উপকূল, বন্যা এডিবি
উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির উপেক্ষিত চালিকাশক্তি। প্রতীকী ছবি

উপকূলীয় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বর্তমান মাত্রার কাছাকাছি রাখতে বছরে ৯ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেই বিনিয়োগে প্রতিবছর ১৭৮ থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের বন্যার ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অন্যথায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ১৯৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সতর্কবার্তা। 

Advertisement

বুধবার প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক বিপদের মুখে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলো ক্রমশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অথচ এই উপকূলগুলোই বছরে ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।

এডিবির হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা অভিযোজনমূলক উদ্যোগ না থাকলে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের ছয় গুণেরও বেশি এবং ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ গুণ হতে পারে। ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর করা অনুমানের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের বক্তব্য, এখনই উপকূল রক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

ঝুঁকিতে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ
এডিবির উপকূলবর্তী উন্নয়নশীল সদস্য দেশগুলোতে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। অর্থাৎ, এই দেশগুলোর প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষ উপকূলের কাছাকাছি থাকেন। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় বন্যা এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত বিপদের প্রভাব শুধু অবকাঠামো বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সরাসরি আঘাত হানতে পারে মানুষের জীবন-জীবিকা ও বসতিতে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর গুরুত্বও বিপুল। বন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি এগুলো পর্যটন, ঐতিহ্য এবং নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। কিন্তু যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে এই সম্পদই ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় অর্থনীতিগুলো মোট অর্থমূল্যের বিচারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে ক্ষতির আপেক্ষিক প্রভাব হবে আরো ভয়াবহ। উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে ২১০০ সাল নাগাদ এসব দ্বীপরাষ্ট্রের বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

শতাব্দীর শেষে প্রতি বছর বন্যার আশঙ্কা
বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ার বড় বড় উপকূলীয় শহরেও। ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো শহরগুলোতে যে ধরনের উপকূলীয় বন্যা ঐতিহাসিকভাবে এক শ’ বছরে একবার ঘটত, তা এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ প্রতিবছর ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে এডিবি। বিপদের মুখে রয়েছে বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলে বন্দরগুলোতে বিঘ্ন ঘটার কারণে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় এই ধরনের বিঘ্নের প্রভাব উপকূলীয় এলাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভজেনি ঝুকভ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির উপেক্ষিত চালিকাশক্তি। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান বিপদের মুখে সেগুলো পিছিয়ে পড়ছে। তার কথায়, মানুষকে নিরাপদ রাখা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকি-সচেতন সমাধান নিয়ে এখনই পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।

বিনিয়োগের তুলনায় সুফল অনেক বেশি
এডিবির প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগের আর্থিক সুফল। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বর্তমান মাত্রার কাছাকাছি রাখতে বছরে আনুমানিক ৯ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এর ফলে প্রতিবছর ১৭৮ থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, উপকূল রক্ষার জন্য আগাম অর্থ ব্যয়কে শুধু অতিরিক্ত সরকারি খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না; ভবিষ্যতের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর বিনিয়োগ হিসেবেও দেখতে হবে। তবে এই সুফল পেতে হলে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

প্রতিবেদনে সরকারগুলোর জন্য চারটি পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জলবায়ু অভিযোজনকে মূলধারায় নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা। এবং চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় পর্যায়ে মালিকানা বজায় রাখা। এডিবির মতে, উপকূলীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের সাথে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যকে যুক্ত করতে হবে। একইসাথে পরিস্থিতি ও ঝুঁকির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে নীতি ও পরিকল্পনা সংশোধনের সুযোগও রাখতে হবে।

অর্থায়ন বাড়লেও ঘাটতি রয়ে গেছে
উপকূলীয় সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো যথেষ্ট নয়। এডিবির প্রতিবেদন অনুসারে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় অর্থনীতিগুলোতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়ন ২০১৫ সালে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ছিল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা বেড়ে বছরে গড়ে ১১.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু অর্থায়ন প্রায় দ্বিগুণ হলেও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। উপকূলীয় স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর বিনিয়োগের প্রধান ভিত্তি সরকারি অর্থায়ন। সেই সাথে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি তহবিলের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সহজ শর্তে ঋণ ও অন্যান্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এডিবির বক্তব্য, এ ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অতিরিক্ত অর্থের উৎস তৈরি করা জরুরি। কারণ, উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা করলেই চলবে না, প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান এবং প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।