এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারে রাজশাহীর খয়ের শিল্প
রাজশাহীতে খয়ের শিল্পে কর্মরত এক নারী নয়া দিগন্ত

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো 

একসময় রাজশাহীর চারঘাটের পরিচয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল খয়েরশিল্প। চারঘাটে তৈরি খয়েরের চাহিদা ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তথ্যানুযায়ী, একসময় এখানে শতাধিক কারখানা চালু ছিল এবং এ শিল্পের সাথে বহু শ্রমিক ও পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সময়ের সাথে সে চিত্র বদলে গেছে। কাঁচামালের সঙ্কট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের অভাব ও বাজার ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতায় একসময়ের জমজমাট খয়েরশিল্প এখন নানা সঙ্কটে টিকে আছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পরিকল্পিতভাবে কাঁচামাল উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেয়া গেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
চারঘাটে খয়েরশিল্পের বিস্তারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। দেশ বিভাগের আগে থেকেই স্থানীয় কারিগররা খয়ের উৎপাদনের সাথে জড়িত দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে আসা দক্ষ কারিগরদের যুক্ত হওয়ার ফলে এ অঞ্চলে খয়েরশিল্পের আরো প্রসার ঘটে। ষাট ও সত্তরের দশকে শিল্পটি ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। তখন চারঘাটের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য খয়ের কারখানা। উৎপাদিত খয়ের স্থানীয়  বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তা পৌঁছে যেত দূর-দূরান্তের বাজারেও।খয়েরের বিশেষ স্বাদ, রং ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে পান-সুপারির উপাদান হিসেবে এর চাহিদা তৈরি হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চারঘাটের বহু পরিবারের জীবিকা এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল।
খয়ের মূলত খয়েরগাছের কাঠ থেকে তৈরি করা হয়। প্রথমে উপযুক্ত খয়েরগাছের কাঠ সংগ্রহ করে ছোট ছোট টুকরা করা হয়। এরপর কাঠ পানিতে সেদ্ধ বা দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রেখে এর নির্যাস বের করা হয়। সে নির্যাস জ্বাল দিয়ে ধীরে ধীরে ঘন করা হয়। পরে ঘন নির্যাস ঠাণ্ডা করে জমাট বাঁধানো হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে বা শুকিয়ে খয়ের প্রস্তুত করা হয়। উৎপাদন পদ্ধতি, সময় ও তাপমাত্রার ওপর খয়েরের রং, ঘনত্ব ও মান অনেকটাই নির্ভর করে। তবে প্রচলিত এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কারিগর ও উৎপাদনকারীদের ব্যবহৃত পদ্ধতিতে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে।
কিন্তু সময়ের সাথে খয়েরশিল্পে নেমে আসে মন্দা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দেয়া তথ্যমতে, একসময় চারঘাটে শতাধিক খয়ের কারখানা থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে হাতেগোনা কয়েকটি। উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল খয়েরগাছের কাঠ সংগ্রহ এখন আগের তুলনায় কঠিন। একই সাথে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। বিপরীতে বাজারে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
খয়ের ব্যবসায়ী এনামুল হাজী বলেন, এখনো খয়েরের চাহিদা মোটামুটি ভালো। তবে কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন। খয়েরশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাঁচামালের স্থায়ী উৎস তৈরি এবং উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শিল্পটির আরেকটি বড় সমস্যা আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি। এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতিতে খয়ের উৎপাদন করা হয়। এতে উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং সময় ও শ্রম বেশি লাগে। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিংয়ের সুযোগ সীমিত থাকায় নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দক্ষ শ্রমিকের সঙ্কট। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আগ্রহী না হওয়ায় পুরনো কারিগরদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতায় খয়েরশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, খয়েরকে শুধু ঐতিহ্যবাহী পণ্য হিসেবে না দেখে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্প হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পান-সুপারির প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি খয়েরের সম্ভাব্য বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করা গেলে নতুন পণ্য ও বাজারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মানসম্মত উৎপাদন ও আধুনিক প্যাকেজিং নিশ্চিত করা গেলে দেশের বাইরের বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও যাচাই করা যেতে পারে।
গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, খয়েরকে শুধু পান-সুপারির উপাদান হিসেবে দেখলে এর সম্ভাব্য ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। তার মতে, খয়েরের নির্যাস ও উপাদান নিয়ে আরো গবেষণা হলে প্রাকৃতিক রং, ভেষজ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পণ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সাথে খয়েরজাত উপাদানের বহুমুখী ব্যবহার, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সম্ভাবনা যাচাই করে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি করা গেলে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়েরশিল্পকে নতুনভাবে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শিল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারি সহায়তার ওপর জোর দিচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, আর্থিক প্রণোদনা, কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত সহায়তা দেয়া গেলে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া ক্ষুদ্র কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।
একই সাথে কাঁচামালের সঙ্কট কমাতে নির্দিষ্ট এলাকায় খয়ের গাছের বাগান গড়ে তোলা, উদ্যোক্তাদের চারা ও কারিগরি সহায়তা দেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে শিল্পটির ভিত্তি আরো শক্তিশালী হতে পারে। খয়ের উৎপাদনকারী সমবায় সমিতিগুলোকে সক্রিয় করে উৎপাদন ও বিপণনে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলছেন তারা।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে সম্ভাবনা। আধুনিক প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং এবং অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে চারঘাটের খয়েরকে নতুন ক্রেতাদের কাছে পরিচিত করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। 
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে ‘চারঘাট খয়ের’ নামে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে পণ্যের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা করা জরুরি।
চারঘাট খয়েরশিল্প ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন বলেন, চারঘাটের খয়েরশিল্প কেবল একটি পুরনো পেশা নয়; এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, শ্রম ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তার মতে, সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া গেলে চারঘাটের খয়েরশিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
খয়েরশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এক দিকে কাঁচামালের স্থায়ী উৎস তৈরি করতে হবে, অন্য দিকে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে প্রশিক্ষণ, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির ব্যবহার, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
চারঘাট উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা বন বিভাগ ও উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে কৃষি বিভাগ ২২ হাজার ২০০টি খয়ের গাছ রোপণ করেছে। একই সময়ে বন বিভাগ রোপণ করেছে ৩৫ হাজার ৫৫০টি খয়ের গাছ। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার খয়ের গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কয়েক লাখ খয়ের গাছ রোপণ ও বিতরণ করেছে।
এর আগে উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানিয়েছিলেন, গত কয়েক বছর ধরে অন্যান্য চারার তুলনায় খয়েরের চারা বেশি উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে তার কাছে প্রায় দুই হাজার খয়ের চারা রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, খয়ের গাছ ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সে খয়ের তৈরির উপযোগী হয়। আগে রোপণ করা কিছু গাছ ইতোমধ্যে উৎপাদনের পর্যায়ে এসে বাজারে কাঁচামাল সরবরাহ করতে শুরু করেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কাঁচামালের সঙ্কট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।