ট্রেন চলবে বিদ্যুতে খরচ ওড়ে আকাশে!

 হামিদুল ইসলাম সরকার

* কারখানা ব্যয় ছাড়া প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে ৬০.৫১ কোটি টাকা
* ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় সাড়ে ৯২ হাজার ডলার বা ১.১৪ কোটি টাকা
* উজবেকিস্তানে কিলোমিটারে খরচ ৯ লাখ ৫৮ হাজার ডলার বা প্রায় ১২ কোটি টাকা

রেললাইন ঠিকই থাকবে, শুধু জ্বালানির ধরন বদলে যাবে। ডিজেলের বদলে বিদ্যুৎ। এতদিন যে লাইনে ডিজেলচালিত ট্রেন ছুটেছে, এখন সেই লাইনেই বসবে বিদ্যুতের তার। বদলাবে ট্রেন। তৈরি হবে মেরামত কারখানা। সেই পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর রেলপথে খরচ ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। এখানে ৫২.৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি বসানো, ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (প্রতি সেটে পাঁচটি কোচ) কেনা এবং একটি ইএমইউ মেরামত কারখানা তৈরির জন্য এই বিপুল ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ পর্যন্ত। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের লক্ষ্য। ভারতের সাথে তুলনা করলে এটার ব্যয় অনেক বেশি। ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় বাংলাদেশী টাকায় ১.১৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশে হবে ৬০.৫১ কোটি টাকা। তবে মেরামত কারখানার ব্যয় যুক্ত করলে ৭৩ কোটি টাকার বেশি। আর উজবেকিস্তানে কিলোমিটারে খরচ ৯ লাখ ৫৮ হাজার ডলার বা প্রায় ১২ কোটি টাকা।
প্রকল্প নেয়ার প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা:
রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রকল্পের দলিলে বলছে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত রেল করিডোর। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা এবং জয়দেবপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। কিন্তু এই রুটে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। বর্তমান সড়ক ও রেলপথের সক্ষমতা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় হ্রাস পাবে, প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর অঞ্চলটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। 
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিল্প-কারখানা অবস্থিত। এই প্রকল্প এলাকার সড়কে মোটরচালিত যানবাহনের ঘনত্বও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। শিল্প-কারখানা এবং মোটরচালিত যানবাহনের নির্গমনের কারণে এ অঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ এবং অনেক সময় এটি বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে স্থান পায়। এর ফলে এই অঞ্চলের জনগণের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাত থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বায়ুদূষণ কমবে এবং স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে। যেহেতু পরিবেশ দূষণের কারণে এ অঞ্চলের জনগণ বাংলাদেশের মধ্যে সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাই বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটটি নির্বাচন করা হয়েছে।
৫২.৩২ কিলোমিটারে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা :
প্রকল্পের নথির তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর প্রকল্পে ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা বসানো  হবে। এর সাথে থাকবে ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ইএমইউ (প্রতি সেটে পাঁচটি কোচ)। জয়দেবপুর প্রান্তে হবে একটি ইএমইউ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা। প্রকল্পের মোট ব্যয় তিন হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা। বাকি দুই হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা আসবে এডিবি ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রকল্প ঋণ থেকে। 
হিসাব বলছে, ৫২.৩২ কিলোমিটার দিয়ে ভাগ করলে প্রতি কিলোমিটারে খরচ প্রায় ৭৩.০৬ কোটি টাকা, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। কিন্তু এই ৭৩ কোটি টাকা শুধু রেলপথের বৈদ্যুতিক তার বসানোর খরচ নয়। এর মধ্যে ট্রেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামোও রয়েছে। তবে এখানে মেরামত কারখানা নির্মাণে ৬৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বাদ দিলে মোট খরচ হবে তিন হাজার ১৬৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সেই খরচ ধরলে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ৬০ কোাটি ৫১ লাখ টাকা। 
প্রকল্পের কার্যক্রমগুলো কী কী?
প্রকল্প দলিল অনুযায়ী প্রকল্পের তিনটি মূল কার্যক্রম। ৫২.৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা নির্মাণ। ১৬ সেট (প্রতি সেটে ৫টি কোচ) ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ এবং একটি ইএমইউ মেরামত কারখানা নির্মাণ করা। প্রকল্প এলাকা পড়েছে নারায়ণগঞ্জ সদর, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এবং গাজীপুর সদরের মধ্যে। নথিতে বলা হয়েছে, ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং রোলিং স্টকের মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম। বৈদ্যুতিক ট্রেনের গড় গতিবেগও প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। 
ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা ও রেলের তথ্য বলছে, ভারত ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) ১০৮টি সেকশনের ১৩ হাজার ৬৭৫ রুট-কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইনের সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়নের জন্য ১২ হাজার ১৩৪ কোটি ৫০ লাখ রুপি ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন করে, যার প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছিল প্রায় ৮৮.৭ লাখ রুপি। অঙ্কটি বাংলাদেশী টাকায় রূপান্তর করলে প্রায় ১৫ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে খরচ দাঁড়ায় মাত্র প্রায় ১.১৪ কোটি টাকা, বা প্রায় ৯২ হাজার পাঁচ শ’ ডলার। আর ২০১৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সামগ্রিক কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার লাইন বিদ্যুতায়িত হয়েছে ৪৬ হাজার ৪২৫ কোটি রুপি (৫.৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে। সেখানেও প্রতি কিলোমিটারে দেড় লাখ ডলারের কম। তবে এই হিসাব শুধু ক্যাটেনারি ও উপকেন্দ্র বসানোর খরচ- ট্রেন কেনা বা নতুন লাইন তৈরির খরচ এর বাইরে।
আর উজবেকিস্তানের বুখারা-মিশকিন-উরজেন্স-কিভা রেলওয়ে ইলেকট্রিফিকেশন প্রকল্পের আওতায় ৪৬৫ কিলোমিটার রেলপথে বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশনস এবং ট্র্যাকশন পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বসানো হচ্ছে। এডিবি ও এআইআইবি এই প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে। এডিবি ১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং এআইআইবি দিচ্ছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সাথে সরকারের অর্থ মিলিয়ে মোট প্রকল্প ব্যয় ৪৪ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১১.৮ কোটি টাকা।
কোন খাতে কত ব্যয়?
প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, বড় ব্যয়ের মধ্যে ক্যাটেনারি সিস্টেমের জন্য ৭৯৫ কোটি ৬৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ১৬টি সেট বা ৮০টি কোচ কিনতে যাবে এক হাজার ৬৮০ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এখানে প্রতিটি কোচের জন্য যাবে ২১ কোটি টাকার বেশি। ভূমি অধিগ্রহণ করতে যাবে ১১৪ কোটি ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। আর পরামর্শক খাতে দুই হাজার ২২৫ জনের জন্য মাসে ব্যয় হবে ১৫৩ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রতিজনে খরচ হবে ছয় লাখ ৮৮ হাজার টাকা।   
সম্ভাব্যতা যাচাই ও কমিটির সুপারিশ
পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প দলিল বলছে, তুরস্কের প্রতিষ্ঠান টুমাস প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন করেছে। 
প্রকল্পটি সফল হলে ঢাকা-চট্টগ্রামেও হবে-প্রতিমন্ত্রী সাকি
প্রকল্পটির ব্যাপারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, এই ইলেকট্রিক ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। এটি বুলেট ট্রেনের মতো তিন শ’ কিলোমিটার গতিতে না চললেও প্রচলিত ডিজেল ট্রেনের চেয়ে অনেক দ্রুতগতির হবে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও জয়দেবপুরের মধ্যে প্রতিদিন যাতায়াতকারী কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিয়মিত যাত্রীরা এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন এবং তাদের যাতায়াতের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসবে। তিনি জানান, জয়দেবপুর-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর সুযোগ তৈরি হবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে শুধু বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করাই সরকারের মূল লক্ষ্য নয়, বরং এই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতা দেশের ভেতরেই গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে।