ফোবিয়া
সাপের ভয়। সংগৃহীত

কোনো কিছুতে খুব বেশি ভয় পেলেই আমরা অনেক সময় সেটিকে ‘ফোবিয়া’ বলে থাকি। যেমন, সাপ বা উঁচু জায়গায় তীব্র ভয়। তবে তীব্র ভয় আর ফোবিয়া এক বিষয় নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসাবে ফোবিয়া আসলে খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।

Advertisement

মূলত, ভয় মানুষের আবেগের স্বাভাবিক একটি বহিঃপ্রকাশ। এই ভয়ের অনুভূতি-ই বিপদের মুখে থাকলে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে সতর্ক হতে সাহায্য করে।

কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতি নিয়ে ভয় যখন মাত্রাতিরিক্ত ও অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়, দীর্ঘদিন থাকে এবং সেই কারণে কেউ কোনো স্বাভাবিক কাজকর্ম বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা শুরু করেন, তখন সেটি আর সাধারণ ভয়ের কাতারে থাকে না সাধারণত।

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেন্টাল হেলথ বা এনআইএমএইচ বলছে, ফোবিয়া হলো কোনো কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির প্রতি তীব্র ভয় বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফোবিয়ার ক্ষেত্রে কোনো বস্তু বা পরিস্থিতি বাস্তবে যতটা বিপজ্জনক, তার তুলনায় ব্যক্তির ভয় অনেক বেশি হয়।

কিন্তু ভয় আর ফোবিয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? কোন ধরনের ফোবিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায়?

সুচের ভয়কে ট্রাইপ্যানোফোবিয়া বলে

ফোবিয়ার রকমভেদ
ফোবিয়া ও ফোবিয়া সংশ্লিষ্ট সমস্যার কয়েকটি ধরন রয়েছে।

একটি হলো ‘স্পেসিফিক ফোবিয়া’। নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা পরিস্থিতিকে ঘিরে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ভয়কে ‘স্পেসিফিক ফোবিয়া’ বলা হয়। এটিকে কখনো কখনো ‘সিম্পল ফোবিয়া’ও বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিক বলছে, স্পেসিফিক ফোবিয়ার ক্ষেত্রে ভয় অনেক বেশি তীব্র হয়, যা বাস্তবে খুব সামান্য বিপজ্জনক কিংবা বিপজ্জনক-ই নয়।

সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা পরিস্থিতিকে ঘিরেই এই ভয় তৈরি হয়। যেমন :
কুকুর, পোকামাকড় বা সাপের মতো প্রাণীর ভয়

বিমানে ভ্রমণ, উঁচু জায়গায় থাকা বা ছোট ও বদ্ধ জায়গায় থাকার ভয়

রক্ত বা বমির মতো শারীরিক তরল পদার্থের ভয়

আরেকটি হলো অ্যাগোরাফোবিয়া। এতে আক্রান্তদের দুই বা তার বেশি পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ভয় থাকে। যেমন :
গণপরিবহন ব্যবহার করা

বদ্ধ জায়গায় থাকা

খোলা জায়গায় থাকা

লাইনে দাঁড়ানো বা ভিড়ের মাঝে থাকা

বাড়ির বাইরে একা থাকা

এই সমস্যায় যারা ভুগছেন, তারা প্রায়ই এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন। কারণ, তাদের মনে হয়, সেখানে বিব্রতকর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তারা ওখান থেকে বের হতে পারবেন না।

এনআইএমএইচ বলছে, অ্যাগোরাফোবিয়া গুরুতর পর্যায়ে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তি বাড়ির বাইরে যাওয়াই বন্ধ করে দিতে পারেন।

সর্বশেষ হলো, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, এটিকে ‘সোশ্যাল ফোবিয়া’ বলা হয়।

এ ক্ষেত্রে অন্যরা তাকে দেখছে বা তার সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে, এমন সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে মনের মাঝে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ভয় তৈরি হয়।

Caption

ফোবিয়া বুঝবেন কীভাবে
এনআইএমএইচের তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটির মধ্যে স্পেসিফিক ফোবিয়ার হার সামান্য বেশি।

অনেকসময় পরীক্ষা দেয়া বা অনেক মানুষের সামনে কথা বলতে গেলে মানুষের মাঝে সাময়িক সময়ের জন্য উদ্বেগ কাজ করে। কিন্তু ফোবিয়া, বিশেষত স্পেসিফিক ফোবিয়া তেমন না। এটি ব্যক্তির মাঝে দীর্ঘদিন ধরে থাকতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে অনেকের ক্ষেত্রে এই ভয় সারা জীবনও থেকে যেতে পারে।

ফোবিয়ার কারণে শরীর ও মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে কর্মক্ষেত্রে, পড়াশোনা কিংবা সামাজিক জীবনেও।

মায়ো ক্লিনিক বলছে, নারীদের মাঝে স্পেসিফিক ফোবিয়া বেশি দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে বলা হয়েছে, স্পেসিফিক ফোবিয়া নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা হয়, ভয় বা কোনো কিছু এড়িয়ে চলার প্রবণতা ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে আছে কি না। তবে এখানে ভয় ও বিপদের মাত্রাও বিবেচনা করা হয়।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএস ফোবিয়ার কিছু লক্ষণের কথা বলেছে। যেমন :
তীব্র উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা

মাথা ঘোরা বা মাথা হালকা লাগা

হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অনুভব করা

বুকে চাপ বা আঁটসাঁট অনুভূতি

বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়া

শরীর কাঁপা

অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো বা মারা যাওয়ার তীব্র ভয়

মাকড়সা দেখে ভয়ে নারীর চিৎকার

ফোবিয়ার কারণ
কারো মধ্যে ফোবিয়া কেন তৈরি হয়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর কোনো অভিজ্ঞতা বা মানসিক চাপের সাথে এর যোগসূত্র থাকতে পারে।

সাধারণত শৈশব, কৈশোর বা তারুণ্যের শুরুর দিকে ফোবিয়া তৈরি হতে দেখা যায়। কিছু কারণে ফোবিয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকতে পারে। যেমন :
শৈশবে ভয়ঙ্কর কোনো অভিজ্ঞতা হলে; যেমন— কুকুর তাড়া করলে পরবর্তী সময়ে কুকুরের প্রতি তীব্র ভয় তৈরি হতে পারে

পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের কারো ফোবিয়া থাকলে; অন্যের কাছ থেকেও কোনো কিছুকে ভয় পেতে শেখা সম্ভব

নিজের ভয় বা আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অন্যদের কাছ থেকে নেতিবাচক আচরণের শিকার হলে; নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিব্রতবোধ উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে

পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে উদ্বেগজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়

পরিবারে কারো উদ্বেগজনিত সমস্যা থাকলে

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ১০ বছর বয়সের আগেই স্পেসিফিক ফোবিয়া তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে প্রায় তিন থেকে নয় শতাংশের স্পেসিফিক ফোবিয়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ১৬ শতাংশ। যদিও বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্পেসিফিক ফোবিয়ার হার কমতে দেখা যায়। তবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ শতাংশের এই সমস্যা রয়েছে।

উচ্চতা নিয়েও অনেকের মাঝে ভয় কাজ করে

ফোবিয়ার চিকিৎসা
ফোবিয়া পুরোপুরি সারানো কঠিন হতে পারে। তবে এর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এনএইচএস-এর পরামর্শ অনুযায়ী ফোবিয়ার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে :
টকিং থেরাপি, যেমন— কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা সিবিটি হিপনোথেরাপি

প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ সেবন, যেমন— অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, বিটা ব্লকার এবং উদ্বেগ কমিয়ে শান্ত হতে সাহায্য করে এমন সেডেটিভ ওষুধ

ফোবিয়ার ধরন ও এর প্রভাব ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তবে কিছু অভ্যাস এর উপসর্গ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। যেমন :

নিজেকে শান্ত করতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা

নিজের ফোবিয়া নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কারো সাথে কথা বলা

অনলাইনে বা সরাসরি কোনো সেলফ-হেল্প গ্রুপে যুক্ত হওয়া, একই ধরনের ভয় ও অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন মানুষের সাথে কথা বলা

ফোবিয়া সম্পর্কে অনলাইনে তথ্য খোঁজার সময় সতর্ক থাকা, কারণ সেখানে হঠাৎ এমন ছবি সামনে আসতে পারে, যা ভয় বা উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে

চিড়িয়াখানা বা এয়ারলাইনের মতো প্রতিষ্ঠান ফোবিয়া মোকাবিলায় বিশেষ কোনো সেশন আয়োজন করে কি না, তা খোঁজ নিয়ে দেখা

আর, বিকেল ৩টার পর এনার্জি ড্রিংক বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে এনএইচএস। কারণ এগুলো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে এবং উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে।

মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ভয় বা প্যানিক অ্যাটাকে ভোগা নারী

কিছু কমন ফোবিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞরা সিম্পল বা স্পেসিফিক ফোবিয়াকে সাধারণত পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন। যেগুলো হলো :

প্রাণী
অ্যারাকনোফোবিয়া : মাকড়সার ভয়

সাইনোফোবিয়া : কুকুরের ভয়

এন্টোমোফোবিয়া : পোকামাকড়ের ভয়

ওফিডিওফোবিয়া : সাপের ভয়

প্রাকৃতিক পরিবেশ
অ্যাক্রোফোবিয়া : উঁচু জায়গার ভয়

অ্যাকুয়াফোবিয়া : পানির ভয়

অ্যাস্ট্রাফোবিয়া : বজ্রপাত ও বজ্রধ্বনির ভয়

রক্ত, চিকিৎসা বা আঘাত
অ্যালগোফোবিয়া : ব্যথার ভয়

ডেন্টোফোবিয়া : দাঁতের চিকিৎসক বা দাঁতের চিকিৎসার ভয়

হিমোফোবিয়া : রক্তের ভয়

ট্রাইপ্যানোফোবিয়া : সুচের ভয়

নির্দিষ্ট পরিস্থিতি
অ্যারোফোবিয়া : বিমানে ভ্রমণের ভয়

অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া : গাড়ি চালানোর ভয়

ক্লস্ট্রোফোবিয়া : বদ্ধ জায়গার ভয়

নিক্টোফোবিয়া : অন্ধকারের ভয়

অন্যান্য
কুলরোফোবিয়া : ক্লাউনের ভয়

এমেটোফোবিয়া : বমি করার ভয়

পাইরোফোবিয়া : আগুনের ভয়

ট্রাইপোফোবিয়া : গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট গর্ত বা ছিদ্রের বিন্যাসের প্রতি তীব্র ভয় বা অস্বস্তি


সূত্র : বিবিসি