
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দৈনিক মানবজমিনে ‘সরকারের অজানা শত্রু কারা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়— ‘গত দেড় দশকে দেশে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিরবচ্ছিন্ন শাসন কায়েম ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান— সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, বিচার বিভাগ এমনকি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে’। এতে আরো বলা হয়— ‘২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন এই দলীয়কৃত প্রশাসনের আসল ও ভয়ঙ্কর রূপটি প্রকাশ পায়’। প্রতিবেদনে উদ্বেগ পকাশ করে বলা হয়, ‘ড. ইউনূস সরকারের সময় যে অন্তর্ঘাতমূলক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক সরকারের ক্ষেত্রেও একই বা আরো তীব্র কাঠামোগত অন্তর্ঘাতের ঝুঁকি বিরাজমান’।
পত্রিকাটির মতে, বর্তমান সরকারের সামনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রায়েছে: ক. নীতিগত প্যারালাইসিস বা গো স্লো কৌশল; খ. কৃত্রিম সঙ্কট ও সিন্ডিকেটের কারসাজি; গ. তথ্যপাচার ও প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজ; ঘ. আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচার ও ঙ. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা। প্রতিবেদনে সঙ্কট উত্তরণে বেশ কয়েকটি পরামর্শও দেয়া হয়েছে।
পরের দিন অর্থাৎ ১ অক্টোবর দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা একই বিষয়ে প্রথম পাতায় ‘গতিহীন প্রশাসন নিয়ে সরকারে অস্বস্তি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর শুরুতে বলা হয়েছে— ‘নির্বাচিত নতুন সরকারের সাত মাস অতিবাহিত হলেও জনপ্রশাসনে কাক্সিক্ষত গতির দেখা মিলছে না। প্রশাসনের প্রায় সব স্তরেই ঢিলেঢালা পরিস্থিতি। নিয়ন্ত্রণও দৃশ্যত শিথিল। শীর্ষ আমলাদের মধ্যে দায়সারা ও গা-ছাড়া ভাব। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার আগ্রহ কম। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে পারস্পরিক আস্থাহীনতার ঘটনাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে’।
উল্লিখিত দু’টি পত্রিকার প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে— তার প্রতিফলন আরো আগে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের মুখেও শোনা গেছে। যেমন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন, ‘দেশের প্রশাসনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো ঘুষ খাচ্ছে। ঘুষ ছাড়া একটি ফাইলও নড়াচড়া করে না’। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘১৭ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সবাই চায় ব্যাংকের বিভিন্ন পদে বসতে। আমার ওপর অনেক চাপ; কিন্তু আমরা আর্থিক খাতে কোনো দলীয় লোক নিয়োগ দিচ্ছি না, দেবো না’। তিনি আরো বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে আর্থিক খাত কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকবে’। সন্দেহ নেই, তিনি সুন্দর কথা বলেছেন; কিন্তু বাস্তবে তার কথা কতটা সঠিক। (আর্থিক খাতের শীর্ষ পদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে তো দলীয়করণের কথা উঠেছে)। অন্য দিকে, এক অনুষ্ঠানে ‘পুলিশের কেউ কেউ এখনো ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন’ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘পুলিশের কোনো সদস্য শৃঙ্খলা না মানলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকার পিছপা হবে না’। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেছেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কাজ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের’।
উল্লিখিত প্রতিবেদন ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের মন্তব্য থেকে একটি অভিন্ন বিষয় বেরিয়ে এসেছে যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া দলীয়করণকৃত আমলাতন্ত্র দেশ, সরকার ও জনগণের জন্য কাক্সিক্ষত দায়িত্ব পালন করছে না। মজার বিষয় হলো— বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, ‘দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে’। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সচিবদের প্রথম সভায় বলেছিলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে দলীয়করণ করব না। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে’।
আওয়ামী লীগ সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে যে বিরাট ফাঁক ছিল তার প্রমাণ হলো ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতন্ত্র, যার সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবগত। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো আরো বেশি ওয়াকিবহাল। আর তার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনী মেনিফেস্টো তৈরি করেছিল। যেমন নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপির মেনিফেস্টোতে জনপ্রশাসন সম্পর্কে মোটাদাগে আটটি প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাসঙ্গিক দু’টি সম্পর্কে নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
ক. ‘মেরিটোক্র্যাসির বাংলাদেশ নির্মাণ : মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে’।
খ. ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধ : বিগত দিনগুলোতে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। এ কারণে ব্যক্তির বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং দলীয় আনুগত্যকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে কেবল সততা, দক্ষতা, মেধা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার বিচার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ এবং সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বিএনপি’।
ছাব্বিশের নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীও আমলাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা প্রশাসনকে দলীয়করণ করব না’।
বিএনপির নির্বাচনী মেনিফেস্টো ও সরকারপ্রধানের উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো শুনতে সুখানভূতি সৃষ্টি করলেও বাস্তবে বিগত কয়েক মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডে এর কোনো প্রতিফলন কি দেখা যাচ্ছে? আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে— ‘কিছু দিন আগে একযোগে ১২টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে সরকারদলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়’। অন্য আরো বহু মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে বিএনপি ঘরানার আমলাদের নিয়োগ ও পদায়ন করার কথা শোনা যায়। দুর্নীতির ও পারস্পরিক যোগসাজশে ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুরাগী কর্মকর্তারাও পুনর্বাসিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শুরুতে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেবে বলে সবাই আশা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে জনগণ পরিবর্তনের একটি সূচনা দেখতে চেয়েছিল; কিন্তু একমাত্র পে-স্কেল দেয়া ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। দলীয়করণের বিষয় পরিহার দূরের কথা, কারো মতে তা আরো বেড়েছে। দলীয়করণের পাশাপাশি দুর্নীতির সম্প্রসারণের কথা মন্ত্রীরাই স্বীকার করছেন। বস্তুত ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া ভ্রষ্ট আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজাতে অনেকগুলো দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার দরকার ছিল। বিএনপির মেনিফেস্টোতে বলা হয়েছে— অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা যথেষ্ট নয়। সে বিবেচনায় বিএনপি সরকার একটি প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ পেশ করেছিল তার মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
ক. স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন : জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া বিধায় টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নের স্বার্থে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করার জন্য সুপারিশ করা হলো।
খ. ওয়েবপোর্টাল-ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম : সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদন ব্যবস্থাকে অধিকতর জনমুখী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বিধিবদ্ধ ও প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলোকে সমন্বিত ওয়েবপোর্টাল-ভিত্তিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। ওই ওয়েবপোর্টালের মাধ্যমে প্রধান প্রধান কার্যসম্পাদন বিষয় পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও ফিডব্যাক ব্যবস্থা থাকবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে মূল মডিউল রেখে জেলা ও উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সুবিধাসহ ডিজিটাল ভৌত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
গ. জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত বিষয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দ্রুততর সময়ের মধ্যে একজন ‘প্রশাসনিক ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা যেতে পারে।
ঘ. স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন : অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট জালিয়াতি, অর্থপাচার, দুর্নীতি এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণহত্যার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে জনপ্রশাসনের পেশাদারত্ব, ভাবমর্যাদা ও একটি গণতান্ত্রিক দেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন্ন করেছে; তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের জন্য মাঠপর্যায়ে জনমত আছে বিধায় একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে কমিশন মনে করে।
ঙ. পুলিশ ভেরিফিকেশন : পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করতে সুপারিশ করা হলো। কারণ জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ এ স্তর থেকে শুরু হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল ঘোষিত হওয়ার আগে কোনো প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন করা যাবে না। বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশের বিভাগের কাছে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে। পুলিশ ভেরিফিকেশন কার্যক্রম পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরিবর্তে প্রার্থীর যোগদানকৃত মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পাদিত হবে। এ ছাড়া পাসপোর্ট, দ্বৈত নাগরিকত্ব, সমাজসেবা সংস্থা বা এনজিওর বোর্ড গঠন ইত্যাদি নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন কার্যক্রম বাতিল করার জন্যও সুপারিশ করা হলো। একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র থাকলে তার বিষয় নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনতে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। প্রতিটি কমিশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিল। সময়ের অভাবে তারা সামান্য কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল। সে আলোকে বহু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তার মধ্যে অনেকটা আবার জাতীয় সংসদে আইন আকারে অনুমোদিত হয়নি। যেমন— গুম সংস্কার কমিশনের কথাই ধরা যাক। আবার এটিও লক্ষণীয় ছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রত্যাশা সত্ত্বেও আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতায় বিভিন্ন সংস্কারমূলক বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভ হয়নি। আবার এটিও সত্য যে, বিচিত্র চিন্তা ও মতাদর্শের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের কার কতটুকু যোগ্যতা, আন্তরিকতা ও সিরিয়াসনেস ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন করা যেতে পারে। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে এটাই যে, কোনো রাষ্ট্রের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নিজে আগ্রহী হলেও তার দলীয় নেতাকর্মী এবং আমলাতন্ত্র সহযোগিতা না করলে তা বাস্তবায়ন করা যায় না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বেলায় আরো কঠিন অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়। প্রধান শর্তটি হচ্ছে, যে দলটি সরকার গঠন করে সে দলের সবপর্যায়ের নেতাকর্মী বড় ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ও অঙ্গীকারবদ্ধ কি না। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর দেশে প্রয়োজন ছিল সংস্কারের জন্য সাহসী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা; কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপি কোনো বৈপ্লবিক দল নয়। আসলে তার কথাই ঠিক। বিএনপির পক্ষে কোনো বৈপ্লবিক সংস্কার সম্ভব নয়, যার প্রথম প্রকাশ ঘটেছে তারা সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠনে শপথ না নিয়ে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। এরপর সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিরোধী দল অংশগ্রহণ করেনি। এখন বলা হচ্ছে— সংবিধান সংশোধনে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারে সরকারের পদক্ষেপগুলো আরো বেশি বিতর্কের জন্ম দিলো। আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি, সব সরকার জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং সেটিই যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
জনপ্রশাসন এখন ঠিকমতো কাজ করছে না বলে সরকারের নীতিনির্ধারকরা আফসোস করছেন; কিন্তু জনপ্রশাসনকে মেরিটোক্র্যাসি এবং পেশাদারত্বের নীতির ওপর দাঁড় করাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে; বরং পতিত সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক মেশিনারি দিয়ে কাজ চালানোর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের কলাম শেষ করছি— ‘রাজনৈতিক বিবেচনাই যদি পদোন্নতির মাপকাঠি হয়, তাহলে কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনীতিকীকরণ বাড়বে। প্রশাসন তার নিজস্ব গতি হারাবে। নতুন ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিকদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা গেলেও মেধাহীন ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানের প্রশাসন কায়েম করা যায় না’।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
ayubmiah@gmail.com
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








