গাজা, যুদ্ধ, ধ্বংসস্তূপ,  সরানো,  কঠিন চ্যালেঞ্জ,   চাপা পড়ে আছে,  মানুষের জীবন, স্মৃতি,   অবিস্ফোরিত বোমা,
গাজার প্রাণচঞ্চল একটি অঞ্চল এখন ধ্বংসস্তুপ। দ্য গার্ডিয়ান

গাজার ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে যেন সাগর থেকে চামচ দিয়ে পানি সেঁচছেন উদ্ধারকর্মীরা। জাতিসঙ্ঘের প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান এভাবেই তাঁর কাজের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি সড়কের একাংশ পরিষ্কার করতেই তাঁদের পুরো দিন লেগেছে। দিন শেষে চারপাশে ধ্বংসস্তূপের পাহাড় দেখে ক্লান্ত আলিয়ান বলেন, 'আমার মনে হচ্ছে, আমরা চামচ হাতে নিয়ে সাগর খালি করার চেষ্টা করছি।'

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গাজায় প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, এসব সরাতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর লাগতে পারে। ব্যয় হবে কয়েক শ কোটি ডলার। আধুনিক ইতিহাসে এটি হতে পারে ধ্বংসস্তূপ সরানোর অন্যতম বৃহৎ অভিযান।

জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানান, গত ১৮ বছরে বিশ্বের সব যুদ্ধ মিলিয়ে যত ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজায় তার প্রায় ২০ গুণ জমেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। কিন্তু এটি মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র দেড় শতাংশ।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপির কর্মীরা এ পর্যন্ত ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করেছেন। এতে ত্রাণবাহী ট্রাক, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল সহজ হয়েছে। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ গাজায় প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের দাবি, খাদ্য ও ওষুধ ছাড়া অন্য সহায়তা হামাসের কাজে লাগতে পারে।

ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহারে গাজায় পাঁচটি স্থানে পাথর ও কংক্রিট ভাঙার ব্যবস্থা করেছে ইউএনডিপি। পুরোনো সাতটি যন্ত্রের মধ্যে দুটি স্থানীয় প্রকৌশলীরা মেরামত করেছেন। ভাঙা কংক্রিট দিয়ে সড়ক মেরামত, গর্ত ভরাট এবং তাঁবুর নিচু জায়গা উঁচু করা হচ্ছে। তবে যন্ত্রপাতির যান্ত্রিক ত্রুটি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও জ্বালানির সংকট কাজকে কঠিন করে তুলেছে।

 ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে আছে মানুষের জীবন, স্মৃতি ও অবিস্ফোরিত বোমা- ছবি দ্য গার্ডিয়ান

 

ডব্লিউএফপির প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান বলেন, এসব উপকরণের মান স্বাভাবিক নির্মাণসামগ্রীর চেয়ে খারাপ। কাজ করাও কঠিন। কিন্তু বিকল্প নেই। গাজার বাস্তবতাই তাঁদের এমন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর ফলে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তাল আল-হাওয়ায় থাকা ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, সড়ক চওড়া হয়েছে, ইঁদুর ও পোকামাকড় কমেছে, যানবাহন চলাচল সহজ হয়েছে। আগে ধ্বংসস্তূপ শিশুদের জন্যও বিপজ্জনক ছিল।

গাজায় এখনো ২১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। ধ্বংসস্তূপ সরানোর ফলে কিছু কিছু দোকান ও ছোট ব্যবসাও আবার চালু হচ্ছে। সিলিয়ার্স জানান, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রায় ২০ দিনের মধ্যে খুলে যাচ্ছে।

তবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো এর নিচে চাপা পড়া মানুষের দেহাবশেষ ও স্মৃতি। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, এখনো ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষের দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির সাথে কাজ করে এসব দেহাবশেষের অবস্থান শনাক্ত এবং যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় দাফনের উদ্যোগ নিচ্ছে ইউএনডিপি।

এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপে অবিস্ফোরিত বোমা ও অ্যাসবেস্টসের মতো বিপজ্জনক পদার্থ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিও আছে। তাই বাসিন্দাদের ফেরার আগে ভবনের নিরাপত্তা যাচাই জরুরি। সিলিয়ার্স বলেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সেবা প্রবেশে বাধা থাকায় পুনরুদ্ধারের কাজ ধীরগতিতে চলছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।