মধ্যপ্রাচ্য
ফিলিস্তিনিরা কি ইসরাইলের বর্ণবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবে?। সংগৃহীত

ইসরাইলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের ফলাফলকে দেশটিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরব সম্প্রদায় এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ফিলিস্তিনি স্বাগত জানিয়েছে।

Advertisement

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট বা তার প্রতিপক্ষ সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট—কারও পক্ষেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে আরব দলগুলোর জেতা ১৯টি আসন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইজেনকোটসহ মূলধারার ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর আতঙ্ক ছড়ানো এবং চরম বর্ণবাদী বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও এই অর্জন এসেছে।

নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার বড় অংশ জুড়েই সাজিয়েছিলেন আরব রাজনৈতিক দখলের জুজু দেখিয়ে। নির্বাচন ও ভোটের দিনে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, 'আমরা যদি এখনই না জাগি, তবে আমরা দেখব মনসুর আব্বাস এবং আহমেদ তিবির একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।'

অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিতও একই ধরনের বাগাড়ম্বর ব্যবহার করেছিলেন। আরবদের ভোটার উপস্থিতি দেখে শঙ্কিত হয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'আপনি যদি এই দেশকে ইহুদি এবং জায়নবাদী রাখতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই বাইরে গিয়ে ভোট দিতে হবে,' এবং তার সমর্থকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, 'তাদের জিততে দেবেন না।'

নির্বাচনী এই অচলাবস্থা তাকে সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে কি না, সেটি অন্য ব্যাপার। আসল কথা হলো, আইজেনকোট এবং নাফতালি বেনেট ও 'ইসরাইল বেইতেনু'র নেতা আবিগদোর লিবারম্যানসহ তার সম্ভাব্য মিত্ররা শাসক জোটে আরবদের অংশগ্রহণকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একবার কল্পনা করুন তো, কোনো প্রকৃত গণতন্ত্রে এমন ঘটনা ঘটে কি না, যেখানে একটি পুরো রাজনৈতিক সম্প্রদায়কে সরকার থেকে কেবল এ কারণেই বাদ দেওয়া হয় যে তাদের সদস্যরা কৃষ্ণাঙ্গ, আইরিশ বা খ্রিস্টান।

এটাই হলো ইসরাইলের গণতান্ত্রিক সমস্যার মূল বিষয়। নিজেকে গণতান্ত্রিক হিসেবে জাহির করার পাশাপাশি ইসরাইল তার ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, আইনি ও সাংবিধানিক যুদ্ধ চালিয়ে গেছে এবং তাদের অস্তিত্বকেই রাষ্ট্রের ইহুদি চরিত্রের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য করেছে।

ঐতিহাসিক দিক থেকে এটিই ছিল ইসরাইলের ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কের মূল বিষয় : কেন আরব এমন নির্বাচনে অংশ নেবে, যা মূলত ইহুদি আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবং ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিপীড়ন করার জন্য একদম গোড়া থেকে তৈরি করা হয়েছে?

নেসেট বা পার্লামেন্টের কথাই ধরা যাক। এর মূল আইনের ধারা ৭এ অনুযায়ী, ইসরাইলের একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বকে অস্বীকার করলে যেকোনো নির্বাচনী তালিকা এবং প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে।

একবার কল্পনা করুন তো, কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান রাজনীতিবিদদের মার্কিন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকার করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো।

২০১৮ সালে ইসরাইল আরও এক ধাপ এগিয়ে 'জাতি-রাষ্ট্র মৌলিক আইন'  পাশ করে, যেখানে ঘোষণা করা হয় যে ইসরাইলে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল 'একমাত্র ইহুদি জনগণেরই রয়েছে।'

তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, কিছু ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক আন্দোলন এমন এক রাজনৈতিক তামাশায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছে, যাকে তারা প্রহসন বলে মনে করে। এর পরিবর্তে তারা একটি মৌলিকভাবে কারচুপি করা সংসদীয় ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে তাদের সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করাকেই বেছে নিয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হলো ‘আবনা আল-বালাদ’, যারা ইসরাইলি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বৈধতা না দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নেসেট নির্বাচন বয়কট করার পক্ষে ওকালতি করে আসছে।

এই বিতর্কটি অনেকটা বিপ্লবী বর্জনবাদ—যা অবৈধ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণকে অস্বীকার করে—এবং সমাজতান্ত্রিক সংসদীয় অংশগ্রহণের মধ্যকার ঐতিহাসিক মতপার্থক্যকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে যুক্তি দেখানো হয় যে সংসদীয় সম্পৃক্ততা অস্বীকার করাকে যেন কোনো চরম বা পরম নীতিতে পরিণত করা না হয়।

ইসরাইলের সর্বশেষ নির্বাচন এই বিতর্ককে নতুন করে অত্যন্ত জরুরি করে তুলেছে।

স্পষ্ট করে বলতে গেলে, যদিও কিছু আরব দলের শেকড় বামপন্থী ঐতিহ্যেই নিহিত, তবুও তাদের কাউকেই কেবল 'বিপ্লবী' হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।

মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘রাম’ দল ২০২১ সালের জুনে নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার ল্যাপিডের নেতৃত্বে গঠিত জায়নবাদী জোট সরকারের অংশ হয়েছিল। আব্বাস মূলত ইসরাইলের আরব সম্প্রদায়গুলোর পৌর বাজেট, আর্থ-সামাজিক সমতা এবং অপরাধ দমনের স্বার্থে বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে চলেছিলেন।

‘রাম’ এবার আটটি আসন জিতেছে এবং আব্বাস একই জোটের কৌশল অনুসরণ করার ইচ্ছা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।

এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া বেশি প্রয়োজন। প্রত্যেকেই অসাধারণ সব হুমকির মুখে রয়েছেন: গাজায় চলমান গণহত্যা, পশ্চিম তীরে ত্বরান্বিত ভূখণ্ড দখল ও জাতিগত নির্মূল অভিযান, এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ওপর অব্যাহত দমনপীড়ন।

নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী এজেন্ডাকে পরাজিত করতে সক্ষম এমন একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির চারপাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এবং নিজেদের দলীয় স্বার্থকে দূরে সরিয়ে রেখে, আরব রাজনীতিবিদরা এমন কিছু অর্জন করতে পারেন যা তাদের পূর্ববর্তী পার্লামেন্টারি প্রচেষ্টাগুলো অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল : সেটি হলো ইসরাইলকে তার দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য করা, এর মৃত্যুর যন্ত্রকে শ্লথ করা এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা।

যদিও কেউ নীতিগতভাবে জোর দিয়ে বলতে পারেন যে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া মানে সেই ব্যবস্থাকেই বৈধতা দেওয়া, তবে ইতিহাস মাঝে মাঝে এমন বিপজ্জনক মুহূর্ত হাজির করে যখন এমন নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য অবস্থানগুলোকেও—যত ক্ষণিকের জন্যই হোক না কেন—পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

এখন পছন্দটি পবিত্রতা বনাম বিশ্বাসঘাতকতার নয়, বরং স্থবিরতা (যা নেতানিয়াহুর যুদ্ধগুলোকে বিনা বাধায় চলতে দেয়) বনাম কৌশলগত ব্যাঘাত সৃষ্টির মধ্যবর্তী এক সিদ্ধান্ত।

অবশ্য নির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য একদম স্পষ্ট থাকতে হবে।

এই ধরনের পরিবর্তন যা অফার করতে পারে তা হলো এমন একটি জোটে বিঘ্ন ঘটানো, যার মাধ্যমে নেতানিয়াহু, বেন-গভির এবং স্মোটরিচ গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল এবং ভূখণ্ড দখলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছেন, এবং এটি বর্তমান মাত্রায় সহিংসতা চালানোর ইসরাইলের ক্ষমতাকে সম্ভবত মন্থর করতে পারে।

অন্যদিকে, প্রকৃত পরিবর্তন কেবল তখনই অর্জিত হতে পারে যখন থাকবে সর্বাত্মক ফিলিস্তিনি ঐক্য ও প্রতিরোধ, টেকসই বৈশ্বিক সংহতি, আইনি জবাবদিহিতা এবং অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর