
রফিকুল হায়দার ফরহাদ
বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলাররা তাদের ছেলেদের ফুটবলার বানিয়েছেন এমন নজির কম। বরং ছেলেদের খেলাধুলার বাইরে রেখে তাদের শরীরের অবস্থা এমন করেছেন যে মোটা শরীরের জন্য তারা হাঁটতেই পারে না ঠিক মতো। নিজেরা ফুটবল খেলে টাকা, খ্যাতি, যশ সবই কামিয়েছেন। অথচ ছেলেদের বেলায় বলছেন, ‘বাংলাদেশে ফুটবল খেলে ভবিষ্যৎ নেই’। তবে এই সাবেক ফুটবলারদের চেয়ে ব্যতিক্রম খন্দকার ওয়াসিম ইকবাল ও ওয়ালিদ খান। দুইজনেরই একটি মাত্র ছেলে। তারা উভয়ই তাদের ছেলেকে ফুটবলার বানিয়েছেন। এবার তারা খেলবেন ব্রাদার্স ইউনিয়নে। জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার ওয়ালিদ খানের ছেলেন নাম আসওয়াদ বিন ওয়ালিদ খান। আর ওয়াসিম ইকবালের ছেলে নাবিল খন্দকার জয়।
আসওয়াদ ও জয় দুইজনই ব্রাদার্সের পুরনো খেলোয়াড়। জয় গত বছর এই গোপীবাগের ক্লাবটিতে ছিলেন। তবে প্রথম লেগে রেজিস্ট্রেশন ঝামেলায় মাঠেই নামা হয়নি। এরপর ফিরতি লিগে রেজিস্ট্রেশন হলেও কোচ তাকে মাঠে নামাননি। তবে এবার খেলা হবে। ক্লাব কর্মকর্তারা সেভাবেই মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে বলেছেন জয়কে। জানান তিনি। আর আসওয়াদ বিন ওয়ালিদ খান ব্রাদার্সে খেলার পর যোগ দেন বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের দল ঢাকা রেঞ্জার্সে। এবার ফিরে এসেছেন পুরনো ক্লাবে।
ওয়াসিম ইকবাল ছিলেন রাইট উইংগার। তবে ছেলে জয় খেলেছেন রাইট ব্যাক পজিশনে। এআইইউবিতে মাস্টার্সে পড়া জয় জানান, ‘আমি প্রথমে মিডফিল্ডে খেলতাম। কিন্তু কোচরা আমাকে রাইট ব্যাকে খেলতেই বেশি উৎসাহ দেন। তাদের মতে, আমি রাইট ব্যাক পজিশনেই ভালো করব। তাই আমি এই পজিশনেই খেলছি।’ ব্রাদার্সে আসার আগে খেলেছেন লিটিল ফ্রেন্ডসের হয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে এবং একই ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছেন জয়।
যোগ করেন, ‘আমার বুঝ জ্ঞান হওয়ার আগেই আমার বাবা খন্দকার ওয়াসিম ইকবাল খেলা ছেড়ে দেন। তাই উনার খেলা দেখার কোনো সুযোগই হয়নি। তবে পরে আমি আমাদের পরিবার এবং পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে বাবার খেলোয়াড়ী জীবনের সাফল্য এবং ওনার জনপ্রিয়তার কথা শুনেছি। যা আমাকে বাবার মতোই ফুটবলার হতে দারুণভাবে উৎসাহিত করে।’
গোপীবাগের ছেলে নাবিল খন্দকার জয়। এলাকার অন্য আরো খেলোয়াড়ের মতো তারও ফুটবলে হাতেখড়ি ব্রাদার্স ইউনিয়ন মাঠে। এলাকারই ক্লাব গফুর বেলুচ ফুটবল একাডেমির হয়ে পাইওনিয়ার লিগ দিয়ে ফুটবলে অভিষেক তার। তবে খেলার সেই সালটির কথা মনে করতে পারলেন না তিনি। এরপর ব্রাদার্স ইউনিয়ন মাঠের পূর্ব পাশে অবস্থিত লিটিল ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ লিগে খেলা। সে বছরই লাইসেন্স করে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে ( বিসিএল) প্রতিনিধিত্ব করে লিটিল ফ্রেন্ডস। ফলে জয়েরও খেলার সুযোগ হয় বিসিএলে। এরপর বাংলাদেশ ফুটবল লিগে ব্রাদার্স ইউনিয়নে যোগদান।
জয় জানালেন, ‘আব্বু আমাকে ফুটবলার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে যাতে কোনো চাপ না আসে সেদিকে খেয়াল রাখেন। যেমন ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করা, সময় মতো ঘুমানো এগুলো যাতে ঠিক মতো হয় এজন্য আম্মুকে নির্দেশ দেন। সে সাথে মাঠে করা বিভিন্ন ভুলগুলো শোধরে দেন।’ তবে মাঠে নামার পর ব্রাদার্সের উপদেষ্টা ওয়াসিম থেকে কোনো সহায়তা পান না জয়। জানালেন, ‘আব্বু প্রথমেই বলে দিয়েছেন তুমি মাঠে নামার পর আর আমার কাছ থেকে কিছু পাবে না। তোমারটা তোমাকেই করে নিতে হবে।’ আরো জানান, ‘তবে আমি যদি মাঠে খুব ভালো খেলে বেশি উত্তেজিত হয়ে যাই তখন বাবা আমাকে পরামর্শ দেন যেন বেশি এক্সাইটেড না হই। আরো ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন।’ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে আদর্শ হিসেবে মানা জয়ের লক্ষ্য বাবার চেয়েও বড় ফুটবলার হওয়া। জাতীয় দলে খেলে দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে আরো উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।
ওয়াসিমের ছেলে জয় বাবার পজিশনে না খেললেও ওয়ালিদের ছেলে আসওয়াদ বাবার মতোই স্ট্রাইকার। এখনো সেভাবে ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলেও শারীরিক উচ্চতায় ছাড়িয়ে গেছেন বাবাকে। আসওয়াদ জানান, আমি বাবার চেয়ে ৬ ইঞ্চি লম্বা।
কেন বাবার মতোই স্ট্রাইকার হওয়া। আসওয়াদের জবাব, ছোট বেলা থেকেই দেখতাম বাবা যখন স্ট্রাইকার হিসেবে মাঠে গোল করতেন তখন তাকে নিয়েই বেশি মাতামাতি হতো। দর্শকরা বেশি গুরুত্ব দিত। তাই আমিও স্ট্রাইকার হওয়ার পণ করেছি।
নরসিংদীর ছেলে আসওয়াদ। ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলের জন্য সেখানে ফুটবল ট্রায়াল হয়। তবে বাবা ওয়ালিদ বাধা দেন ট্রায়ালে আসতে। কারণ আরো পরিপক্বতা দরকার ছিল। কিন্তু আসওয়াদ লুকিয়ে চলে আসেন ট্রায়ালে। এরপর বাফুফের সে ট্রায়ালে টিকেও যান। সেই ট্রায়ালে উপস্থিত ছিলেন বাবা। তিনি পরে দেখেন তার ছেলেও ট্রায়ালে এসেছে। অবশ্য ট্রায়াল নিতে আসা অন্য কোচদের আর ছেলের পরিচয় দেননি ওয়ালিদ। বাছাইয়ে টেকার পর জানান ও আমার ছেলে। পরে আরো দুই ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত দলে ডাক পান। আসওয়াদ জানান, জীবনে প্রথম ট্রায়াল দিতে এসেই জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবরটা যখন শুনলাম সেটা ছিল আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। যোগ করেন, এ ছাড়া বিসিএলে গোপালগঞ্জের হয়ে ওয়ারীর বিপক্ষে জীবনের প্রথম যে গোলটি করেছিলাম লিগে সেটাও ভুলতে পারব না। কারণ আমি আগের দিন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ক্যাম্পে এসেছি। খেলা চলছিল ইনজুরি টাইমে। স্কোর ছিল ১-১। তখন কোচ আব্দুর রাজ্জাক বেশি আত্মবিশ^াসের সাথেই আমাকে মাঠে নামান। আমি মাঠে নামার পরপরই গোল করে দলকে জেতাই। সেটাও স্মরণীয়।
বাংলাদেশী স্ট্রাইকাররা তেমন উচ্চতার হন না। সেখানে ব্যতিক্রম আসওয়াদ। বেশ লম্বা তিনি। গতবার অবশ্য ব্রাদার্সের হয়ে প্রথম একাদশে খেলা হয়নি তার। নেমেছিলেন বদলি হিসেবে। তবে এবার খেলতে চান মূল একাদশে। সে সাথে নিয়মিত হতে চান দলে। ২১ বছর বয়সী এই ফুটবলার জানান, আমাদের দেশে ক্লাবগুলোতে বিদেশী স্ট্রাইকারদের দাপট। তবে আমার টার্গেট স্ট্রাইকার হিসেবে অনেক গোল করে বাবার মতোই জাতীয় দলে খেলা।
ব্রাদার্সের হয়ে কোনো গোল করা না হলেও বিসিএলে ঢাকা রেঞ্জার্সের হয়ে পাঁচবার বল জালে পাঠিয়েছেন। এর আগে বসুন্ধরা কিংস জুনিয়র দলে, বিসিএলে ওয়ারী ক্লাব ও গোপালগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবে খেলেছেন। ওই দুই ক্লাবের হয়ে করেছেন ২টি করে গোল।
উল্লেখ্য, ওয়ালিদ খান এবার ব্রাদার্সের সহকারী কোচ।
গতকাল অবশ্য সিটি ক্লাবের বিপক্ষে এদের কেউ মাঠে নামেনি।







