মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল বরাবর সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। গণ-অভ্যুত্থান বা বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও চাঁদাবাজমুক্ত সমতাভিত্তিক সমাজের। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যেন এক অমোঘ নিয়মে বারবার একই বিন্দুতে এসে মিলে যায়। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন মানুষের দোরগোড়ায়, ঠিক তখনই রাজধানীসহ বিভিন্ন প্রান্তে পুরনো দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজির মহোৎসব। গণ-অভ্যুত্থানের পর যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে গুণগত পরিবর্তন আসার কথা, সেখানে রাতারাতি এই পেশিশক্তির পুনরুত্থান দেশের সচেতন মহলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
চাঁদাবাজি ও দখলের অর্থনীতি একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া কাঠামোগত অপরাধ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক এক বিশদ গোয়েন্দা প্রতিবেদন এ কাঠামোগত অপরাধের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। দীর্ঘ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানীর প্রতিটি থানা এলাকায় নিবিড় তদন্ত চালিয়ে প্রস্তুত করা এ বিশেষ প্রতিবেদনে রাজধানীজুড়ে জমি দখল, ফুটপাথ দখল ও চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত এক হাজার ৫৩৬ জন চিহ্নিত অপরাধীর নাম উঠে এসেছে। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, এ বিশাল চক্রের নেপথ্যে থাকা ২৭৮ মদদদাতার মধ্যে ২৩০ জন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বর্তমান বা সাবেক নেতাকর্মী। মাঠে চাঁদাবাজি করা এক হাজার ২৫২ সক্রিয় কর্মীর মধ্যে অন্তত ৩৫০ জন সরাসরি ছাত্রদল, যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পদে আছেন। বাকি অপরাধীর বিশাল একটি অংশ কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও নেতাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন। এই তালিকায় কেবল রাজনৈতিক নেতারা নন, একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় থানা পুলিশের কিছু কর্মকর্তার আর্থিক লেনদেন ও নিয়মিত মাসোহারা পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ আছে।
ডিএমপির হিসাব মতে, ঢাকার প্রতিটি দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজার মূলত এই অপরাধীদের আয়ের উৎস। শুধু মিরপুর ১০ নম্বর থেকে মিরপুর ২ নম্বর পর্যন্ত ফুটপাথ থেকে প্রতি মাসে আদায় করা হয় প্রায় ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে মিরপুর ১০-এর হোপস লেন ও এর আশপাশের কয়েক শ’ ভাসমান দোকান থেকে মাসে আসে প্রায় আট লাখ টাকা। অন্য দিকে ভাটারার নতুন বাজার থেকে মাদানি এভিনিউ পর্যন্ত এলাকার দোকান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসে ১২-১৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করেছেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে এসব খাত থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদার প্রবাহ যেত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পকেটে। সরকারের পতনের পর দিন থেকে এ বিশাল অর্থপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ রাতারাতি নতুন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে চলে যায়।
এ কাঠামোগত চাঁদাবাজির বাইরেও সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর শঙ্কা ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে মিরপুর ১ নম্বরে। সেখানে ৫২ বছর ধরে পরিচালিত ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ বেসরকারি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র রাতে এক্সাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। উদ্বেগের বিষয় ছিল ঘটনার সময় পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়। যদিও পরে তীব্র সমালোচনায় পড়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। 
দখলদারত্ব ও পেশিশক্তির এ নগ্ন থাবা শুধু মিরপুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়। মাটিকাটা ইসিবি চত্বরে পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পাঁচটি পিকআপে করে আসা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা গুলি করতে করতে হাউজিংয়ে প্রবেশ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। জমিজমা নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কথা বলা হলেও, ভুক্তভোগীর সরাসরি অভিযোগ— স্থানীয় শ্রমিক দলের নেতার দাবিকৃত চাঁদা না দেয়ায় ঠাণ্ডামাথায় এই হামলা চালানো হয়েছে। অন্য দিকে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে একটি প্লট দখলের জন্য একদল লোক একযোগে হামলা চালায়। সেখানে আগের সাইনবোর্ড সরিয়ে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বাধা দিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের বেধড়ক মারধর করা হয়। আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়েও জমি ও বাড়ি দখলে ভোরে রামদা, চাপাতি ও পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র মহড়া দিতে দেখা গেছে। গেট না খোলায় হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও জানালার কাচ ভাঙচুর করে। এসব ঘটনার প্রতিটিতে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের ইন্ধন বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধপূর্ণ জমির আইনি সমাধানের পথে না হেঁটে পেশিশক্তি ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে রাতারাতি দখল নেয়ার এ প্রবণতা জনমনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে যখন শাসকদলের নেতাকর্মীরা সহায়-সম্বলহীনদের হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেয় আর প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চালায়, তখন দেশবাসী কী বার্তা পান? যেখানে স্বৈরাচারী শাসনের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। 
এসব ঘটনার সমালোচনা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সুশীলসমাজে সীমাবদ্ধ নেই। খোদ বিএনপির অভ্যন্তরীণ পর্যায় থেকেও সতর্কবার্তা উচ্চারিত হচ্ছে। দলের নিজস্ব সংসদ সদস্যরাও প্রকাশ্যে নেতাকর্মীদের এমন ক্ষমতার দাপট দেখানোর বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তারা ভালো করে বুঝতে পারছেন, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকতে হলে এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড দলের জনসমর্থন তলানিতে নিয়ে যাবে।
বিচারিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এ অপরাধগুলোর চিত্র আরো হতাশাজনক। গত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ৭২৩টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে এর প্রায় ৮৫ শতাংশ মামলায় চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় আসামিদের অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে। তবে চার্জশিট জমা পড়ার দীর্ঘ সময় পরও এসব মামলার অনেকগুলোর আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়নি। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে এর মধ্যে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন, আবার কিছু মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকছে। 
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলও এই পরিস্থিতি অনুধাবন করে চাঁদাবাজির মামলায় বিচারকদের জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আইনজীবীরা মনে করেন, চাঁদাবাজির মামলায় চার্জশিট দেয়ার পর আদালতে গিয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অনেকসময় সাজা নিশ্চিত করা যায় না, যার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে আইনি সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অবশ্য বারবার দাবি করা হচ্ছে— অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নেয়া হয়েছে। এসব প্রশাসনিক আশ্বাস নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে দেশের মানুষ প্রশাসনের গালভরা আশ্বাসের চেয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। মামলা হওয়া বা চার্জশিটের পরও যখন বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে এবং একই অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে আবারো দাপট দেখায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি আস্থার ঘাটতি দেখা দেয়।
বর্তমান সরকার এক নাজুক সময়ে দেশের দায়িত্বভার নিয়েছে। এক দিকে বিগত স্বৈরাচারী শাসনের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশের অর্থনীতি ও ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো টেনে তোলার এক বিশাল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ, অন্য দিকে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের অতি-উৎসাহী, পেশিশক্তিনির্ভর ও লাগামহীন কর্মকাণ্ড সামলানোর চতুর্মুখী চাপ। ইতিহাস আমাদের বারবার এই শিক্ষাই দেয়, কোনো রাজনৈতিক দল যত বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসুক না কেন, মাঠপর্যায়ে দখলবাজি ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অসহায় করা কোনো দলের জন্য কখনো সুখকর হয় না। দেশের মানুষ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সচেতন ও অধিকারকামী। তারা পরিবর্তন দেখতে চান শুধু ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে বা নেতাদের বক্তৃতায় নয়; দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তায়ও। 
রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের এখন আরশির সামনে দাঁড়িয়ে একটি বড় ও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তারা কি সত্যি নিজেদের দলীয় ক্যাডারদের লাগাম টেনে ধরে দেশে একটি স্থায়ী ও আস্থার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারবেন, নাকি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের সেই পুরনো বৃত্তে ঘুরপাক খাবেন? যদি দ্বিতীয়টি ঘটে, তবে তা কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে না; বরং একটি নতুন, বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, রক্ত ঝরিয়েছিল, সেই স্বপ্নকেও গভীর খাদের কিনারে ঠেলে দেবে। 
সময় এখন প্রতিশ্রুতির নয়, প্রমাণের। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মিলিত, কঠোর, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ পারে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া নতুন আতঙ্ক ও ক্ষোভের উপশম করতে। 
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com

Advertisement