পোশাক খাতে এআই শ্রমিকের বিকল্প নয় দতার হাতিয়ার : বিজিএমইএ সভাপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের তৈরী পোশাক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এটি শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তার মতে, পোশাক শিল্পের শ্রমঘন বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। মূল ল্য হবে উৎপাদনশীলতা, দতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সমতা  বাড়ানো। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং দেশের পোশাক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পোশাক খাতে এরই মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে এআই ব্যবহার শুরু হয়েছে। শিপিং ও বাণিজ্যিক নথি তৈরি, বিপণন, মার্চেন্ডাইজিং, ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট এবং উৎপাদন দতা বাড়াতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরো বাড়বে। তিনি বলেন, আমাদের এখন এআই ব্যবহার হচ্ছে শিপিং ডকুমেন্টস তৈরি করতে। এআই ব্যবহার হচ্ছে মার্কেটিংয়ের েেত্র, এআই ব্যবহার হচ্ছে ইফিসিয়েন্সি বাড়ানোর জন্য। এআই ব্যবহার হচ্ছে মার্কেটিং মার্চেন্ডাইজিংয়ের জন্য। এআই ব্যবহার হচ্ছে ডিজাইন ডেভেলপের েেত্র।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের েেত্র এআই ও অটোমেশনকে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, পোশাক খাতে যেসব যন্ত্রনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, তার সব কিছুই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়। অটোমেশন ও এআইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মাহমুদ হাসান খান বলেন, এআইকে আমরা ন্যারো ডাউন করতে চাই না। এখন যেকোনো অটোমেশনকেই বলা হয় এআই। সব অটোমেশন এআই না।
পোশাক উৎপাদনে অটোমেশনের ব্যবহার ইতোমধ্যে বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সোয়েটার উৎপাদনের েেত্র আগে নিটিংয়ের কাজ অনেকটাই ম্যানুয়ালি করতে হতো। এখন একজন শ্রমিক একই সময়ে চার, পাঁচ এমনকি ছয়টি মেশিন পরিচালনা করতে পারছেন। এতে শ্রমিকের কাজের ধরন বদলেছে, কিন্তু শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি শেষ হয়নি। তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারে মূল পরিবর্তন হচ্ছে শ্রমিকের উৎপাদনমতা ও দতায়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিক আগের তুলনায় বেশি উৎপাদন করতে পারছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পণ্যের মান ও সরবরাহের সমতাও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। 
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, এআই ব্যবহার আমরা করতে চাই। অ্যাট দ্য সেম টাইম আমাদের যে এটা শ্রমঘন শিল্প, সেটাও থাকবে। মূল বিষয় হবে যে আমরা ইফিসিয়েন্ট হব। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পোশাকের বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন কঠিন হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোও উৎপাদন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়, সময় এবং পণ্যের মানÑ তিন েেত্রই দতা বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। 
এআই ব্যবহারের ফলে পোশাক শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, শিল্পে কর্মসংস্থানের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এআই ব্যবহার করতে চাই। অ্যাট দ্য সেম টাইম আমরা চাই, এখানে যে শ্রমিক-কর্মকর্তা আমরা নিয়োগ করি, সেটা যেন একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে, যেন হঠাৎ করে কমে না যায়।’ 
পোশাক খাতে এআইয়ের ব্যবহার শুধু কারখানার উৎপাদন পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও জানান তিনি। প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাজেও এর ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ও শিপিং ডকুমেন্ট তৈরির েেত্র এআইনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি। এআই ব্যবহারের ফলে পোশাক রফতানিকারকদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমতে পারে। 
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আগে বিদেশি ক্রেতার কাছে পোশাকের নমুনা পাঠাতে হতো। ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ক্রেতার কাছে ওই নমুনা পৌঁছাতে সময় লাগত এবং কুরিয়ার ব্যয়ও হতো। এখন ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থার কারণে সেই প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, আগে আমরা ফিজিক্যাল স্যাম্পল দিতাম বায়ারের কাছে। ফিজিক্যাল স্যাম্পল পাঠাতাম, সেটার কুরিয়ারের খরচ হতো। বায়ার ইউরোপে বসে, আমেরিকায় বসে সেটা দেখত। এতে সময় লাগতো। এখন হচ্ছে ডিজিটাল অ্যাপ্রুভাল। এটাও কিন্তু এআই কাজ করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতকে খাপখাওয়াতে হবে। শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। উৎপাদনশীলতা, দ্রুত নমুনা তৈরি, ডিজাইন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও ক্রেতার সাথে যোগাযোগে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের দতা উন্নয়নও জরুরি। কারণ এআই ও অটোমেশন অনেক কাজের ধরন পরিবর্তন করতে পারে। ফলে প্রচলিত দতার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং তথ্যনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমিকদের মানিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হবে। 
বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যেও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন রয়েছে। তিনি এআই ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক কমানোর পরিবর্তে উৎপাদন দতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন; অর্থাৎ ভবিষ্যতের পোশাক শিল্পে প্রযুক্তি ও শ্রমÑ দুইয়ের সমন্বয়েই উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনার ল্য নেয়া হচ্ছে।