
গাজায় ইসরাইলের নির্ধারিত তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ ক্রমেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আরো ভেতরে এগিয়ে আসছে। এতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছে। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে একের পর এক স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এমনই একজন মাহমুদ হারজিন। ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণের সীমানা চিহ্নিত করা হলুদ কংক্রিটের ব্লক থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে তাঁবু খাটাচ্ছিলেন তিনি। এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো পরিবার নিয়ে স্থান পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী এই ফিলিস্তিনি।
সীমানা যতবার সামনে এগিয়েছে, ততবারই পরিবারকে বিপদ থেকে দূরে রাখতে তাকে জিনিসপত্র গুছিয়ে পেছনে সরে যেতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারের এই স্থানান্তর তাকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
আল-জাজিরাকে হারজিন বলেন, ‘যখনই তারা একটু এগিয়ে আসে, আমরা একটু পেছনে সরে যাই।’
২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজাকে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভাগ করে ‘হলুদ রেখা’ নির্ধারণ করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরাইলি বাহিনী পেছনে সরে গেলেও তারা গাজার আরো ভেতরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সীমানা চিহ্নিত করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এক বছর আগে সম্মত হওয়া ব্যবস্থায় এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ।
গত ১১ অক্টোবর পূর্ব গাজা সিটির শুজায়েয়া এলাকায় হলুদ কংক্রিটের ব্লকগুলো কয়েক ডজন মিটার পশ্চিমে সরিয়ে নেয় ইসরাইলি বাহিনী। এতে এলাকাটির আরো অংশ ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নতুন করে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হন ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো। সীমানার এই পরিবর্তনে তাদের বসবাস ও চলাচলের জায়গা আরো সীমিত হয়ে পড়েছে।
দশ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করেন হারজিন। গত এক বছর ধরে পরিবারের জন্য স্থায়ী আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি। কতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, সেসব ঘটনার নির্দিষ্ট তারিখ তার মনে নেই। তবে একের পর এক আশ্রয়স্থলের নাম মনে আছে—জাইতুন, সাহাত আল-শাওয়া ও আল-মুনতাজাহ।
হারজিন বলেন, ‘প্রায় ছয়বার জায়গা বদল করেছি। যখনই সীমানা একটু এগিয়ে এসেছে, আমার মনে হয়েছে সেখানে থাকা বিপজ্জনক। তাই পেছনে সরে গিয়ে অন্য কোথাও কিছুদিন থাকার চেষ্টা করেছি।’
তার সর্বশেষ আশ্রয়স্থলটিও এক রাতের বেশি টেকেনি। তাঁবু খাটিয়ে সেখানে এক রাত ঘুমানোর পরদিন সকালে আবারও জিনিসপত্র গুছিয়ে চলে যেতে হয়। কারণ, ইসরাইলি বাহিনী হলুদ রেখা আরো সামনে সরিয়ে এনেছিল। নতুন অবস্থানটি তার তাঁবুর আরো কাছে চলে আসে।
তিনি বলেন, ‘তাঁবু খাটিয়ে সেখানে এক রাত ঘুমিয়েছিলাম। পরদিন সকালে বিছানাপত্র ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে চলে যাই।’
সীমানার কংক্রিটের ব্লক সরিয়ে নেয়াই তাদের একমাত্র উদ্বেগ নয়। ড্রোন ও হেলিকপ্টারের উপস্থিতি, কামানের গোলাবর্ষণ এবং এলোপাতাড়ি গুলির মধ্যেও তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। আশপাশে আশ্রয় নেয়া মানুষের জন্য গোলার টুকরো বা শ্র্যাপনেলের আঘাতও সার্বক্ষণিক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হারজিনের ভাষ্য, হলুদ রেখা সরানোর রাতগুলো সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের। ওই সময় ট্যাংক, সৈন্যদের চলাচল এবং ভারী গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘যে রাতে তারা প্রতিরক্ষা রেখা সরায়, তখন ট্যাংক ও পদাতিক সৈন্য এগিয়ে আসে, গোলাবর্ষণও চলে। শুধু হলুদ ব্লকটিকে আরো সামনে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এসব ঘটে।’

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত এক বছরে এসব হামলায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান এবং গাজাজুড়ে ব্যাপক অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে অধিকাংশ বাসিন্দাই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিরাপদ এলাকায় তাঁবু খাটানোর মতো জায়গা এখন খুবই সীমিত। অন্যদিকে, বাড়িভাড়া এত বেশি যে হারজিনের মতো পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়।
তাই আবারো স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। হারজিনের আশঙ্কা, হলুদ রেখা আরো সামনে এগিয়ে এলে তাদের আবারো পালাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ওরা সম্ভবত রেখাটি আবারো এগিয়ে আনবে। যতবার আমাদের পালাতে হয়, ততবারই আরো পেছনে সরে যেতে হয়। এভাবে আমাদের চলতেই হচ্ছে।’
রাতে পালানো, সকালে ফিরে আসা
শুজায়েয়ার বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী আসমা আলির জীবনেও হলুদ রেখার অগ্রযাত্রা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তিন সন্তানের এই মা ও তার পরিবারের জন্য বাস্তুচ্যুতি এখন রাতের বেলা পালানো এবং সকালে ফিরে আসার এক অবিরাম চক্র। কোথায় কত দিন থাকতে পারবেন, তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আলির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে তার পরিবার সাত থেকে আটবার স্থান পরিবর্তন করেছে।
গাজা সিটির মধ্যাঞ্চলে কিছুদিন থাকার পর তারা শুজায়েয়ায় ফিরে আসেন। আল-মানতার এলাকায় নতুন করে বসতি গড়ার আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু এক মাসের মাথায় আবারও গোলাবর্ষণ শুরু হয়। নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় পরিবারটিকে আবার স্থান বদলাতে হয়।
প্রথমে একটি স্কুলে আশ্রয় নেন তারা। পরে বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি একটি বাড়িতে ওঠেন। সেখানে এক রাতে তীব্র গোলাবর্ষণের পর ভোরে বাড়িটি ছেড়ে গাজা সিটির কেন্দ্রীয় এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। কিন্তু হলুদ রেখা ক্রমাগত এগিয়ে আসায় পরবর্তী সময়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন আসমা।
তিনি বলেন, ‘প্রতি রাতে আমরা পালিয়ে যেতাম, আবার সকালে ফিরে আসতাম। রাতভর থাকার জায়গা খুঁজতে হতো, তারপর পরদিন সকালে আবার ফিরে যেতে হতো।’
আলির কাছে হলুদ রেখা এগিয়ে আসার রাতগুলো ভয়াবহ। তার কথায়, ‘যে রাতে হলুদ রেখা এগিয়ে আসে, সেই রাতটা খুবই ভীতিকর। রাতের শুরু থেকে ভোর পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়।’
বাসা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরিবারের প্রায় সব সম্পদ হারিয়েছেন আসমা। সোনার গয়না, গৃহস্থালির সামগ্রী থেকে শুরু করে সন্তানদের পোশাক—কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। হারানো জিনিসের মধ্যে ছিল তার প্রতিবন্ধী ছেলের একটি ব্রেস, যা মাত্র দুই দিন ব্যবহার করতে পেরেছিলেন তিনি।
আসমা বলেন, ‘চোখের পলকেই সব শেষ হয়ে গেল।’
এখন পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন তিনি। কিন্তু সামর্থ্যের মধ্যে থাকার মতো জায়গা পাচ্ছেন না। দক্ষিণ গাজার দিকে চলে যাওয়াও সহজ নয়। সেখানে যাতায়াতের জন্য যানবাহন পাওয়া কঠিন, আবার নিরাপদ আশ্রয় মিলবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই।
আসমার চাওয়া খুব বেশি নয়। সন্তানদের নিয়ে এমন একটি জায়গায় থাকতে চান, যেখানে তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন এবং বারবার পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা থাকা। এমন একটি জায়গা, যেখানে সন্তানদের রাখতে পারব, একটু বিশ্রাম নিতে পারব এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারব।’
সূত্র : আল জাজিরা
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








