
রাজধানীর চাঁনখারপুলের ‘রয়েল কেয়ার হাসপাতাল’ নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসকদের চরম গাফিলতি ও ইনকিউবেটরের অতিরিক্ত উত্তাপের (ওভারহিট) কারণে ৫ ঘণ্টা বয়সী এক নবজাতকের শরীর পুড়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে মাথা, পিঠ ও পা ঝলসে যাওয়া ওই শিশুটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউ-তে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মৃত্যুর সাথে লড়ছে।
শিশুর বাবা মো: রাব্বানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, শনিবার ভোর ৪টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে তার সন্তানে জন্ম হয়। জন্মের পর নবজাতকের শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত এনআইসিইউ সাপোর্টে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢামেকের নিজস্ব এনআইসিইউতে কোনো সিট খালি না থাকায় সেখানকার এক চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালের এক ওয়ার্ড বয়ের মাধ্যমে ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে শিশুটিকে চাঁনখারপুলের ‘রয়েল কেয়ার হাসপাতালে’ নিয়ে যান রাব্বানী।
হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই নবজাতকটিকে এনআইসিইউ বেডে রাখা হয়েছিল। বাবা মো: রাব্বানী ও তার ভাতিজা রেজাউল যখন কাগজপত্র ঠিক করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ সবার চিৎকার শুনতে পান।
দৌড়ে ওয়ার্ডে গিয়ে তারা দেখতে পান—শিশুটিকে যে মেশিনের মধ্যে রাখা হয়েছিল সেটি দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং বাচ্চার শরীরে আগুন লেগে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে হাসপাতালের দায়িত্বরত স্টাফরা আগেই পালিয়ে যান এবং সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে স্বজনদের প্রচেষ্টায় কোনোমতে আগুন নিভিয়ে ও হাসপাতালের কিছু স্টাফকে সাথে নিয়ে শিশুটিকে দ্রুত জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে পুনরায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু ঢামেকের চিকিৎসকরা শিশুটিকে আবার ‘রয়েল কেয়ার’ হাসপাতালেই ফেরত পাঠান। পরবর্তীতে দায় এড়াতে সেখানে গেলে রয়েল কেয়ার হাসপাতালের লোকজন ভুক্তভোগী পরিবারকে মারধর করে বলেও গুরুতর অভিযোগ করেন শিশুর বাবা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মো: রাব্বানী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে সিট না পেয়ে বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ওদের অবহেলায় আমার ৫ ঘণ্টার বাচ্চার শরীরটা পুইড়া গেল। আমি এই কসাইদের বিচার চাই।’
ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার (৭ নভেম্বর) ভোরে। ভুক্তভোগী নবজাতকটি বগুড়ার কাহালু থানার পলি বগুই গ্রামের বাসিন্দা মো: রাব্বানীর সন্তান।
রয়েল কেয়ার হাসপাতালের ইনচার্জ মো: আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, শিশুটিকে ভর্তি করার আগেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা এবং শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে তাদের ধারণা।
তাদের কোনো গাফিলতি ছিল না বলে দাবি করে তিনি আরো বলেন, মারধরের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সঠিক নয়, বরং সেখানে থাকা অন্যান্য রোগীদের স্বজনদের সাথেই মূলত বাকবিতণ্ডা বা হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
একই হাসপাতালের রিসিপশনিস্ট সানজিদা বলেন, ভর্তির প্রক্রিয়া চলার সময়ই শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই তারা নিজ উদ্যোগে বাচ্চার স্বজনদের সাথে নিজেদের স্টাফদেরও জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়েছিলেন। তাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: তাজকিয়া হক জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তার শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি বারবার স্বজনদের জানানো হলেও তারা মানতে চাচ্ছেন না এবং চিকিৎসায় সহযোগিতা করছেন না।
অন্যদিকে ঢামেকের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত ওয়ার্ড বয়রা জানান, ঢামেকের নিজস্ব সিট না থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে যায়। এই ঘটনার সমস্ত দায়ভার সম্পূর্ণভাবে রয়েল কেয়ার হাসপাতালের।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো: হাবিবুর রহমান জানান, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। বর্তমানে নবজাতকটি ঢামেকের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের এনআইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন রয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








