ইরানের হামলা, মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন ঘাঁটি, ক্ষতি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, নতুন যুদ্ধ শুরু,  ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা,
ইরানি আরাশ ক্ষেপণাস্ত্র ছুটছে মার্কিন ঘাঁটির দিকে। সংগৃহীত

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় হাজার কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুরুতে মার্কিন ঘাঁটির আগাম সতর্কবার্তা শনাক্ত করার রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল ইরান। পরে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয় যুদ্ধবিমান রাখার হ্যাঙ্গার, গুদাম, সেনাদের আবাসন ও অন্যান্য স্থাপনা।

Advertisement

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ৩০ অক্টোবর এ খবর জানায়। সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তারা জানায়, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছবি যাচাই করে এবং হামলার বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন চারজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তৈরি করেছে এপি। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগস্ট পর্যন্ত ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর দাবি করা ১১৫টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনার ভবন ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে।

এপির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান প্রথমে মার্কিন ঘাঁটির বিমান রাখার হ্যাঙ্গার ও আগাম হামলা শনাক্ত করার রাডারব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে। পরে গুদাম, সেনাদের থাকার জায়গা ও ঘাঁটির কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির সুরক্ষা ও কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তাকারী ব্যবস্থাগুলো দুর্বল করে দেয়াই ছিল এসব হামলার উদ্দেশ্য।

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এপিকে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অনেক সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং ঘাঁটির কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার কথা বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে তেহরানও বড় ধরনের পাল্টা জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আরো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। যুদ্ধ শেষে ওয়াশিংটন এসব ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ এবং হারানো সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন করবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এপির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের আগের মূল্যায়নের তুলনায় এই অনুসন্ধানে ক্ষয়ক্ষতির আরো বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে।

যুদ্ধের ফলে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব সামান্য তথ্যই প্রকাশ করেছে। স্যাটেলাইটের ছবি প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় স্বাধীনভাবে ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সামরিক অভিযানের নিরাপত্তার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত। তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলো যথেষ্ট সুরক্ষিত এবং সামরিক বাহিনী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের ঐতিহাসিক সাফল্য ধরে রাখতে সেন্ট্রাল কমান্ডের সেনাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই দেয়া হয়েছে।’

সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার কুয়েত

স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এপি দেখেছে, ইরানের অধিকাংশ হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলো। এ ছাড়া বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে।

যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটে কুয়েতে। ১ মার্চ শুয়াইবা বন্দরে ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন।

কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অন্তত ৩০ বার হামলা হয়েছে। এতে ১৫টি বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, কয়েকটি গুদাম এবং আবাসিক এলাকার কাছের ১০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

একই দেশের ক্যাম্প বুয়েরিংয়েও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘাঁটির অধিকাংশ হ্যাঙ্গার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। মার্চে সেনাদের ব্যায়ামাগার ধ্বংস হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেনাদের জন্য একটি দোকানেও হামলা চালানো হয়। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা এপিকে জানান, পৃথক আরেকটি হামলায় গাড়ির গ্যারেজ ও খাবার ঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংবেদনশীল সামরিক তথ্য প্রকাশের কারণে ওই চার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের র‍্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক রাফায়েল কোহেন বলেন, ইরানের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক অনেক বেশি হলেও মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় স্বল্পমূল্যের ড্রোন দিয়ে বড় ধরনের হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে সামরিক বাহিনীগুলো।

কোহেনের ভাষায়, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঘুম ভাঙানোর সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।’

শুরুতেই রাডারব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান পাল্টা হামলা শুরু করেছিল মার্কিন ঘাঁটির আগাম সতর্কবার্তা শনাক্ত করার ব্যবস্থাগুলো লক্ষ্য করে। পরে ঘাঁটির কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ও সরঞ্জামেও হামলা চালায়।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনের মধ্যেই কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও বাহরাইনের নৌবাহিনীর সহায়তা কেন্দ্রে মার্কিন রাডারব্যবস্থার সুরক্ষিত কাঠামো ধ্বংস করে ইরান। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা বহনযোগ্য রাডারেও হামলা চালানো হয়।

আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের পরিচালক এন আর জেনজেন-জোনস বলেন, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এমন গুরুত্বপূর্ণ আগাম সতর্কবার্তা রাডারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল ইরান। এসব রাডার প্রতিস্থাপন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে একটি রাডার পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশ্বজুড়ে থাকা এ ধরনের মাত্র ১৩টি ব্যবস্থার একটি ছিল এটি। প্রতিটির দাম প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

কাতারে থাকা আরেকটি রাডারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০১৩ সালে ১১০ কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় কেনা এই রাডারটি ওই অঞ্চলে এ ধরনের একমাত্র ব্যবস্থা বলে মনে করা হয়।

জেনজেন-জোনসের মতে, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরবর্তী হামলার জবাব দেয়ার সক্ষমতা ব্যাহত ও দুর্বল করে দেয়া।’

রাডারগুলোতে হামলার পর যুদ্ধের প্রথম মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা ১৮টি স্থানে ৫০টির বেশি সফল হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় অগ্রাধিকার পায় বিমানঘাঁটিগুলো। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানির গুদাম এবং সেনাদের আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলায় বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমানের পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের একটি সিআইএ ইউনিটেও হামলা হয়।

সৌদি বিমানঘাঁটিটি সম্প্রতি পরিদর্শন করা এক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম, ধ্বংসাবশেষ এবং বোমায় বিধ্বস্ত সেনাদের ব্যারাক ও খাবার ঘরের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, নজরদারি বিমানে হামলার সময় আরো কয়েকটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে দুটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও ছিল।

অক্টোবরে হালনাগাদ করা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটিও যুদ্ধের শুরুর দিকে বারবার হামলার শিকার হয়। এক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা জানান, সেখানে বিমানের হ্যাঙ্গার, অন্যান্য স্থাপনা, আগাম সতর্কবার্তা রাডার এবং নজরদারি ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্যাটেলাইটের ছবি প্রকাশে বাধা

এপির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ বড় কয়েকটি স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুরোধে ছবি প্রকাশ আটকে দেয় বা বিলম্ব করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে এয়ারবাসের মালিকানাধীন ওয়ানঅ্যাটলাস থেকে ছবি পাওয়া শুরু হওয়ার আগে স্বাধীনভাবে ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চমানের স্যাটেলাইট ছবি আগস্টের শেষ দিকের আগে পাওয়া যায়নি। মার্চের শুরুর দিকে ছবি প্রকাশ বন্ধ হওয়ার পর আগস্টে আবার ছবি পাওয়া পর্যন্ত ঘাঁটির ৩০টির বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। এপি মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুলাইয়ে ওই ঘাঁটিতে বারবার হামলার প্রমাণ পেয়েছে।

যুদ্ধের অবসানের কোনো স্পষ্ট পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে আবারো সংঘাত শুরু হলে সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়তে পারে।

র‍্যান্ডের কর্মকর্তা রাফায়েল কোহেনের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন হামলার মুখে সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জাম ক্রমেই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমাদের যে যুদ্ধপরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, এটি তারই নমুনা।’

তাঁর ভাষায়, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের সময় আমরা যেভাবে স্থায়ী অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে পারতাম, সেই দিন শেষ হয়ে গেছে।’