সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

সচিবালয় সরিয়ে শেরেবাংলা নগরে নেয়া হবে— সরকারের নীতিগত এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আবদুল গনি রোডে ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমিতে সচিবালয় অবস্থিত। এতে ১৩টি ভবন আছে। এগুলোর মধ্যে আটটি স্বাধীনতার আগে নির্মিত। ভবনগুলো ভূমিকম্প-সহনশীল নীতি মেনে বানানো হয়নি। তা ছাড়া পর্যাপ্ত স্থানের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ। এ বাস্তবতায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শেরেবাংলা নগরের ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ কমপ্লেক্সে ১৩-১৪টি ভবন নির্মাণ করা হবে। কিন্তু এতে আপত্তি জানিয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-শেকৃবি। শেকৃবির প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রস্তাবিত জায়গাটি কৃষি গবেষণায় বরাদ্দকৃত জমির অংশ। এ জমি বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার স্বার্থে সঙ্কুচিত হতে হতে বাণিজ্যমেলার মাঠটুকু শুধু টিকে আছে। কৃষি গবেষণা ও শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে হস্তান্তরের দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে আন্দোলন করছেন তারা।
অন্য দিকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দাবি করছে, এই জমি সরকারের নিজস্ব সম্পত্তি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবন ও শেরেবাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকা স্থপতি লুই আইকানের প্রণীত মহাপরিকল্পনার অংশ। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে। সংসদ ভবনের উত্তর পাশে শিশু উদ্যানের উত্তরে জাতীয় সচিবালয়সহ প্রশাসনিক ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন লুই আইকান। স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৮২ সালে সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও সচিবালয়ের কাজ আর এগোয়নি। প্রশাসনিক এলাকার মূল পরিকল্পনার সাথে বিশেষায়িত কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে স্থাপত্য অধিদফতর।
অন্য এক পক্ষের দাবি, নতুন পরিকল্পনায় এ সবুজ চত্বরে কংক্রিটের অবকাঠামো গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টি নিষ্কাশনে একটি খোলা সবুজ প্রাঙ্গণ প্রয়োজন। ওই অংশের ৭০ শতাংশ এলাকাতে যদি কংক্রিটের কাঠামো ও বেজমেন্ট গড়ে তোলা হয়, তাহলে শহরের তাপমাত্রা ও জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সচিবালয় আগারগাঁওয়ে সরিয়ে নিলে কিছু সুবিধা হবে। মেট্রোরেলে যাতায়াত যোগাযোগ সহজ হবে। আগারগাঁও ইতোমধ্যে একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সেখানে পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন কমিশন, পরিসংখ্যান ব্যুরো, বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অফিস আছে। সচিবালয় সেখানে সরিয়ে নিলে প্রাশাসনিক যোগাযোগে সুবিধা হবে; কিন্তু এতে কি ঢাকাকেন্দ্রিক চাপ কমবে? সচিবালয়ের মতো বিশাল একটি জাতীয় কেন্দ্র যদি ঢাকার ভেতরে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে মিরপুর ও শেরেবাংলা নগরসংলগ্ন এলাকায় ট্রাফিকের বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়া মূল শহর কুয়ালালামপুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। রাওয়ালপিন্ডি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ইসলামাবাদ। রাজধানীর প্রধান প্রশাসনিক হাব একটু দূরে সরিয়ে নিলে মূল শহরের কিছুটা হলেও নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ হয়।
আমরা মনে করি, লু আইকানের পরিকল্পনার ঐতিহ্যগত গুরুত্ব, শেকৃবির দাবি এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা জরুরি। নগর চাপ ও প্রশাসনিক সুবিধার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। একটি দূরদর্শী রূপরেখা আঁকতে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ ও স্থপতিদের মতামত।

Advertisement