
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস ২০২৬। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, তথ্যের আদান-প্রদান এবং জনগণের সাথে যোগাযোগের প্রয়াস মানবসভ্যতার চিরন্তন অনুষঙ্গ। আজকের সংবাদপত্র, টিভি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ঢেউ আসার বহু আগে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজা-বাদশাহরা তাদের শাসন, উন্নয়ন ও ফরমানের কথা প্রজাদের জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এ অঞ্চলে মৌর্য যুগে সম্রাট অশোকের পাথুরে শিলালিপি কিংবা চত্বরে চত্বরে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে রাজকীয় বার্তা শোনানোর প্রথা ছিল তথ্যের প্রবাহ সচল রাখার প্রাচীন কৌশল। জনকল্যাণে দীঘি খনন বা ভূমিদানের ঘোষণা খোদাই হতো তাম্রশাসনে, আর দূর-দূরান্তের বার্তা পৌঁছানো হতো হরকরাদের মাধ্যমে। এমনকি উৎসবের রাজকীয় সমাবেশ কিংবা স্থাপত্যের গায়ে লিপিকলার অনন্য নিদর্শনের মাধ্যমেও রাজতথ্য ও বার্তা পৌঁছে দেয়া হতো প্রজাদের কাছে। অতীতের সেই একমুখী ও রাজবার্তা প্রচারের ধারা আজ বিবর্তিত হয়ে জনগণের মৌলিক অধিকারে রূপ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির চিরন্তন অধিকার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, তথ্য আজ আর শাসকের অনুগ্রহ নয়, বরং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান হাতিয়ার।
ইউরোপ তথা পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে এ পরিবর্তনের ধারাটিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে সামনে নিয়ে আসে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে পশ্চিমা সভ্যতা অভিজাততন্ত্র থেকে নাগরিকত্বের যুগে পদার্পণ করে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি মানব ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্রের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে পাবলিক ট্যাক্স ও সরকারি কর্মকর্তার প্রশাসনিক কর্মকান্ডের হিসাব চাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়। মানুষের বাক স্বাধীনতা এবং দ্বিমত করার অধিকার আদায়ে সে সময় সোচ্চার হয়েছিলেন বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার। এভাবে ইউরোপের অনেক দেশে যখন নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখন ভারতবর্ষ বন্দি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খলে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা প্রজাহিতৈষী সাজতে ঢোল পিটিয়ে যেটুকু তথ্য দিত, প্রজারা তা-ই পরম প্রাপ্তি বলে মেনে নিত। কিন্তু এর মাঝে ১৯২৩ সালে ব্রিটিশদের প্রণীত অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ভারতবর্ষে তথ্য গোপনের সংস্কৃতিকে আরও কঠিন করে তুলল। যা পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলেও অপরিবর্তিত থেকে যায়। ব্রিটিশরা যখন এমন আইন এ অঞ্চলে চাপিয়ে দিচ্ছিল, বহু বছর আগে তাদের এ নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রতিবাদও হয়েছিল। প্রতিবাদে জ্বলে উঠেছিলেন খোদ ব্রিটিশ কবি জন মিল্টন। সে সময় ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের প্রণীত মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বই প্রকাশের আগে অনুমোদনের বিধান ছিল।
এই অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবং বিনা সেন্সরশিপে বই ছাপানোর স্বাধীনতার দাবিতে মিল্টন ‘অ্যারিওপ্যাজিটিকান্ত নামক তার বিখ্যাত পুস্তিকাটি লেখেন। ওই পুস্তিকার বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য ছিল, “সব স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে আমাকে আমার বিবেক অনুযায়ী জানার, প্রকাশ করার এবং স্বাধীনভাবে যুক্তি-তর্ক করার স্বাধীনতা দাও।” এভাবেই তথ্য জানার ধারণাটি মানবসভ্যতার উষাকাল থেকেই পৃথিবীতে বিরাজমান ছিল। সভ্যতার ক্রমবিকাশের যে পর্যায়ে সমাজে শ্রেণিবিভক্তি হয়েছে, সে পর্যায়ে শাসক শ্রেণি সাধারণ মানুষকে অন্ধ করে রাখার কূটচাল করেছে। তবে বিংশ শতকের মধ্যভাগে
জাতিসঙ্ঘের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটে। ১৯৪৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর
জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ এক ঐতিহাসিক প্রস্তাবের মাধ্যমে তথ্যের স্বাধীনতাকে মানুষের অন্যতম
মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা পত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি যেকোনো মাধ্যমে এবং সীমান্তনির্বিশেষে তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রকাশের অধিকার স্বীকৃতি পায়। তথ্যের এই স্বাধীনতাকে সর্বজনীন মানবাধিকারের তালিকায় সু¯পষ্টভাবে অন্তরর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তটি ছিল তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। ঐতিহাসিক এ বিবর্তন ধাপ পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ-সাপেক্ষে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এছাড়াও সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক। কাজেই জনগণের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণীত হয়। এই যুগান্তকারী আইনের মাধ্যমেই নাগরিকেরা তথ্য চাওয়া, পাওয়া, সরকারি-বেসরকারি তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং এর সুফল ভোগ করার এক অনন্য আবশ্যিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। আজকের বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই তথ্য অধিকার আইন। বৈশ্বিক এই হাওয়া লেগেছে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশেও। পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেছে। ২০০২ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর তথ্য জানার অধিকার দিবস’ হিসেবে পালনের সূচনা হয়। যার চূড়ান্ত বৈশ্বিক স্বীকৃতি মেলে ২০১৫ সালে ইউনেস্কো এবং ২০১৯ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সার্বজনীন তথ্যে অভিগম্যতা দিবস হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে। আজ ঐতিহাসিক তথ্য অধিকার দিবস ২০২৬, আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে এই দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ডিজিটাল যুগে তথ্যের সুরক্ষা: তথ্য বিশৃঙ্খলা মোকাবেলায় তথ্যপ্রাপ্তির ভূমিকা ধারণাগত ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য অধিকার আইন মূলত একটি আইনি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনের আওতাভুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য জনগণকে প্রদান করতে হয়। কোনো নাগরিক যে সংস্থার কাছে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানায়, চাহিত তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সে কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়, অন্য কারো ওপর নয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে এ আইন একটি বিশেষ হাতিয়ার।
বাংলাদেশে এ আইন বাস্তবায়ন সহজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার, জনসচেতনতা এবং
নাগরিক ক্ষমতায়ন। অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুফল পেতে সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সঠিক
প্রয়োগ অপরিহার্য। এই আইন বাস্তবায়নে কেবল সরকারি মহল নয়-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত
সংস্থা, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং এনজিওসমূহের সদিচ্ছা জরুরি।
নাগরিকের মুক্তচিন্তা ও সচেতনতাই পারে তথ্য অধিকারকে সার্বজনীন রূপ দিতে। তৃণমূল থেকে এ
আইন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে, বিশেষ করে পৌরনীতি ও
নাগরিকতা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নিয়ে আলোচনা
করা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ প্রচার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান তথ্য অধিদফতর ও তথ্য
কমিশন এ বিষয়ে কাজ করছে। সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
নিয়োগের বিধান রয়েছে। প্রতিটি জেলায় রয়েছে একজন করে তথ্য কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
রয়েছে তথ্য ও জনসংযোগ অফিসার। তথ্য কমিশন হতে কেন্দ্র ও সব জেলা ছাড়াও উপজেলা
পর্যায়েও জন-উদ্বুদ্ধকরণ র্যালি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সেমিনার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
তথ্যপ্রাপ্তি সহজ ও নিশ্চিতকরণে তথ্য প্রকাশ, ওয়েবসাইট ও সিটিজেন চার্টারের মতো ব্যবস্থাও রাখা
হয়েছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চায় কেবল ইতিবাচক
জনসংযোগ। সেই কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো তথ্য গোপন করতে চায় বা এমন কাঠামো গড়ে
তুলতে চায়, যেখান থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন। একদিকে তথ্য অধিকার আইন করা হয়, অন্যদিকে
অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন কিংবা অন্যান্য দাপ্তরিক গোপনীয়তার অজুহাতে
নাগরিকদের তথ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাও ঘটে। বর্তমানে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬সহ বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও অন্যান্য আইনগত
সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। কিন্তু জনগণ কিংবা সেবাগ্রহীতা সঠিক তথ্য না জানলে
গুজব ছড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। যে কারণে বলা হয়, গুজব ও অপতথ্য ঠেকানোর প্রধান হাতিয়ার
হচ্ছে নাগরিককে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দেওয়া। কারণ নাগরিক যদি সঠিক তথ্য জানতে না
পারে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবে বিশ্বাস করবে। এতে করে একটি প্রতিষ্ঠান,
সর্বোপরি দেশের প্রকৃত চিত্র জনপরিসরে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।
তথ্য অধিকার কেবল একটি আইন নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি। তাই তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি আবেদন গ্রহণ বা তথ্য সরবরাহ করা নয়; বরং রাষ্ট্রের কর্মকান্ডকে জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই এ অধিকার বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাহলেই তথ্য হবে ক্ষমতার
হাতিয়ার নয়, জনগণের অধিকার।
লেখক : সহকারী পরিচালক (তথ্য ও জনসংযোগ) নোবিপ্রবি।









