
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচারণার বড় বড় পোস্টার এখনো দেশটির গণপরিবহনের বাসগুলোতে শোভা পাচ্ছে। এসব পোস্টারে নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আকাশে উড়ন্ত যুদ্ধবিমানের ছবি রয়েছে। এতে ইরানে যৌথ হামলার মাধ্যমে দুই নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে এখন আর এসব পোস্টার দুই দেশের জোটের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরছে না।
নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা বিপুলভাবে ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একইসাথে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নির্বাচিত করেছেন, যারা ইরান, গাজা কিংবা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নিতে আগ্রহী।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সৌদি সংবাদমাধ্যম আশরক আল-আওসাত-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরপর দুই দেশের নির্বাচনকে অনেক পর্যবেক্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরাইল আর আগের মতো নিশ্চিতভাবে পাবে না।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়েল স্টার্নহেল বলেন, ‘এটি একটি নতুন যুগ। গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সাথে যুদ্ধ—এই দু’টি ঘটনার সম্মিলিত প্রভাব মূলধারার মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী ব্যক্তিরাই নন, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও এই পরিবর্তন এসেছে।’
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভোটারদের আবার দলে ফেরানোর চারটি উপায় তুলে ধরেন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ‘ইসরাইলের সাথে আমাদের সম্পর্ক’ পরিবর্তনের বিষয়টিও ছিল।
ট্রাম্পও এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি। মঙ্গলবার ভোট গ্রহণ চলার সময়ই তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে নেতানিয়াহুর সাথে তিনি একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে যুক্ত করেন।
ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে কয়েক দফায় ক্ষমতায় রয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে একইসাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান একঘরে হয়ে পড়ার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর হলে তা এড়াতে ইসরাইলের ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কিংবা ট্রাম্পের সামরিক সহায়তা বন্ধের মন্তব্য নিয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক আমিত সেগাল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ইসরাইলের জন্য ‘বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আইজেনকট কি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারবেন?
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোট গঠনের চেষ্টা করছেন বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকট। তিনি নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এক বিবৃতিতে সাবেক এই সামরিক প্রধান বলেন, তিনি ‘উদারনৈতিক মূল্যবোধে’ বিশ্বাস করেন এবং ট্রাম্পের সাথে ‘ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে’ কাজ করতে চান।
আইজেনকটের জোটের ভেতরে বামপন্থীদের প্রধান নেতা ইয়ার গোলানও ইসরাইলের দ্বিদলীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, নেতানিয়াহু এই সম্পর্ক ধ্বংস করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধ্বংসাত্মক ইসরাইলি বয়ান’ প্রচার করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি গর্বের সাথে তুলে ধরেছিলেন। তাদের মধ্যে বারাক ওবামাও রয়েছেন, যিনি এখনো অনেক ডেমোক্র্যাটের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রায় এক দশক আগে ইরান বিষয়ে ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের সাথে জোট বেঁধেছিলেন।
ইয়েল স্টার্নহেল বলেন, ‘নেতানিয়াহু নিশ্চিতভাবেই ডেমোক্র্যাটদের বিরক্ত করেছেন এবং তাদের দূরে সরিয়ে দিতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘তবে আইজেনকট শুধু একজন অপেক্ষাকৃত ভালো মানুষ হলেই নতুন কংগ্রেসের কাছ থেকে নমনীয় আচরণ পাবেন না। এর জন্য তাকে নতুন নীতি গ্রহণ করতে হবে।’
স্টার্নহেলের মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রায় বিনা বাধায় হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আইজেনকট ইসরাইলের সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে পারেন।
তবে এরই মধ্যে ইসরাইলি সমাজ ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গাজা যুদ্ধের শুরুতে দেশটির জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক সমর্থনও ছিল।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে
নতুন মার্কিন কংগ্রেসে আব্দুল এল-সায়েদের মতো প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অন্তর্ভুক্তি ঘটবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে তিনি গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে ইসরাইল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ফিলিস্তিনিদের সাথে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে থাকা ইসরাইলি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক পরিচালক এলি কোয়াজ বলেন, ‘নেতানিয়াহু শুধু রিপাবলিকানদের ওপর নয়, প্রায় ব্যক্তিগতভাবেই ট্রাম্পের ওপর বাজি ধরেছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, সেই বাজিরও একটি মেয়াদ ছিল। একইসাথে প্রথমবারের মতো সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করা যাচ্ছে, সমস্যাটি শুধু ডেমোক্র্যাটদের সাথে নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামগ্রিক সম্পর্কের মধ্যেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক গবেষক এহুদ এলিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া চলার মতো নিজস্ব বড় অস্ত্রশিল্প ইসরাইলের রয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশটি এখনো স্পষ্ট সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।
তবে তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইসরাইলকে তুলনামূলক সস্তা কামানের গোলা কিংবা কম উন্নত বোমার ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি আরো বাড়বে। আর এই বেসামরিক প্রাণহানিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
এহুদ এলিয়াম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ, এমনকি সম্পূর্ণ সহায়তা হারানোর নতুন কৌশলগত বাস্তবতার সাথে ইসরাইল নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। তবে এটি দেশটির জন্য কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়া কিংবা কর বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে হবে।’
এলি কোয়াজ বলেন, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন আইজেনকট এখন বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, তিনি শুধু ‘অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধাবস্থা’ বজায় রাখার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত চুক্তির বিষয়ে আগ্রহী।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক নিয়ে আইজেনকট স্পষ্টতই একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন।
সূত্র : আশরক আল-আওসাত
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








