
বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, শিশুদের তথ্যের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় সময়মতো টিকা পৌঁছে দিতে না পারায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেয়ার হার কমে গেলে অন্য দেশগুলোকেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।
উপমহাদেশের অন্যতম পুরোনো পাকিস্তানি ইংরেজি দৈনিক ডন শনিবার (১৭ অক্টোবর) জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন রোগীর খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় ২২ হাজার জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর আর কোনো দেশে এত বেশি সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া যায়নি।
এ পর্যন্ত এ রোগে মারা গেছে ১ হাজার ১৪৭ জন। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, ‘প্রতিটি দেশের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।’
তাঁর মতে, জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেয়ে আগে থেকেই টিকা দিয়ে হাম প্রতিরোধ করা সহজ, কম খরচের এবং নিরাপদ।
টিকাদানের হার কমতেই বাড়ল বিপদ
ডব্লিউএইচওর মতে, হাম ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি দেখা দেয়। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের হিসাবে, ওই বছর হামের প্রথম ডোজ নেয় ৯০ শতাংশ শিশু। দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার হার ছিল ৮৬ শতাংশ। অথচ হাম ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশে রাখা প্রয়োজন।
রয়টার্সের নথিপত্র পর্যালোচনা এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও যথেষ্ট ছিল না। লাখ লাখ শিশুর তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে গেছে। অনেক অভিভাবকের কাছেও সময়মতো টিকার খবর পৌঁছানো যায়নি।
‘ছেলেকে কবর দেয়ার পর তারা এসেছে’
সিলেট দেশের সবচেয়ে বেশি হাম আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে জুলাইয়ে দুই বছরের আরমান হোসাইন টিকা না নিয়েই মারা যায়। হাসপাতালে ভর্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারটিকে তাদের তিন চাকার অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছিল। আরমানের চার বছরের বোন অবশ্য বেঁচে যায়।
আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সী আমিন মিয়া বলেন, তাঁদের দুর্গম গ্রামে সময়মতো টিকা দিতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তাঁর কথায়, ‘ছেলেকে কবর দেয়ার পরই তারা এসেছে।’
একই অঞ্চলের ছাতকে জুনে মারা যায় নয় মাস বয়সী লাবিবা আক্তার। সেও হামের টিকা পায়নি। তার বাবা ৩০ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদ জানান, জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা দেয়ার বয়সসীমা নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল। সে হিসাবে এপ্রিলে টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল লাবিবার। কিন্তু তার পরিবারকে কেউ সে কথা জানায়নি। হুমায়ুন বলেন, ‘আমাদের জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি।’
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, প্রতি এক হাজার হামে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে সাধারণত দুই থেকে তিনজন মারা যায়। তবে অপুষ্টিসহ নানা কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে এ রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বেশি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধে সরকার সবকিছু করছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো পরবর্তী প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
ডব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদানের সরকারি হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবের কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মানুষকে টিকা দেয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। এতে টিকা নেয়া মানুষের সংখ্যা কিংবা টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








