
উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল গতকাল প্রকাশ হয়েছে। এ বছর দেশের সাধারণ ৯টি, মাদরাসা ও কারিগরি মিলিয়ে মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। ফলের এই চিত্র উদ্বেগজনক। যেখানে গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাস। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মানের অবনতি নিয়ে আত্মসমালোচনার সময় এসেছে।
এবার ফলাফলে ধস নামার পেছনে বড় কারণ শেখ হাসিনা রেজিমের ‘নাম্বার পাসের সংস্কৃতি’। তখন কৃত্রিমভাবে নাম্বার বাড়িয়ে পাসের হার ও ‘জিপিএ ৫’ বেশি দেখানো হতো। দীর্ঘমেয়াদে এ সংস্কৃতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁপা করে দিয়েছে। এখন পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি হওয়ায় চিত্রটি সামনে এসেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানোর এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সরকার আরো একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে— এবার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা চার লাখ ২২ হাজার ৯০। তাদের ওই বিষয়গুলোতে এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এর আগে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা করতে হতো। এতে তারা শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়তেন। সেই সাথে মানসিক চাপও তৈরি হতো। শিক্ষাজীবনের অপচয় রোধে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এতে শিক্ষার্থীরা কম সময়ে ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবেন। উচ্চশিক্ষার পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবেন।
গত কয়েক বছরে করোনার প্রকোপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলন শিক্ষাপঞ্জিকে ব্যাহত করেছে। শিক্ষার্থীদের অনেকে নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ পাননি, পাঠ্যসূচি শেষ করতে পারেননি তারা। এতে তাদের শিখন-দুর্বলতা রয়ে গেছে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে শিখনমান বাড়াতে হবে।
দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন নামমাত্র ক্লাস হয়। শহরের কিছু মানসম্মত প্রতিষ্ঠান ছাড়া গ্রামের বেশির ভাগ স্কুল-কলেজে দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট। প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি ও গ্রন্থাগারের সঙ্কট আছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে আছেন। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসমুখী না হয়ে গাইড বই ও নোটে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীরা। ফলে একটু মানসম্মত প্রশ্ন এলে অথবা মূল্যায়নে সামান্য কড়াকড়ি করা হলে শিক্ষার্থীরা গণহারে অকৃতকার্য হচ্ছেন। এ সঙ্কট এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের এই বিপর্যয়কে আমাদের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে নিতে হবে। এখনই যদি নীতিনির্ধারকরা কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়বে আমাদের আগামী প্রজন্ম। উচ্চ মাধ্যমিকে এসে শিক্ষার্থীরা হঠাৎ কেন হোঁচট খাচ্ছেন, সে কারণও খতিয়ে দেখতে হবে। এই সঙ্কট উত্তরণে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মসৃণ করতে মাধ্যমিক স্তর থেকে পড়াশোনার মান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি উন্নত করা প্রয়োজন। তা না হলে এবারের মতো বিপর্যয় আমাদের অসহায়ের মতো দেখা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর থাকবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








