টানা, চতুর্থ সপ্তাহান্ত, গোটা ফ্রান্স, বিক্ষোভ, রাজধানী, পুলিশ, সংঘর্ষ,
কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে ছুটছে বিক্ষুদ্ধ এক তরুণ। দ্য ডন

ফ্রান্সজুড়ে শনিবার নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে আয়োজিত এসব বিক্ষোভে প্যারিসে পুলিশের সাথে সংঘর্ষও হয়েছে। তবে আগের কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এবার বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল কম।

Advertisement

পাকিস্তানের পুরোনো ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন জানায়, টানা চতুর্থ সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে এই বিক্ষোভ হলো। পাঁচ মাস পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এমন এক সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেও উত্তপ্ত করে তুলছে। আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ দেখছে দেশটির কট্টর ডানপন্থীরা।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে সারা দেশে অংশ নেন ১ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ৪৬ হাজার। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। রাজধানীতে বিক্ষোভ করেন ৭৫ হাজার মানুষ।

Advertisement

আগের তিন সপ্তাহের তুলনায় এবার লোকসমাগম কম হলেও এর ঠিক দুদিন আগে, বৃহস্পতিবার, শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকা বড় সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৫ হাজার। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, সংখ্যাটি ছিল ১৬ লাখ।

প্যারিসে শনিবারের বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। এএফপির এক সংবাদদাতা জানান, কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন জিনিস ও হাতে তৈরি আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের ভাষ্য, একটি ডাস্টবিনে আগুন ধরিয়ে দেয়ার দায়ে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের সময় প্রায় ২০০ সহিংস বিক্ষোভকারী তাদের ওপর হামলা চালান।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। গত ১৭ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ একপর্যায়ে কয়েক বছরের মধ্যে ফ্রান্সের ভয়াবহতম দাঙ্গায় রূপ নেয়। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তুতি নেয় কর্তৃপক্ষ।

প্যারিসে শ্রমিক সংগঠনগুলো কেন্দ্রীয় রিপাবলিক চত্বর থেকে পূর্বাঞ্চলের নাসিওঁ চত্বর পর্যন্ত প্রচলিত পথে মিছিল করে। সংঘর্ষ বাধে এই নাসিওঁ চত্বরেই। তবে প্রায় এক দশক আগে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর শাসনামলের শুরুর দিকে আলোড়ন তোলা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা আলাদা বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদ ও পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের কাছের কনকর্ড চত্বরে এই সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। কর্তৃপক্ষ সেটি নিষিদ্ধ করে। শনিবার সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকায় বিক্ষোভকারীরা ধারেকাছেও যেতে পারেননি। সেখানে আসা প্রায় ১০০ জনকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। গ্রেপ্তার হন আন্দোলনের সমন্বয়ক বেঞ্জামিন বল ও মুখপাত্র আজেলমা সিগো।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় লিওঁ শহরেও অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করে কয়েক শ মানুষ সড়ক অবরোধ করেন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্কুলগুলোর পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ক্ষুব্ধ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেন। এখনো আন্দোলনের সামনের সারিতে রয়েছেন তরুণেরা। শিক্ষার্থী সংগঠনের মুখপাত্র সাবিন খারবাখ বলেন, ‘আজকের দিনটি আন্দোলনের চাপ ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রতিক্রিয়া এখনো সন্তোষজনক নয় বলে অনেক তরুণ আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।’

বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কঠোর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন ও বলপ্রয়োগের অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

বিক্ষোভের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্যারিসের দোকান ব্যবস্থাপক জ্যঁ এমিল মুলিনিয়ে বলেন, ‘এভাবে আর চলতে পারে না। তা না হলে আমার মনে হয়, শিগগিরই বিপর্যয় নেমে আসবে।’ তাঁর দোকান বিক্ষোভের প্রধান মিছিলপথের পাশে। তিনি জানান, বিক্ষোভের দিনগুলোতে নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে খুব কম ক্রেতাই দোকানে আসেন। লুটপাটের আশঙ্কায় প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের দোকানপাটের কাচের দরজা-জানালায় আবারো তক্তা লাগানো হয়েছে। অনেক দোকান বন্ধও রাখা হয়েছে।

সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সমাধান খুঁজছে। তবে দেশটির বিপুল সরকারি ঋণের বোঝা সেই প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। এ ঋণ নিয়ে আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেতন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসবেন।

তবে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে মঙ্গলবার নতুন করে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছি, সরকার দুর্বল অবস্থানে। সরকারও ছাড় দিতে শুরু করেছে।’

জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী মারিন লে পেন এগিয়ে রয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন প্রেসিডেন্ট মাখোঁর মধ্যপন্থী সাবেক কোনো মিত্রকে নয়, বরং কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোকে দেখা হচ্ছে। শনিবার প্যারিসের বাইরে ২০ হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য দেন মেলঁশো। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরাই জিতব’ এবং ‘সবকিছু বদলাতে হবে’।