ক্রিস্টা পাইক, প্রাণঘাতী ওষুধ, হত্যা, ব্যর্থ,  হওয়ার টেনেসি, কারা বিভাগ, প্রধান, ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডা, আইনজীবীদ, অঙ্গরাজ্যে, মৃত্যুদণ্ড,গুরুতর সমস্যা
টেনেসির কারা বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডা। সংগৃহীত

ক্রিস্টা পাইককে প্রাণঘাতী ওষুধ দিয়ে হত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর টেনেসির কারা বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবীদের দাবি, ২০২২ সালের পর দুই অঙ্গরাজ্যে তার তত্ত্বাবধানে পাঁচটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে গুরুতর সমস্যা হয়েছে। এর মধ্যে টেনেসিতে পাইকের ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার রাতে। মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ এটিকে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ‘ব্যর্থ’ মৃত্যুদণ্ড বলেও উল্লেখ করেছেন।

Advertisement

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান শনিবার (৩ অক্টোবর) জানায়, ৫০ বছর বয়সী পাইককে প্রথমে পেন্টোবারবিটাল নামে একটি ঘুমের ওষুধ দেয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পরও তাকে হাঁসফাঁস করতে ও ছটফট করতে শোনা যায়। দ্বিতীয় দফায় ওষুধ দেয়ার পরও তার মৃত্যু হয়নি। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রাণঘাতী ওষুধ দেয়ার পর বেঁচে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে পাইকই প্রথম।

ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পাইকের আইনজীবীরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘নিষ্ঠুর ও যন্ত্রণাদায়ক’ বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

টেনেসির রিপাবলিকান গভর্নর বিল লি বছরের শেষ পর্যন্ত অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। পাশাপাশি স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলেছেন। তবে স্ট্রাডার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লি বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানি, কারা বিভাগ নির্ধারিত নিয়ম মেনেই কাজ করেছে।’

স্ট্রাডার অতীত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের মে মাসে টেনেসিতে টনি কারাদার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কর্মকর্তারা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তার শিরা খুঁজে পাননি। শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি বন্ধ করতে হয়। এর আগে ২০২২ সালে অ্যারিজোনায় স্ট্রাডা কারা বিভাগের উপপরিচালক থাকাকালে তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা সেগুলোকে দীর্ঘায়িত ও ‘ব্যর্থ’ বলে বর্ণনা করেন।

ক্রিস্টা পাইক

 

আইনজীবীরা বলছেন, পাঁচ ঘটনার মধ্যে মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বন্দীদের দীর্ঘ সময় কষ্ট পেতে হয়েছে। শিরায় প্রাণঘাতী ওষুধ দেয়ার পদ্ধতিতেও ছিল নানা সমস্যা। তাদের বক্তব্য, অ্যারিজোনায় স্ট্রাডার দায়িত্ব পালনের সময়কার এসব ঘটনা জানা থাকার পরও লির তাকে টেনেসির কারা বিভাগের প্রধান করে  উচিত কাজ করেননি।

অ্যারিজোনায় তিন মৃত্যুদণ্ড

২০২০ সালে অ্যারিজোনার কারা বিভাগে যোগ দেয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দল গঠন, তাদের কাজ তদারক এবং প্রাণঘাতী ওষুধ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন স্ট্রাডা। এক জবানবন্দিতে তিনি এসব দায়িত্বের কথা স্বীকার করেন।

২০২২ সালের মে মাসে ক্ল্যারেন্স ডিক্সনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় তার শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ দেয়ার জন্য শিরায় ইনজেকশন দিতে গিয়ে কর্মকর্তারা সমস্যায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত কুঁচকির কাছে কেটে সেখানে  আইভি ইনজেকশন ঢোকাতে হয়। ডিক্সনের আইনজীবীদের মতে, এতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগে।

ওই বছরের জুনে ফ্র্যাঙ্ক অ্যাটউডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময়ও কর্মকর্তারা বারবার তার শিরা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ৬৬ বছর বয়সী অ্যাটউড নিজেই কর্মকর্তাদের আইভি ইনজেকশন দেয়ার জন্য শিরা খুঁজে পেতে সাহায্য করেন। নভেম্বরে মারে হুপারের ক্ষেত্রেও শিরা খুঁজে না পেয়ে কুঁচকির কাছে কেটে সেখানে আইভি লাইন বসাতে হয়।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গবেষণা করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার অ্যারিজোনার তিনটি ঘটনাকেই ‘ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নিয়ম ভেঙে গেলে, অথবা অপ্রত্যাশিত সমস্যা ও বিলম্বের কারণে বন্দীকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট পেতে হলে সেটিকে ‘ব্যর্থ’ মৃত্যুদণ্ড বলা হয়।

স্ট্রাডার সময়ে অ্যারিজোনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের পক্ষে থাকা আইনজীবী ডেল বাইখ বলেন, শিরা খুঁজে পেতে কর্মকর্তাদের বারবার ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে তারা এ কাজের জন্য যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল না।

২০২৩ সালে অ্যারিজোনার কারা বিভাগের পরিচালক জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পর্যালোচনা করে তিনি ‘বেশ কয়েকটি গুরুতর সমস্যা’ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব, আইভি লাইন বসানোর দলের কাজ এবং প্রাণঘাতী ওষুধ কতটা কার্যকর, এসব বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

টেনেসিতেও পুরোনো সমস্যা

এসব ঘটনার পরও ২০২৩ সালের শুরুতে লি স্ট্রাডাকে টেনেসির কারাগারের প্রধান করেন। অথচ তার নিয়োগের আগে ২০২২ সালে টেনেসি সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত এক স্বাধীন তদন্তে অঙ্গরাজ্যের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থায় বেশ কিছু সমস্যা ধরা পড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের সময় নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়নি। ব্যবহৃত ওষুধও ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়নি।

মৃত্যুদণ্ড এখানেই কার্যকর করা হয়

 

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ‘ফল পাওয়ার দিকে অতিরিক্ত মনোযোগী’। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তার চেয়ে শেষ পর্যন্ত বন্দীর মৃত্যু নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের আইনজীবী কিট থমাস বলেন, স্ট্রাডা দায়িত্ব নেয়ার পর ওই সমস্যাগুলো দূর করার বদলে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেয়া হয়। আগে প্রশিক্ষণের সময় নুনপানি ব্যবহার করে আইভি ইনজেকশন দেয়ার অনুশীলন করা হতো। স্ট্রাডার সময়ে চালু হলো নতুন নিয়ম। এই নিয়মে বলা হয়, ‘বন্দীর ভূমিকায় থাকা ব্যক্তির শরীরে কোনো  আইভি ইনজেকশন দেয়া হবে না।’

থমাস বলেন, ‘তিনি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কমিয়েছেন, আর আমরা তার ভয়াবহ ফল দেখেছি।’

২০২৫ সালের এক জবানবন্দিতে স্ট্রাডাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তার কাছে সফল মৃত্যুদণ্ড বলতে কী বোঝায়। তিনি বলেন, ‘দণ্ডিত ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে।’ আইনজীবী আবার জানতে চান, ‘আর কিছু?’ স্ট্রাডা বলেন, ‘না।’

থমাস বলেন, স্ট্রাডার এই বক্তব্য থেকে মনে হয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির কী অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার মতে, ২০২২ সালের টেনেসি তদন্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে যে ‘ফল পাওয়ার দিকে অতিরিক্ত মনোযোগের’ কথা বলা হয়েছিল, স্ট্রাডার বক্তব্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়।

এদিকে, পাইকের ঘটনায় প্রাণঘাতী ওষুধ কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাইকের আইনজীবীরা শুক্রবার জানান, তিনি তখনো অচেতন ছিলেন এবং কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন, পেন্টোবারবিটাল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল কি না। ওষুধটি শিরায় ঠিকমতো না গিয়ে আশপাশের টিস্যুতে ঢুকে পড়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

টেনেসি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ব্যবহৃত ওষুধের মৌলিক তথ্য গোপন রাখে। থমাস জানতে চেয়েছেন, স্ট্রাডা অ্যারিজোনায় ব্যবহৃত একই ওষুধ সরবরাহকারীর কাছ থেকে ওষুধ নিচ্ছেন কি না। সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের নিয়ম মানছে কি না এবং প্রাণঘাতী ওষুধে কোনো ভেজাল মেশেনি তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

পাইকের আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল গভর্নরের নতুন স্বাধীন তদন্ত নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, আগের স্বাধীন তদন্তের পরও মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্ধকারে রাখা হচ্ছে।’

ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহেরও স্ট্রাডার ভূমিকার জবাব চেয়েছেন। তিনি বলেন, মে মাসে কারাদার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে কী ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। একই ভুল যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য কোনো সংশোধনী পদক্ষেপও নেয়া হয়নি।

এদিকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে লির উত্তরসূরি হওয়ার জন্য যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা জানিয়েছেন, নির্বাচিত হলে স্ট্রাডাকে টেনেসির কারা বিভাগের প্রধান পদে রাখবেন না।