
জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার হবে না; বরং সংশোধন করা হবে। সংশোধনীর ওপর নতুন করে গণভোটের আয়োজন করা হবে। সংবিধান সংশোধন-বিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির রিপোর্ট চূড়ান্ত করে ২০২৭ সালের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হতে পারে। গত রোববার সংবাদপত্রের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতাদের সাথে মতবিনিময়ে এ কথা বলেন তিনি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোট বাতিল হয়নি বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধানসহ আরো দু’টি অনুচ্ছেদকে গণভোটের আওতায় আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংসদ এসব বিধান পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণের অনুমোদন নিতে হয়। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সেগুলোয় গণভোট হবে।
এ সময় সম্পাদক ও সাংবাদিকরা সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে নিজস্ব মত তুলে ধরেন। অনেকে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়ে সংবিধান সংশোধনে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন। কেউ কেউ সংস্কার-বিষয়ক বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। একাধিক সম্পাদক অষ্টম সংশোধনী বাতিল করে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার সুপারিশ করেন। গুরুত্ব দেয়া হয় সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়েও। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রয়োজনে একতরফা উদারতা দেখিয়ে এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিয়ে হলেও বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এটি না হলে সংবিধান সংশোধনে দুর্বলতা থেকে যাবে বলেও মতপ্রকাশ করেন কয়েকজন সম্পাদক।
কিন্তু বাস্তবতা এটিই যে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নেই। সরকারি দল এটিকে বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেয়ার বিষয়ে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যদিও কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে বলেন, আমরা বারবারই তাদের আহ্বান জানিয়েছি। তারা যখনই যোগ দেবেন, স্বাগত জানাব। তাদের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করে সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলো গ্রহণ করব।
মন্ত্রীর বক্তব্য পরিষ্কার। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, এর চেতনা ও জুলাইযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারি দলের মনোভাব ও আচরণ নিয়ে জনমনে সংশয় আছে। এমন সংশয় যাতে সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি ছিল। এখন যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট— আগামীতে সংবিধানে যে সংশোধনী আনা হোক না কেন, তা ঐকমত্যের ভিত্তিতে হচ্ছে না।
গণভোট হবে, সংশোধনীগুলো পাস হবে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের যে তাগিদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সৃষ্টি হয়েছিল; তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। সরকারের ভেতর-বাইরের মহলবিশেষ কি তা-ই চায়?









