জাতিসঙ্ঘে-পশ্চিমা-দ্বিমুখী নীতি-মাসউদ পেজেশকিয়ান-ইসরাইল
জাতিসঙ্ঘে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রেসটিভি, হামশাহরি

জাতিসঙ্ঘে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়েও আন্তর্জাতিক কোনো জবাবদিহির মুখে পড়ে না। অথচ ইরানকে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘ইসরাইলে পারমাণবিক বোমা, কিন্তু ইরানে পরিদর্শক! ইসরাইল হত্যা করে, আর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়!’

বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন বলে ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি জানায়।

ভাষণের শুরুতে তুলে ধরেন শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি

তিনি বলেন, শুধু কথার মাধ্যমে আস্থা তৈরি হয় না। এর জন্য দ্বিমুখী নীতি পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে হবে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই অঞ্চলে পারমাণবিক বোমা ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠীর হাতে। অথচ ইরানের ওপর পরিদর্শনের দাবি তোলা হয়!’ বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই অসঙ্গতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ইসরাইল গাজায় ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, অথচ আলোচনার টেবিলে থাকা অবস্থায় ইরানে বোমা হামলা চালানো হয়েছে!’

ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে  যোগ দেয়নি এবং পুরো ইতিহাসে দখলকৃত ভূখণ্ডে একজন আন্তর্জাতিক পরিদর্শককেও প্রবেশ করতে দেয়নি বলে উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান।

‘অথচ তাদের পুরস্কার হিসেবে বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র । ইসরাইলর বিশ্বের যে কোনো রাজধানীতে ইচ্ছা বোমা মারতে পারে, সে  জন্যও ভোগ করছে পূর্ণ দায়মুক্তি।’

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির এই মর্মান্তিক বৈপরীত্য তুলে ধরে পেজেশকিয়ান আবারো বলেন, ‘আমি আবারো বলছি : পারমাণবিক বোমা ইসরাইলে, কিন্তু পরিদর্শক ইরানে! ইসরাইল হত্যা করে, আর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়!’

 ‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার’

পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের নথি হিসেবে বিভিন্ন ছবি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসী নই; আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার।’ ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিভ্রান্ত’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগের সরাসরি জবাব দেন তিনি।

ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত নজিরবিহীন অপরাধগুলোর কথাও জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদকে স্মরণ করিয়ে দেন পেজেশকিয়ান।

তিনি বলেন, ‘আমি এমন এক ইরান থেকে এসেছি, যেখানে আমাদের নেতা কোনো আইনি কারণ ছাড়াই, কোনো প্রমাণ ছাড়াই হত্যার শিকার হয়েছেন।’ ৪০ দিনব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রথম দিন আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি হত্যার প্রসঙ্গেই তিনি এ কথা বলেন।

মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় নিহত স্কুলশিশুদের ছবি দেখিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি এমন এক ইরান থেকে এসেছি, যেখানে একটি স্কুলে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। আপনারা এই শিশুদের দেখতে পাচ্ছেন। তারা এই শিশুদের বোমা মেরে হত্যা করেছে—আমেরিকা ও ইসরাইলের দেয়া অস্ত্র দিয়ে। এই শিশুরা কোনো পাপ করেনি। তারা কোনো অপরাধ করেনি।’

তিনি লামার্দ শহরে হামলার কথাও তুলে ধরেন। সেখানে মার্কিন বাহিনী প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল বলে জানান তিনি।

‘লামার্দ ইরানের একটি ছোট শহর। সেখানে একটি স্পোটর্স হল আছে, যেখানে শিশুরা শরীরচর্চা করত। আমেরিকা সেখানে ক্লাস্টার বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো হাজার হাজার টুকরোয় বিভক্ত হয়। তারা আমাদের বিজ্ঞানী, আমাদের মানুষ, আমাদের নারী এবং নিরপরাধ শিশুদের শহীদ করেছে, যারা কোনো গুনাহ করেনি।’

‘তারা হামলা করেছে, কিন্তু আমরা মাথা নত করিনি’

সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠীর পূর্ণমাত্রার হামলার কথা তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘তারা হামলা করেছে, কিন্তু আমরা তাদের সামনে মাথা নত করিনি। আমরা পাল্টা আঘাত করেছি, কিন্তু বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা করিনি।’

'তারা আমাদের বিজ্ঞানী, আমাদের মানুষ, আমাদের নারী এবং নিরপরাধ শিশুদের শহীদ করেছে, যারা কোনো গুনাহ করেনি'

ইরানের আত্মরক্ষামূলক জবাব এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্বিচার বোমাবর্ষণের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের স্কুল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, সেতু ও অবকাঠামোয় হামলা করেছে। যে ভূখণ্ড থেকে তারা এসেছে এবং যেখান থেকে তারা অস্ত্র-সরঞ্জাম পেয়েছে, সেখান থেকে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এসবই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’

দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনই তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়েহ হত্যার কথাও স্মরণ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী যে সরকার, রাষ্ট্র বা অঞ্চলে ইচ্ছা বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালায় এবং এর জন্য সম্পূর্ণ দায়মুক্তি ভোগ করে।

গাজায় চলমান গণহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ‘চরম ভণ্ডামির’ সমালোচনা করেন তিনি।

‘গাজায় তারা ৮০ হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে এবং আরো কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের হাতে থাকা উপকরণ ব্যবহার করে তারা গণহত্যা চালাচ্ছে। এরপর তারা বলে, অন্যরাই সন্ত্রাসী এবং অস্থিতিশীলতার উৎস।’

‘আমরাই কি অস্থিতিশীলতার উৎস? আমরা, যারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই এবং মাথা নত করতে অস্বীকার করি—আমরাই কি অস্থিতিশীলতার উৎস?’

‘যদি যারা হত্যা, হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ সংঘটন করে তারাই নিরাপত্তা ও শান্তির রক্ষক হয়, অথচ আন্তর্জাতিক আইনের কোনো নিয়মই তারা না মানে, তাহলে এটাই আমাদের মুখোমুখি হওয়া বাস্তবতা।’

 ‘দেশ রক্ষায় কারো অনুমতি চাই না’

ইরান আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়—এমন বক্তব্য দৃঢ়ভাবে নাকচ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, গত ২০০ বছরে ইরান কোনো দেশের ওপর হামলা করেনি এবং সবসময় কেবল আত্মরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে।

‘আমরা আগ্রাসনের জন্য নয়, নিজেদের রক্ষার জন্য শক্তিশালী হতে চাই। বোমা তৈরি, ধ্বংসযজ্ঞ বা সমাজকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য নয়, উন্নয়নের জন্য আমরা জ্বালানি চাই। আমরা নিরাপত্তায় অংশ নিতে চাই।’

সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইরানি জনগণের অসাধারণ প্রতিরোধের কথা তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতে এবং বিদেশি মদদপুষ্ট অনুপ্রবেশকারীদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে বাধা দিতে নাগরিকরা প্রতিরাতে রাস্তায় নেমেছেন।

‘সাত মাস ধরে ইরানের মানুষ দিন-রাত রাস্তায় ছিল। জনগণই আমাদের শক্তি এবং আমরা জনগণের শক্তির সাথে আছি।’

ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট বার্তা দেন।

‘আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলার কোনো জবাব দেয়া হবে না। ইরানের শক্তি আত্মরক্ষার জন্য। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলছি : দেশ রক্ষায় আমরা কারো কাছে অনুমতি চাই না।’

ইরানের কৌশলগত নীতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইরানকে এতটা শক্তিশালী হতে হবে, যাতে তার অস্তিত্ব ও অগ্রগতি হুমকির মুখে না পড়ে; এতটা দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে আধিপত্য বিস্তারে সেই শক্তি ব্যবহার না করে; এবং এতটা দূরদর্শী হতে হবে, যাতে প্রতিবেশীদের অনিরাপত্তার ওপর নিজের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে।’

 ‘পারমাণবিক অস্ত্র নয়, পারমাণবিক জ্ঞান থেকেও বঞ্চিত নয়’

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, পারমাণবিক জ্ঞানকে কয়েকটি দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দেখার ধারণা ইরান মেনে নেয় না।

‘বহু বছর ধরে তারা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সেন্ট্রিফিউজ, সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা ও বোমার ভাষায় কথা বলেছে। কিন্তু আমাদের জনগণের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকারের অংশ।’

‘পারমাণবিক শক্তি মানে আমাদের রোগীদের চিকিৎসা, কৃষিতে খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্পে প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের টেকসই বিদ্যুৎ।’

‘ইরান মেনে নেয় না যে পারমাণবিক জ্ঞান কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার হবে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্রকে নিরাপত্তার উপাদান মনে করে না। তবে বিজ্ঞান, শিল্প ও শান্তিপূর্ণ জ্বালানির অধিকারও ছাড়বে না।’

‘আমরা স্পষ্ট করে বলছি : পারমাণবিক অস্ত্র নয়, আবার পারমাণবিক জ্ঞান থেকেও বঞ্চিত হওয়া নয়।’

ইরানের পারমাণবিক সমস্যা যুদ্ধক্ষেত্রে সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন পেজেশকিয়ান।

‘সমাধান হলো এমন একটি চুক্তি, যা ইরানের কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র সম্পর্কে বিশ্বকে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেবে এবং ইরানি জনগণকে নিশ্চয়তা দেবে যে তাদের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।’

 ‘হরমুজ প্রণালীকে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না’

হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে পশ্চিমাদের দাবির মৌলিক অসঙ্গতির কথা বলেন পেজেশকিয়ান।

‘হরমুজ প্রণালীর নৌপথে আমরা এমন একটি নৌপথের ঐতিহাসিক রক্ষক হতে পারি না, যার সুবিধা সবাই নেয়, অথচ নিজেদের পানিসীমাতেই নৌচলাচলের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত থাকব।’

‘তারা আমাদের জন্য পথ বন্ধ করে দেয়, এরপর একই নৌপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশের ধ্বংসের জন্য অস্ত্র, বিস্ফোরক, ক্ষেপণাস্ত্র ও জ্বালানি পরিবহন করে। এটা সম্ভব নয়। তারা এটা করতে পারে না এবং আমরা আমাদের দেশে এমন কিছু ঘটতে দেব না।’

পেজেশকিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তাহীনতা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের সরাসরি ফল।

‘শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি এবং যুদ্ধের বিস্তার নিরাপত্তা বয়ে আনে না। উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।’

 ‘ফিলিস্তিনে ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি নেই’

ভাষণের বড় একটি অংশ ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে ব্যয় করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের প্রতি ন্যায়বিচার ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

‘ফিলিস্তিনকে উপেক্ষা করে আমরা শান্তির কথা বলতে পারি না। ফিলিস্তিনের প্রতি ন্যায়বিচার ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে যত দিন দখলদারিত্ব, আগ্রাসন ও অবিচার থাকবে, তত দিন প্রতিরোধ চলবে। এর একটি রূপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য কোনো রূপে তা আবারো দেখা দেবে, হয়তো আরো শক্তিশালী হয়ে।’

গাজার মানুষের অদম্য মনোবলের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজা মানুষের বিশ্বাসের শক্তি দেখিয়েছে—বোমা ও অবরোধ দিয়ে প্রতিরোধকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না।’

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এটাই মানবতার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। আপনি কোনো মানুষকে তার ভূমি থেকে উচ্ছেদ করলে সে প্রতিরোধ করবে। কারো বাড়িতে বোমা ফেললে সে প্রতিরোধ করবে।’

‘তারা প্রতিরোধ না করলে কী করবে? নিপীড়ন মেনে নেবে? ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া মেনে নিয়ে এই আগ্রাসনের সামনে নীরবে বসে থাকবে? আর তারা আত্মরক্ষা করতে চাইলে তাদের সন্ত্রাসী বলা হবে? আমরা যে বিশ্বে বাস করছি, সেখানে এটাই নতুন ভাষ্য হয়ে উঠেছে।’

পেজেশকিয়ান বলেন, পশ্চিম এশিয়ার সমস্যাগুলো দূরবর্তী শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া আঞ্চলিকভাবেই সমাধান করা সম্ভব এবং তা করতেই হবে।

‘এটা স্পষ্ট যে দূরবর্তী শক্তিগুলোর যুদ্ধের অজুহাত হওয়ার আগে আমাদের অঞ্চলের সমস্যাগুলো অঞ্চলেই এবং অঞ্চলের দেশগুলোর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।’

তিনি আরো বলেন, ‘কৌশলগত স্বাধীনতার অর্থ হলো কোনো বিদেশি শক্তির সাথে সম্পর্ক যেন প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্ভাবনায় পরিণত না হয়।’ আঞ্চলিক সম্পর্ককে আগ্রাসনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়—এমন যেকোনো কাঠামো তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

‘ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না’

ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িতদের উদ্দেশে সরাসরি বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান।

‘আমাদের জাতি তাদের সামরিক শক্তি এবং তাদের ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের পরিণতি খুব কাছ থেকে দেখেছে। তারা ইরানের সহনশীলতা পরীক্ষা করেছে। এখন তারা ভালোভাবেই জানে, যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না।’

‘ইরান কখনো কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে সবসময় তার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।’

‘যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি, আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধকে আমরা ভয় পাই না; শান্তির জন্য আলোচনাও এড়িয়ে যাই না। আর প্রিয় ইরানকে রক্ষায় শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়ে থাকব।’

 নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য নিরপরাধ মানুষ

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞা ইচ্ছাকৃতভাবে দরিদ্র ও নিরপরাধ মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর অশুভ লক্ষ্য পূরণে সাধারণ মানুষকে বলি দেয়া হয়।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, তাহলে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী—উভয়কেই একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। মানবাধিকারকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার বানানো যাবে না।’

‘ইরান বিশেষ কোনো সুবিধা চায় না; তারা সমান অধিকার দাবি করে এবং নিজেদের দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত।’

বিশ্ব নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক করে পেজেশকিয়ান বলেন, যে বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষা বোঝে, সেখানে কখনো টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

তিনি বলেন, ‘দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও টেকসই নিরাপত্তা তৈরি করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন যদি কেবল শক্তিশালীদের স্বার্থের সাথে মিলে গেলেই প্রয়োগ করা হয়, তাহলে আরো বেশি দেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের একমাত্র ভরসা হতে হবে নিজেদের শক্তি। আমাদের সবার জন্য আরো অনেক বিপজ্জনক এক বিশ্বের সূচনা হবে সেখান থেকে।’

একুশ শতককে জবরদস্তি ও স্বৈরাচারের যুগে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এমন একটি বিশ্বকে প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে সামরিক শক্তি বৈধতার জায়গা নেয়, নিষেধাজ্ঞা কূটনীতিকে প্রতিস্থাপন করে, হত্যাকাণ্ড রাজনীতির জায়গা নেয় এবং যুদ্ধ সংলাপকে সরিয়ে দেয়।

 যৌথ নিরাপত্তা ও নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা

চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি বিশ্বশান্তির প্রতি তেহরানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন পেজেশকিয়ান।

তিনি বলেন, ‘ইরান তার শক্তি ধরে রাখে। আমরা বিশ্বকে আরেকটি যুদ্ধের দিকে নয়, শান্তি ও ন্যায়বিচারের দিকে আহ্বান জানাই—দুর্বলতার কারণে নয়, নিজেদের শক্তির ওপর আস্থা থেকে এবং এই উপলব্ধি থেকে যে এই অঞ্চলে কেউ একা নিরাপদ থাকতে পারবে না।’

‘হয় আমরা একসাথে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, নয়তো একসাথেই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকব।’

সব দেশের জন্য নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাকে অবিচ্ছেদ্য এবং অভিন্ন অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এমন একটি ভবিষ্যৎ বিশ্বের রূপরেখা তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান।

ভাষণের শেষে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নামে পরিচিত হওয়ার যোগ্য একটি ব্যবস্থা অবশ্যই জাতিগুলোর সমতা, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা এবং মানবতার অভিন্ন ইচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ যে শান্তি সবার জন্য নয়, তা শান্তি নয়। আর যে ন্যায়বিচার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে না, তা ন্যায়বিচার নয়।’