয়ে গেলে তিনি দেখা করতে রাজি হননি। পরে একাধিকবার ফোন করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মালিক ইব্রাহিম খানকে তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। ফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মেহেদী হাসান পলাশ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ময়মনসিংহ অফিসে অপারেটরসহ মোট ২০ জন কর্মী কাজ করেন। সরকারি বাজেট কমে যাওয়ায় অপারেটরের সংখ্যা কমাতে হয়েছে।
সরকারি বরাদ্দের তুলনায় অপারেটরদের কম বেতন দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার তাদের লিফট দেখভালের চুক্তি দিয়েছে। কাকে কত টাকা দিয়ে কাজ করাবেন, সেটি তাদের বিষয়। ইচ্ছাকৃতভাবে লিফট অচল রাখার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
গণপূর্ত অধিদফতরের বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের লিফটের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তার জানা ছিল না। নতুন প্রকৌশলীরা যোগ দেয়ার পর দ্রুত হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: মো: জাকিউল ইসলাম বলেন, লিফটের সমস্যায় প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। লিফট না পেয়ে চিকিৎসক ও নার্সদেরও রোগী বাঁচাতে সাত-আটতলা পর্যন্ত হেঁটে উঠতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার তাগাদা দিলেও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
লিফট সচল রাখার নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ থাকলেও কেন দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ণ লিফটগুলো অচল- এ প্রশ্ন এখন সামনে।
কতজন অপারেটরের নামে কত টাকা উত্তোলন হয়েছে, বাস্তবে কতজন কাজ করছেন, রক্ষণাবেক্ষণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কী কী যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে এবং দরপত্রে কোন প্রতিষ্ঠান কিভাবে কাজ পেয়েছে- এসব তথ্য যাচাই জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, বিল-ভাউচার, অপারেটরদের হাজিরা ও বেতনসংক্রান্ত নথি এবং লিফটের কারিগরি সক্ষমতা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।







